আমরা হাসি অতিকষ্টে চাপিয়া মেঝের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া বসিয়া রহিলাম।
নিতাই মাস্টার বইখানা হাতে লইয়া বলিলেন, “কার বই?”
বিনু সগর্বে বলিল, “আমার বই, স্যার। আমার দাদা লিখেছেন, আমাদের একখানা দিয়েছেন—”।
নিতাই মাস্টার বইখানা নাড়িয়া-চাড়িয়া দেখিয়া বলিলেন, “হু, থাক, একটু পড়ে দেখব।”
পরের দিন বইখানা ফেরত দিবার সময় মন্তব্য করিলেন, “লেখে ভালো, বেশ বই। ছোকরা এর পর উন্নতি করবে।”
বিনু বাধা দিয়া বলিল, “ছোকরা নন স্যার তিনি, আপনাদের বয়সি হবেন—”
নিতাই মাস্টার ধমক দিয়া বলিলেন, “বেশি কথা কইবে না, চুপ করে বসে থাকবে। আমার কথার ওপর কথা! পুরোনো তেঁতুলে অম্বলের ব্যথা সারে, আশ্বিন মাসে দুর্গাপুজো হয়।”
পুরোনো তেঁতুলে অম্বলের ব্যথা সারুক আর নাই সারুক, নিতাই মাস্টারের সার্টিফিকেট শুনিয়া বিনুর দাদার বইখানা পড়িবার অত্যন্ত কৌতূহল হইল; বিনুর নিকট যথেষ্ট সাধ্যসাধনা করিয়া সে-খানা আদায় করিলাম। বাড়িতে বাবা ও বড়োদার চক্ষু এড়াইয়া বইখানাকে শেষ করিয়া বিনুর এই অদেখা দাদাটির প্রতি মনে মনে ভক্তিতে আপ্লুত হইয়া গেলাম। একটি মেয়েকে কী করিয়া দুষ্ট লোক ধরিয়া লইয়া গেল, নানা কষ্ট দিল, অবশেষে মেয়েটি কীভাবে জলে ডুবিয়া মরিল, তাহারই অতিমর্মন্তুদ বিবরণ। পড়িলে চোখে জল রাখা যায় না।
কয়েক মাস কাটিয়া গিয়াছে, একদিন বিনু বলিল, “জানিস পাঁচু, আমার সেই দাদা, যিনি লেখক, তিনি এসেছেন কাল আমাদের বাড়ি।”
অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া উঠিলাম, “কখন এসেছেন? এখনও আছেন?”
“কাল রাতের ট্রেনে এসেছেন, দু-তিনদিন আছেন।”
“সত্যি? মাইরি বল—”
“মা-ইরি, চল বরং, আয় আমাদের বাড়ি।’
আমার ন-দশ বত্সর বয়সে ছাপার বই কিছু কিছু পড়িয়াছি বটে, কিন্তু যাহারা বই লেখে তাহারা কীরূপ জীব কখনো দেখি নাই। একজন জীবন্ত গ্রন্থকারকে স্বচক্ষে দেখিবার লোভ সংবরণ করিতে পারিলাম না, বিনুর সহিত তাহার বাড়ি গেলাম।
বিনুদের ভেতর-বাড়িতে একজন একহারা কে বসিয়া বিনুর মার সঙ্গে গল্প করিতেছিল, বিনু দূর হইতে দেখাইয়া বলিল, ‘উনিই’। আমি কাছে যাইতে ভরসা পাইলাম না। সম্ভমে আপ্লুত হইয়া দূর হইতে চাহিয়া চাহিয়া দেখিতে লাগিলাম। লোকটি একহারা, শ্যামবর্ণ, অল্প দাড়ি আছে, বয়সে নিতাই মাস্টারের চেয়ে বড়ো হইবে তো ছোটো নয়, খুব গম্ভীর বলিয়াও মনে হইল। লোকটি সম্প্রতি কাশী হইতে আসিতেছে, বিনুর মায়ের কাছে সবিস্তারে সেই ভ্রমণকাহিনিই বলিতেছিল। প্রত্যেক কথা আমি গিলিতে লাগিলাম ও হাত-পা নাড়ার প্রতি ভঙ্গিটি কৌতূহলের সহিত লক্ষ করিতে লাগিলাম।
লেখকরা তাহা হইলে এইরকম দেখিতে।
সেইদিনই গ্রামে বেশ একটা সাড়া পড়িয়া গেল, বিনুর বাবা মুখুজ্যেদের চণ্ডীমণ্ডপে গল্প করিয়াছেন, তাঁহার বড়ো শালার ছেলে বেড়াইতে আসিয়াছে, মস্ত একজন লেখক, তার লেখার খুব আদর। ফলে গ্রামের লোক দলে দলে দেখা করিতে চলিল। বিনুর মা মেয়েমহলে রাষ্ট্র করিয়া দিলেন, ‘প্রেমের তুফানে’-র লেখক তাদের বাড়ি আসিয়াছেন। উক্ত বইখানি ইতিমধ্যে পুরুষেরা যত পড়ুক আর না-পড়ক, গ্রামের মেয়েমহলে হাতে হাতে ঘুরিয়াছে খুব, অনেক মেয়ে পড়িয়া ফেলিয়াছে, বিনুর মা ভ্রাতুস্পুত্রগর্বে স্ফীত হইয়া নিজে যাচিয়াও অনেককে পড়াইয়াছেন, সুতরাং মেয়েমহলও ভাঙিয়া আসিল একজন জলজ্যান্ত লেখককে দেখিবার জন্য। বিনুদের বাড়ি দিনরাত লোকের ভিড়; একদল যায়, আর একদল আসে। অজ পাড়াগাঁ, এমন একজন মানুষের—যার বই ছাপার অক্ষরে বাহির হইয়াছে, দেখা পাওয়া আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতোই দুর্লভ।
ক-দিন কী খাতির এবং সম্মানটাই দেখিলাম বিনুর দাদার! এর বাড়ি নিমন্ত্রণ, ওর বাড়ি নিমন্ত্রণ, বিনুর মা সগর্বে মেয়েমহলে গল্প করেন, “বাছা এসে ক-দিন বাড়ির ভাত মুখে দিলে? নেমন্তন্ন খেতে খেতেই ওর প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে—’
ভাবিলাম—সত্যি, সার্থক জীবন বটে বিনুর দাদার! লেখক হওয়ার সম্মান আছে।
ভূষণদার সহিত এইভাবে আমার প্রথম দেখা।
অত অল্প বয়সে অবশ্য ভূষণদাদার নিকটে ঘেঁষিবার পাত্তা পাই নাই—কিন্তু বছর দুই পরে তিনি যখন আবার আমাদের গ্রামে আসিলেন, তখন তাঁহার সহিত মিশিবার অধিকার পাইলাম—যদিও এমন কিছু ঘনিষ্ঠভাবে নয়। তিনি যে মাদৃশ বালকের সঙ্গে কথা কহিলেন, ইহাতেই নিজেকে ধন্য মনে করিয়া বাড়ি গিয়া উত্তেজনায় রাত্রে ঘুমাইতে পারিলাম না।
সে-কথাও অতিসাধারণ ও সামান্য। দাঁড়াইয়া আছি দেখিয়া ভূষণদাদা বলিয়াছিলেন, “তোমার নাম কী হে? তুমি বুঝি বিনুর সঙ্গে পড়ো?”
শ্রদ্ধা ও সমজড়িত কণ্ঠে উত্তর করিলাম, “আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“কী নাম তোমার?”
“শ্রীপাঁচকড়ি চট্টোপাধ্যায়।”
“বেশ।”
কথা শেষ হইয়া গেল। দুরু দুরু বক্ষে বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম। প্রথম দিনের পক্ষে এই-ই যথেষ্ট। পরদিন আরও ভালো করিয়া আলাপ হইল। নদীর ধারে বিনু, আমি, আরও দু-একটি ছেলে তাঁর সঙ্গে বেড়াইতে বাহির হইয়াছিলাম। ভূষণদাদা বলিলেন, “বলো তো বিনু, ‘এ দম্ভোলি বৃত্রাসুর শিরচ্ছিন্ন যাহে’—দম্ভোলি মানে কী? পারলে না? কে পারে?”
পূর্বেই বলিয়াছি, আমি বয়সের তুলনায় পাকা ছিলাম। তাড়াতাড়ি উত্তর করিলাম, “আমি জানি, বলব…বর্জ।”
“বেশ বেশ, কী নাম তোমার?”
কালই নাম বলিয়াছি; এ দীনজনের নাম তিনি মনে রাখিয়াছেন, এ আশা করাও আমার মতো অর্বাচীন বালকের পক্ষে ধৃষ্টতা। সুতরাং আবার নাম বলিলাম।
