পরদিন নাইতে যাচ্ছে তেল মেখে মতিলাল। খোকা বললে—আমি যাব—বাবা —নদীতে যাই।
সে রোজই যায়। তাকে তেল মাখিয়ে নিয়ে গিয়ে ডাঙায় দাঁড় করিয়ে রাখে। যে ঘাটে মতিলাল যায়, সেটাতে লোকজন বড়ো-একটা যায় না। বড্ড বনজঙ্গল। খোকা জলে নামবার জন্যে ব্যস্ত হয়।
মতিলাল ওকে কোলে করে জলে নামে। মহাখুশিতে দু-হাত দিয়ে খোকা খলবল করে জলে। কিছুতেই উঠতে চায় না। ওকে দুটো ডুব দেওয়ায় মতিলাল। এক-একটা ডুবের পর খোকা শিউরে আড়ষ্টমতো হয়, নাকে-মুখে জল ঢুকে যায়। খানিক পরে সামলে নিয়ে চারিদিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে। নদীতে বর্ষার ঢল নেমেচে, বড়ো বড়ো শ্যাওলা, কচুরিপানা টোপাপানার দাম তির বেগে ভেসে চলেচে।
খোকা বলে—ও কী বাবা?
—শ্যাওলা।
-–ও বাবা, গান করি, গান কয়ি—
–করো।
—এ-এ-এ-এ, ঘটি বধনন—
খেলারাম বাবাজি বাবাজি—
—বেশ, বেশ গান। এবার জল থেকে ওঠো। হ্যাঁরে, তোকে ও গান শেখালে কে রে?
—ফুছু।
—হ্যাঁ—যতো সব কাণ্ড! আবার গান করো তো?
—ঘটি বধনন—
খেলারাম বাবাজি—
—বেশ গান শিখিচিস—জয় যদু-নন্দন, ঘটিবাটি-বন্ধন,
তুলোরাম খেলারাম বাবাজি—
খোকার বহু আপত্তি সত্বেও মতিলাল খোকাকে গা মুছিয়ে ঘাটের ওপরে কুলগাছের ছায়ায় দাঁড় করিয়ে রেখে নাইতে নামল। ঢল-নামা বর্ষার নদীতে কামট-হাঙরের ভয়, জেলেরা প্রায়ই দেখতে পায়। কুমির তো কাল না পরশু একটা দেখা দিয়েছিল বেলেডাঙার বাঁকে। খোকাকে বেশিক্ষণ জলে রাখা ঠিক নয়। ডাঙার কুলতলা থেকে বাবাকে জলে ডুব দিতে ও হাত-পা ছুড়তে দেখে। খোকা খুব খুশি। ক্রমে খোকাকে খুশি করবার জন্য মতিলাল খরস্রোতা বর্ষার নদীতে সাঁতার দিতে শুরু করলে।
খোকা ডাঙা থেকে ডাকলেও বাবা–বাবা—
দূর থেকে মতিলাল উত্তর দিলে—কী?
—আমি যাই—
—না, আর নদীতে নামে না। ঠিক থাকো।
-–ও বাবা—
—থাক দাঁড়িয়ে ওখানে—
খানিকটা পরে বাবাকে আদৌ আর না-দেখতে পেয়ে খোকা ডাকতে লাগল— বাবা-–বাবা–
কোনো সাড়া নেই।
–-ও বাবা–ও মতিলাল—
কোনো দিকে মতিলালের দেখাও নেই।
—ও মতিলাল, ভয় কববে—
খানিকটা চুপ করে থেকে সে ভয়ের সুরে বললে—ছিয়াল! বাবা, ও বাবা–
অনেকক্ষণ পরে কে-একজন তরকারিওয়ালা নৌকো পার হবার জন্যে এসে দেখে, কুলতলায় একটা ছোটো ছেলে দাঁড়িয়ে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে কাঁদছে। অনেক দূর থেকেই সে শিশুকণ্ঠের আর্ত কান্না শুনতে পেয়েছিল। সে কাছে এসে বললে —কে গা? কী হয়েচে খোকা? তুমি কাদের ছেলে? এখানে কেন?
খোকা আকুল কান্নার মধ্যে হাত বাড়িয়ে নদীর দিকে দেখিয়ে বলে—বাবা মতিলাল—ভয় কববে—
এ আজ পাঁচ-ছ-বছরের কথা।
মতিলাল সান্যাল বাজিতপুরের ঘাটে বর্ষার নদীতে কুমির বা কামটের হাতে প্রাণ হারান, তখন তাঁর শিশুপুত্র একা নদীর ঘাটে কুলতলায় বসে ‘বাবা মতিলাল’ বলে কাঁদছিল, এ কথা অনেকেই জানেন বা শুনে থাকবেন। জেলার ম্যাজিস্ট্রেট পর্যন্ত শুনে দেখতে এসেছিলেন জায়গাটা। কেউ কেউ খোকার ফোটো তুলে নিয়ে গিয়েছিল সেই ঘাটের সেই কুলতলায় তাকে আবার দাঁড় করিয়ে। তার পিতৃহারা প্রাণের আকুল কান্না বাইরে কতটুকু বা প্রকাশ হয়েছিল। তিনদিন পরে মতিলালের অর্ধভুক্ত দেহ পাওয়া যায় সর্ষেখালির বাঁকে মাছধরা কোমরজলে। পুলিশের হাতে দেওয়া হয় মৃতদেহ।
খোকা আজ কোথায়, এ প্রশ্ন অনেকে করবেন জানি।
টুনু নেই। এক বছর পরে সেও বাবার সন্ধানে অজানা পথে বেরিয়ে পড়ে।
অন্নপূর্ণা আছেন। গাঁয়ের লোকে দেখাশোনা করে, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কলমের জোরে গবর্নমেন্ট মাসিক কিছু বৃত্তি দেয়।
জনসভা
জনসভা
আমার তখন বয়স নয় বছর। গ্রামের উচ্চ-প্রাইমারি স্কুলে পড়ি এবং বয়সের তুলনায় একটু বেশি পরিপক্ক। বিনু একদিন ক্লাসে একখানা বই আনিল, ওপরে সোনালিফুল হাতে একটি মেয়ের ছবি (ত্রিশ বছর আগেকার কথা বলিতেছি মনে রাখিবেন), রাঙা কাগজের মলাট, বেশি মোটা নয়, আবার নিতান্ত চটি বইও নয়।
আমি সেই বয়সেই দু-একখানা সুগন্ধি তেলের বিজ্ঞাপনের নভেল পড়িয়া ফেলিয়াছি; পূর্বেই বলি নাই যে বয়সের তুলনায় আমি একটু বেশি পাকিয়াছিলাম! সেজন্য বিনু আমাকে ক্লাসের মধ্যে সমঝদার ঠাওরাইয়া বইখানি আমার নাকের কাছে উঁচাইয়া সগর্বে বলিল, “এই দ্যাখো, আমার দাদা এই বই লিখেছেন, দেখেছিস?”
বলিলাম, “দেখি কী বই?”
মলাটের ওপরে লেখা আছে ‘প্রেমের তুফান’। হাতে লইয়া দেখিলাম, লেখকের নাম, শ্রীভূষণচন্দ্র চক্রবর্তী। দিনাজপুর, পীরপুর হইতে গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত, দাম আট আনা।
“তোর দাদার লেখা বই, কীরকম দাদা?”
বিনু সগর্বে বলিল, “আমার বড়োমামার ছেলে, আমার মামাতো ভাই।”
এই সময় নিতাই মাস্টার মহাশয় ক্লাসে ঢোকাতে আমাদের কথা বন্ধ হইয়া গেল। নিতাই মাস্টার আপন মনে থাকিতেন, মাঝে মাঝে কী এক ধরনের অসংলগ্ন কথা বলিতেন আর আমরা মুখ-চাওয়াচাওয়ি করিয়া হাসিতাম। জোরে হাসিবার উপায় ছিল না তাঁর ক্লাসে।
অমনি তিনি বলিয়া বসিতেন, “এই তিনকড়ি, এদিকে এসো, হাসছ কেন? ছানা চার আনা সের, কেরোসিন তেল ছ-পয়সা বোতল—”
এইসব মারাত্মক ধরনের মজার কথা শুনিয়াও আমাদের গম্ভীর হইয়া বসিয়া থাকিতে হইবে, হাসিয়া ফেলিলেই মার খাইয়া মরিতে হইবে।
বর্তমানে নিতাই মাস্টার ক্লাসে ঢুকিয়াই বলিলেন, “ও-খানা কী বই নিয়ে টানাটানি হচ্ছে সব? তিনটের গাড়ি কাল এসেছিল তিনটে পঁচিশ মিনিটের সময়, পঁচিশ মিনিট লেট—অমুক বিস্কুট পয়সায় দশখানা—”
