—কই রে?
—ওই—বসে আছে—
মতিলাল খোকার আঙুলের দিগদর্শন অনুসরণ করে দেখলে, সামনের গাছের ডালে একটা কাঠবেড়ালি বসে আছে। খোকা আর যায় না, সে দাঁড়িয়ে গিয়েছে এবং ভয়ের দৃষ্টিতে চেয়ে আছে একদৃষ্টে সেটার দিকে। বাবার দিকে দু-হাত বাড়িয়ে বললে—বাবা, কোলে—
—কোলে আসবি?
—ভয় কববে—
—কীসের ভয় রে? এটা হল কাঠবেড়ালি—ও কিছু বলে না। ভয় নেই—চল–
মতিলাল যে বন্ধুটির বাড়ি গেল, তারা ওকে এক পেয়ালা চা খেতে দিলে। মতিলালের ছেলেকে দিল একটুকরো মিছরি। খোকা মিছরি একটু মুখে দিয়েই মুখ থেকে বার করে নিয়ে মতিলালের মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে বললে—বাবা, খা—
এখন এ ব্যাপারটার ভেতরের কথা এখানে বলা এ সময়েই দরকার। ছেলের বয়স যখন আরো কম, দশ-এগারো মাস কী বছরখানেক, তখন থেকেই সে নিজের মুখে কোনো জিনিস মিষ্টি লাগলেই বাবার মুখের দিকে হাত বাড়িয়ে বলবে
—বাবা, খা—
মতিলালেরও বিশেষ আপত্তি থাকত না তাতে।
অবশ্য একটিবার বাদে।
একবার মাতৃস্তন্য পান করতে করতে খোকা নিকটে উপবিষ্ট মতিলালকে বলেছিল—বাবা, মিস্ত খা—
মতিলালেরা স্বামী-স্ত্রী মিলে খুব হেসেছিল।
নিজের মুখে যা ভালো লাগবে, তাই সে দেবেই বাবার মুখে এবং মতিলাল তা খেয়েও এসেছে, মুশকিলে পড়ে যেতে হয় ওকে, লোকজন থাকলে।
এখানে যেমন হল।
মতিলাল সলজ্জভাবে বললে—না, না—আমি আবার কী, খাও না—
খোকা বাবার রাগের কারণ খুঁজে পেলে না, রোজ যে খায়, আজ খাচ্ছে না কেন? নিশ্চয়ই রাগ করেছে।
সে দ্বিগুণ উৎসাহে বাবার মুখের আরো কাছে হাত নিয়ে গিয়ে বললে—বাবা, খা—
–না না। তুমি খাও—
–বাবা, খা না—
খোকার এবার কান্নার সুর। অমন মিষ্টি জিনিসটা বাবাকে সে খাওয়াবেই।
মতিলাল ধমক দিয়ে বললে—আঃ খাও না? আমার মুখে কেন?
-বাবা, খা না—
এবার বোধ হয় সে কেঁদেই ফেলবে। অগত্যা মতিলাল খোকার হাত থেকে মিছরির টুকরোটা নিয়ে খাবার ভান করে আবার ওর হাতে দিলে। খোকাকে ভোলানো অত সহজ নয়। সে বাবার মুখের দিকে চেয়ে বললে, মিট্টি?
—খুব মিষ্টি।
—আবার খা—
—না রে বাপু, বিরক্ত করলে দেখচি—
বন্ধুর বাড়িতে অনেকে বসে ছিল, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বললে—খোকা কী বলচে?
মতিলাল বললে, মিছরি দিচ্ছে খেতে—
ওর বন্ধু বললে—ও খোকা, বাবাকে কী দিচ্চ? মিছরি? তুমি খাও।
এইসব স্থূলবুদ্ধি লোকে কী বুঝবে—খোকা তাকে কতখানি ভালোবাসে বা সে খোকাকে কতখানি ভালোবাসে। এদের কাছে কিছু বলে লাভ নেই। পিতা-পুত্রের সেই সূক্ষ্ম অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসার গূঢ় তত্ব, যা মুখে বলা যায় না, যার বলে এক বছরের শিশু তার অত বয়সে বড়ো বাপের মনের ভাব বুঝতে পারে, সে জিনিসের ব্যাখ্যা যার-তার কাছে করে কী হবে?
মতিলাল বললে—খাও তুমি—
খোকা হাত বাড়িয়ে বললে—খা না বাবা—
মতিলাল খোকাকে কোলে নিয়ে বন্ধুর বাড়ি থেকে উঠল। খোকার মনে বার বার কষ্ট দেওয়াও যায় না, অথচ ওদের সামনে খোকার মুখ থেকে বের করা তার লালঝোলমাখা মিছরি খায়ই বা কী করে?
ওরা পথে নামল।
টুনুর ক্ষুদ্র জগতে সন্ধ্যা হয়ে এল। আশেপাশের পথে, বনে, ভাঁটুইবনে অন্ধকার নেমেচে। জোনাকি জ্বলচে কালকাসুন্দে গাছের ঝোপের আশেপাশে, যাঁড়াগাছের নিবিড় পত্র-পুষ্পের মধ্যে, বনমরচে লতার চারু অগ্রভাগে। অন্ধকারের গহ্বর থেকে যেন ফুটে উঠচে একে একে জ্যোতির্লোক, নীহারিকালোক।
মতিলাল আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললে—ও কী জ্বলচে রে?
—জোনা পোকা। নিয়ে এসো বাবা—
—তুই নিবি একটা?
—হ্যাঁ।
খোকা হেঁটেই যাচ্ছিল, অন্ধকার বনঝোপের দিকে তাকিয়ে সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল হঠাৎ।
—কী হল রে?
—বিচন কাদা!
—না মোটেই কাদা নেই, শুকনো পথ—
—ছিয়াল!
—কোথায়? কোথাও নেই, চলো—
—কোলে কর—নে—ভয় কববে—
–এসো তবে—
খানিকটা গিয়ে খোকা বললে—বাবা!
—কী?
—ও বাবা—আমি মুকি খাব—
—বেশ।
—সন্দেশ খাব—
—বেশ।
—ও বাবা!
—বোকো না—চুপ করো। –ও বাবা মতিলাল!
—কী বাবা?
—কী করছিস?
—কী আবার করব, পথ হাঁটচি।
—মা কোথায়—মা?
—বাড়িতে আছে।
—মার কাছে যাই—
—সেখানেই তো যাচ্চি—
মতিলালের স্ত্রী ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়েছিল। ছুটে এসে ছেলেকে কোলে নিয়ে বললে–ও আমার সোনার খোকন, আমার রুপোর খোকন, আমার এতটুকু একটা খোকন—কোথায় গিইছিলি রে?
—খোকা হাত দিয়ে একটা অনির্দিষ্ট বস্তু দেখিয়ে বললে—ওখেনে—
—ওখেনে? বেশ রে বেশ। হ্যাঁগো, যা-তা খাওয়াওনি তো?
মতিলাল বললে—না না। কী দেবেই বা কে এসব জায়গায়। একটু মিছরি খেয়েছে।
অন্নপূর্ণা ওকে দুধ খাইয়ে শুইয়ে দিলে। খোকা খানিকটা উশখুশ করে বললে— বাবা কোথায়?
-কেন?
—ঘুম দেবে।
—আমি ঘুম দিচ্ছি।
—বাবা দেবে—বাবা দেবে।
মতিলালকে খোকার শিয়রে বসে বসে ঘুম পাড়াতে হয়। প্রতি সন্ধ্যাতেই এ রকম। আজ নতুন কিছু নয়। খোকা বলে—বাবা, জন্তি গাছটি—
—কী? জন্তি গাছটি? তবে শোনো—
ওপারের জন্তি গাছটি জন্তি বড়ো ফলে—
গোজন্তির মাথা খেয়ে প্রাণ কেমন করে—
খানিকটা পরে খোকা নিস্তব্ধ ও নীরব হয়ে গেল। ঘুমিয়ে পড়েছে মনে করে মতিলাল যেমন বাইরে এসে বসে তামাক ধরিয়েছে, খোকা এমন সময়ে কেঁদে উঠল—ও বাবা, কোথায় গেলি? ও বাবা—
মতিলাল তামাক খেতে খেতে হুঁকো নামিয়ে রেখে ছুটল ছেলের কাছে।
অন্নপূর্ণা হেসে বলে—ও ঘুমের ঘোরে মাঝে মাঝে পেছন দিকে হাত দিয়ে দেখে তুমি আছ কিনা। যদি বোঝে নেই, তবে ওর ঘুম অমনি ভেঙে যায়—
বাইরের তামাকের ধোঁয়া পুড়ে পুড়ে শেষ হয়, মতিলালকে ঠায় বসে থাকতে হয় শিশুর শিয়রে।
