ভাবিয়া ভাবিয়া সে খুকীকে সঙ্গে করিয়া ট্রামে ধর্মতলার এক চুল ছাঁটাই দোকানে লইয়া গেল। নাপিতকে বলিল—ঠিক সাহেবদের ছেলে-মেয়েদের মতো যদি চুল কাটতে পারো তবে কাঁচি ধরো, নইলে অমন ঘন কালো চুল নষ্ট কোরো না যেন।
মেস হইতে সে খুকীর মাথার বিনুনি খুলিয়া আনিয়াছিল। চুল ছাঁটিতে উমার বেশ ভালো লাগিতেছিল। সামনে একখানা প্রকাণ্ড আয়না, চার-পাঁচটা বড়ো বড়ো আলো জ্বলিতেছে, নাপিত মাঝে মাঝে আবার ময়দার মতো কী একটা গুঁড়া তাহার ঘাড়ের চুলে মাখাইতেছে…এমন সুড়সুড়ি লাগে!…
তাহাকে সাজাইতে খুকীর মামা পাঁচ-ছয় টাকা খরচ করিয়া ফেলিল। মেসের নিয়োগী-মশায় একে একে কয়েকটি পুত্র-কন্যাকে উপরি উপরি চার-পাঁচ বৎসরের মধ্যে হারাইয়াছেন, উমাকে পাইয়া আর ছাড়িতে চাহিলেন না। সন্ধ্যার পর রঙিন ফ্রক পরা, ববড চুল, মুখে পাউডার, পায়ে জরির জুতো, আর এক উমা যখন তাহার ঘরে আসিয়া দাঁড়াইল, তাহাকে দেখিয়া তো নিয়োগীমশায় বিষম খাইবার উপক্ৰম করিলেন।
তাহার মামা হাসিয়া বলে—গেলই না হয় কিছু খরচ হয়ে, এমন সুন্দর মেয়ে কি ক’রে ভূত সাজিয়ে রেখেছিল বলুন দিকি?…ও কুণ্ডুমশায়, চেয়ে দেখুন পছন্দ হয়?
কী করিয়া খুকীর শীর্ণতা দূর করা যাইতে পারে, এ সম্বন্ধে নানা পরামর্শ চলিল। গলির মোড়ের একজন ডাক্তার কডলিভার অয়েল ও কেপলারের মল্ট এক্সট্রাক্টের ব্যবস্থা দিলেন, তাহা ছাড়া বলিলেন—খাওয়া চাই, না-খেয়ে খেয়ে এমন হয়েছে। —পুষ্টির অভাব, এ বয়েসে এদের খুব পুষ্টিকর জিনিস খাওয়ানো চাই কিনা। সকালে কোয়েকার ওটস খাওয়াবেন দিন পনেরো দেখুন কেমন থাকে।
কিন্তু চতুর্থ দিনে খুকীর কম্প দিয়া জ্বর আসিল। খুকীর মামার লিনোটাইপের কাজে যাওয়া হইল না, সারাদিন খুকীর কাছে বসিয়া রহিল। অন্যদিন বৃদ্ধ নিয়োগী মহাশয়ের তত্বাবধানে রাখিয়া ছাপাখানায় যাওয়া চলিত, আজ আর তাহা হইল ।…সন্ধ্যার পূর্বে জ্বর ছাড়িয়া গেল, খুকী উঠিয়া বসিয়া এক টুকরো মিছরি চুষিতে লাগিল। অফিসফেরতা ফণীবাবু একটা বেদানা ও গোটাকতক কমলালেবু, খুকীর জন্য আনিয়াছেন, সতীশবাবু পোয়াটাক ছোটো আঙুর ও পুনারায় গোটাতিনেক কমলালেবু আরও দু-তিন জনের প্রত্যেকেই কিছু-না-কিছু কিনিয়া আনিয়াছেন।… সকলে চলিয়া গেলে খুকী মামার দিকে একবার চাহিল, পরে ঠোঁট ফুলাইয়া মাথা নীচু করিল। মামা বিস্মিত হইয়া বলিল—কী রে খুকী? কী হয়েছে?
খুকী দুঃখের চাপা কান্নার মধ্যে বলিল—বাড়ি যাব মামা…মার কাছে যাব…
—আচ্ছা কেঁদো না খুকু-জ্বর সারুক, নিয়ে যাব এখন।
দু-তিন দিন গেল। জ্বর সারিয়া গিয়াছে বটে, কিন্তু রাত্রে মাঝে মাঝে সে ঘুমের ঘোরে মায়ের জন্য কাঁদিয়া ওঠে।… ভুলাইবার জন্য তাহাকে একদিন হগ সাহেবের বাজারে খেলনার দোকানে লইয়া যাওয়া হইল, সেখানে একটা খুব বড়ো মোমের খোকা-পুতুল তাহার খুব পছন্দ হইল, কিন্তু দামটা বড়ো বেশি, সাড়ে চার টাকা-খুকীর মামার এক মাসের মাহিনার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। মামা বলিল—
অন্য একটা পুতুল পছন্দ করো খুকু, ওটা ভালো না। কেমন ছোটো ছোটো এইসব কুকুর, হাতি, কেমন না?
খুকী দ্বিরুক্তি না-করিয়া ঘাড় নাড়িল বটে, কিন্তু পুতুলটা ফিরাইয়া দিবার সময় (সে পূর্ব হইতেই পুতুলটাকে দখল করিয়া বসিয়াছিল) তাহার ডাগর চোখ দুটি ছল ছল করিয়া আসিল।
দোকানদার বলিল—বাবু, খুকীর মনে কষ্ট হয়েছে, আপনি বড়ো পুতুলটাই নিন, কিছু কমিশন বাদ দিয়ে দিচ্ছি…
তাহার মামা বলিল—আচ্ছা, আচ্ছা, খুকু তুমি বড়ো খোকা-পুতুলটাই নাও কুকুরের দরকার নেই—ধরো বেশ ক’রে, যেন ভাঙে না দেখো।…
প্রায় এক সপ্তাহ কাটিয়াছে। সেদিন রবিবার, খুকীর মামা বিশেষ কারণে চেতলার হাটে এক বন্ধুর সহিত দেখা করিতে গিয়াছে। এখনি আসিবার কথা, কিছু টাকা পাওনা আছে, তাহারই আদায়ের চেষ্টায় যাওয়া, ততক্ষণ অন্যান্য দিনের মতো নিয়োগী মহাশয়ের তত্বাবধানেই খুকীর থাকিবার কথা।… খানিকক্ষণ খুকীর সহিত গল্পগুজব করিবার পর বৃদ্ধ নিয়োগী মহাশয়ের মাধ্যাহ্নিক নিদ্রাকর্ষণ হইল। কথা বলিতে বলিতে খুকী দেখিল তিনি আর কথা বলিতেছেন না, অল্প পরেই তাঁহার নাসিকা গর্জন শুরু হইল। মেসে কোনো ঘরে কেহ নাই, উমার ভয়-ভয় করিতে লাগিল। একবার সে জানালা দিয়া উঁকি মারিয়া চাহিয়া দেখিল, গলির মোড়ে দুইজন কাবুলিওয়ালা দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া গল্প করিতেছে, তাহাদের ঝোলাঝুলি, লম্বা চেহারায় ভয় পাইয়া সে জানালা হইতে মুখ সরাইয়া লইল।
মামা কোথায় গেল? মামা আসে না কেন?
সে ভয় পাইয়া ডাকিল—ও জ্যাতাবাবু, জ্যাতাবাবু?
তাহার মামা তাহাকে শিখাইয়া দিয়াছে—নিয়োগী মহাশয়কে জ্যাঠাবাবু বলিয়া ডাকিতে।
সাড়া না-পাইয়া সে আর একবার ডাকিল—আমার মামা কোথায় জ্যাতাবাবু নিয়োগী মহাশয় জড়িতস্বরে ঘুমের ঘোরে বলিলেন— আচ্ছা, আচ্ছা।…
তিনি স্বপ্ন দেখিতেছিলেন, দেশের বাটিতে রাত্রিতে শুইয়া আছেন, মালপাড়ার কেতু মাল চৌকিদার লাঠি ঘাড়ে রোঁদে বাহির হইয়া তাঁহার নাম ধরিয়া হাঁক দিতেছে।
খুকী এদিক-ওদিক চাহিয়া উঠিয়া পড়িল—সিঁড়ির দরজা খোলা ছিল, সে নামিয়া নীচে আসিল। ঝি-চাকর রান্নাঘরের তালা বন্ধ করিয়া অনেকক্ষণ চলিয়া গিয়াছে, একটা কালো বিড়াল চৌবাচ্চার উপর বসিয়া মাছের কাঁটা চিবাইতেছে।
বাহির হইয়াই রাস্তা। খুকীর একটা অস্পষ্ট ধারণা আছে যে, এই রাস্তাটা পার হইলেই তাহার মামার কাছে পৌঁছানো যাইবে, এই পথের যেখানটাতে শেষ, সেখান হইতেই পরিচিত গণ্ডীর আরম্ভ।
