ঘুরিতে ঘুরিতে সে পথ হারাইয়া ফেলিল, গলি পার হইয়া আর একটা বড়ো গলি, তাহার পর একটা লোহার বেড়া-ঘেরা মাঠ মতো, সেটার পাশ কাটাইয়া আর একটা গলি। ক্রমে খুকীর সব গোলমাল হইয়া গেল, এ পর্যন্ত সে একবারও পিছনের দিকে চাহে নাই, একবার পিছনের দিকে চাহিয়া তাহার মনে হইল সে দিকটাও সে চেনে না।…সামনের পিছনের দুই জগই তাহার সম্পূর্ণ অপরিচিত, কোথাও একটা এমন জিনিস নাই যাহা সে পূর্বে কখনো দেখিয়াছে।…
সে ভয় পাইয়া কাঁদিতে লাগিল। ঠিক দুপুরবেলা, পথে লোকজনও কম, বিশেষত এই সব গলির মধ্যে। আরও খানিকদ্দূর গিয়া একটা লাল রঙের বাড়ির সামনে দাঁড়াইয়া কাঁদিতেছে, তাহাদের বাড়ির মতিঝিয়ের মতো দেখিতে একজন স্ত্রীলোক তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল—কী হয়েছে খুকী, কাঁদছ কেন?…তোমাদের কোন বাড়িটা, এইটে?
খুকী কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল—আমি মামার কাছে যাব…
—তোমাদের ঘর কোথা গো?
খুকী আঙুল তুলিয়া একটা দিক দেখাইয়া বলিল—ওই দিকে।
—তোমার বাপের নাম কী?
বাপের নাম…কই তাহা তো সে জানে না! বাপের নাম ‘বাবা’—তা ছাড়া আবার কী? সে চোখ তুলিয়া ঝিয়ের মুখের দিকে চাহিল।
স্ত্রীলোকটি একবার গলির দুই দিকে চাহিয়া দেখিল, পরে বলিল—আচ্ছা এসো এসো খুকী, আমার সঙ্গে এসো, আমি তোমার মামার কাছে নিয়ে যাচ্ছি, এসো…।
এ-গলি, ও-গলি ঘুরিতে ঘুরিতে অবশেষে একটা ছোট্ট খোলার বাড়ি। ঝি কাহাকে ডাকিয়া কী একটা কথা নীচুস্বরে বলিল, তারপর দুইজনে খানিকক্ষণ কী বলাবলি করিল, নবাগত স্ত্রীলোকটি হাত দিয়া কী একটা দেখাইল, খুকী সেসব বুঝিতে পারিল না। পরে তাহারা খুকীকে একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে লইয়া গেল। ছোটো ঘুলঘুলির কাছে একটা প্রকাণ্ড মাটির জালা ও তাহার চারিপাশে একরাশ অন্ধকার। খুকীর কেমন ভয়-ভয় করিতে লাগিল—যক্ষিবুড়ি যে জালাতে ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের লুকাইয়া পুরিয়া রাখিবার গল্প শুনিয়াছে, যেন সেই ধরনের জালা। সে কাঁদো কাঁদো সুরে বলিল—আমার মামা কোথায়?
নবাগত স্ত্রীলোকটি বলিল—কেউ দেখেনি তো আনবার সময়ে? আমার বাপু ভয় করে। এই সেদিন সৈরভীর বাড়িতে পুলিশ এসে কি তম্বি, আমি থালা ফেরত দিতে গেনু তাই…
খুকীদের বাড়ির মতিঝিয়ের মতো দেখিতে যে স্ত্রীলোকটি সে বিদ্রুপ করিয়া বলিল—নেকু! যাও, সামনের দরজাটা খুলে ঢাক করে রেখে এলে কেন?…নেকু,। জানে না যেন কিছু!
সে খুকীকে চৌকির উপর বসাইয়া তাহার গায়ে হাত বুলাইয়া অনেক আদরের কথা বলিল, তাহাকে একটা রসগোল্লা খাইতে দিল। পরে খুকীর হাতের সোনার বালা দু-গাছা ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া বলিল—এখন তুলে রেখে দি খুকী?…বেশ নক্ষি মেয়ে—দেখি…
খুকী ভয়ে ভয়ে বলিল—বালা খুলো না…আমার মামাকে ডেকে দাও…
কিন্তু ততক্ষণে ঝি তাহার হাত হইতে বালা দু-গাছা অনেকটা খুলিয়াছে, দেখিয়া খুকী কাঁদিয়া উঠিয়া বলিল—আমার বালা নিও না, মামাকে বলে দেব আমার বালা খুলো না…
মতিঝিয়ের ইঙ্গিতে নবাগতা স্ত্রীলোকটি তাহার মুখ চাপিয়া ধরিল। কিন্তু একটা বিষয়ে দুইজনেই বড়ো ভুল করিয়াছিল, উমার কাটি কাটি হাত-পা দেখিয়া তাহার লড়াই করিবার ক্ষমতা সম্বন্ধে সাধারণের হয়তো সন্দেহ হইতে পারে, কিন্তু এ ধারণা যে কতদূর অসত্য, তাহা গত মাসে দুগ্ধপানের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের সময় উমার মা ভালোরূপেই জানিত। ইহারা সেসব খবর জানিবে কোথা হইতে? বেচারিদের ভুল ভাঙিতে কিন্তু বেশি বিলম্ব হইল না, ধস্তাধস্তিতে বিছানা ওলটপালট হইয়া গেল, উমার আঁচড়-কামড়ে মতি-ঝি তো বিব্রত হইয়া উঠিল। গোলমালে একগাছা বালা হাত হইতে খুলিয়া কোথায় চৌকির নীচের দিকে গড়াইয়া গেল। পিছন হইতে তাহার হাত-মুখ চাপিয়া ধরিয়া অন্যগাছা নবাগতা স্ত্রীলোকটি ছিনাইয়া খুলিয়া লইল।
মতি-ঝি বলিল—ছেড়ে দে, ছেড়ে দে—হাঁপিয়ে মরে যাবে—দেখি ও আপদকে রাস্তার ওপর রেখে আসি—বাপরে, কী দস্যি!…
—এখন কোথায় রাখতে যাবি লো? খ্যান্তমণিকে একটা খবর দিবিনে?
—না বাপু, তাতে আর দরকার নেই, ওকে রেখে আসি—কেউ টের পাবে, দেখ না বসে বসে…
তুমুল গোলমাল, খোঁজাখুঁজি, হইচই-এর পরে সন্ধ্যার সময় উমাকে পাওয়া গেল নেবুতলার সেন্টজেমস পার্কের কোণে। কেবিন-ছাঁটাই বড় চুল হেঁড়াখোঁড়া, কপালে ও গালে আঁচড়ের দাগ; হাত শুধু, ফ্রকের কোমরবন্ধ ছিঁড়িয়া ঝুলিতেছে…’মামা’ ‘মামা’ বলিয়া কাঁদিতেছিল, অনেক লোক চারিধারে ঘিরিয়া জিজ্ঞাসাবাদ করিতেছে, একজন গিয়া একটা পাহারাওলা ডাকিয়া আনিয়াছে—ঠিক সেই সময় নিয়োগীমশায়, কুণ্ডুমশায়, সতীশবাবু, অখিলবাবু, খুকীর মামা সবাই গিয়া উপস্থিত হইলেন।
যথারীতি থানায় ডায়েরি ইত্যাদি হইল। কে তাহার বালা খুলিয়া লইয়াছে এ সম্বন্ধে খুকী বিশেষ কোনো খবর দিতে পারিল না। খুকীর মামাকে সকলে যথেষ্ট ভসনা করিল। খবরদারি করিবার যখন সময় নাই, তখন পরের মেয়ে আনা কেন ইত্যাদি। সবাই বলিল—যাও ওকে কালই বাড়ি রেখে এসো ছিঃ, ওইরকম করে কী কখনো…মেসের সকলে চাঁদা তুলিয়া খুকীকে দু-গাছা পালিশ-করা বিলাতি সোনার বালা কিনিয়া দিল।
গাড়িতে যাইবার সময় তাহার মামা বলিল—খুকু, বাড়িতে গিয়ে যেন এসব কথা কিছু বলো না?…কেমন তো? কক্ষনো বলো না যেন?…হ্যাঁ, লক্ষ্মী মেয়ে
তাহলে আর কলকাতায় নিয়ে আসব না…
খুকী ঘাড় নাড়িয়া রাজি হইল। বলিল—আমায় তখন একটা পুতুল কিনে দিও মামা…আর একটা মেমপুতুল…
খেলা
মতিলাল ছেলেকে বললে–বোসো বাবা, গোলমাল করো না। হিসেব দেখছি—
