তাহার মা পালটা জবাব দিয়া বলে—বেশ করছি, আমি আমার মেয়েকে বলব তাতে পরের গা জ্বলে কেন? যাসনে ওখানে, যেতে হবে না। শৌখিন কথা সকলে বলতে পারে—যখন জ্বর হয়ে পড়ে থাকে, তখন যত্ন করতে তো কাউকে এগুতে দেখিনে—তখন তো রাত জাগতেও আমি, ডাক্তার ডাকতেও আমি, ওষুধ খাওয়াতেও আমি—মুখের ভালোবাসা অমন সবাই বাসে…
দুই-জায়ে তুমুল ঝগড়া বাধিবার কথা বটে এ অবস্থায়, কিন্তু বড়ো-জা হরমোহিনী বড়ো ভালো মানুষ। সাতে-পাঁচে থাকিতে ভালোবাসে না, খুকীর ওপর একটা স্নেহও আছে, সে কিছু না-বলিয়া নিজের ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া যায়।
পূজার সময় খুকীর মামা আবার আসিল। তাহারও বয়স এই কুড়ি-একুশের বেশি নয়, এই দিদিটি ছাড়া সংসারে তাহার আর কেহ নাই। এতদিন কলিকাতায় চাকুরির চেষ্টায় ছিল, পূজার কিছুদিনমাত্র পূর্বে কোনো ছাপাখানায় মাসিক আঠারো টাকা বেতনে লিনো টাইপের শিক্ষানবিশি করিতে ঢুকিয়াছে।
অনেক খাবারদাবার, খুকীর জন্যে ভালো ভালো দু-তিনটি রঙিন জামা, ছোটো ডুরে শাড়ি ও জাপানি রবারের জুতা আনিয়াছে। তাহার দিদি বকে—এসব বাপু কেন আনতে যাওয়া, সবে তো চাকরি হয়েছে, নিজের এখন কত খরচ রয়েছে, দু-পয়সা হাতে জমাও, ভালো খাওদাও—শরীর তো এবার দেখছি বড্ডই খারাপ
—অসুখ-বিসুখ হয় নাকি?
ছেলেটি হাসিয়া বলে—না দিদি, অসুখ-বিসুখ তো নয়, বড্ড খাটুনি, সকাল ন-টা থেকে সারাদিন, বিকেল ছ-টা অবধি—এক-একদিন আবার রাত আটটাও বাজে—এক-একদিন আবার রবিবারেও বেরুতে হয়, তবে তাতে ওভারটাইম পাওয়া যায় বারো আনা করে—এবার গুড় উঠলে এক কলসি গুড় নিয়ে যাবই এখান থেকে, ভিজে ছোলা আর গুড় সকালে উঠে বেশ জলখাবার হবে।
তারপর সে চিনামাটির খেলনা বাহির করিয়া খুকীকে ডাকে—ও উমা, দেখে যা কেমন কাচের ঘোড়া সেপাই, এদিকে আয়…
খুকী নাচিতে নাচিতে ছুটিয়া আসিল, মামা আসাতে খুকির খুব আহ্লাদ হইয়াছে, এসব ধরনের খাবার মামা না-আসিলে তো পাওয়া যায় না!…পূজার কয়দিন খুকী মামার কাছেই সর্বদা থাকিল। সকাল হইতে-না-হইতে খুকী চোখ মুছিয়া আসিয়া মামার কাছে বসে, মাঝে মাঝে বলে, এবার কলকাতায় নিয়ে যাবে না মামা?
পূজা ফুরাইয়া গেলে খুকীর মামা দিদির কাছে প্রস্তাবটা উঠায়, দিদি সহোদর বোন নয়, বৈমাত্রেয়, তবুও তাহাকে বেশ ভালোবাসে, যত্ন করে। সেও ছুটি-ছাটা পাইলে এখানে আসে। স্বামী-স্ত্রীতে পরামর্শ করিয়া দিন-দশেকের জন্য আপাতত খুকীকে কলিকাতা ঘুরাইয়া আনিবার সম্মতি দিল।
খুকীর মামা খুশি হইয়া বলে—আমি ওকে লেখাপড়া শেখাব, সেখানে গিয়ে মহাকালী পাঠশালায় ভরতি করে দেব—দেখতে পাই কেমন গাড়ি আসে, বাড়ি থেকে ছেলে-মেয়েদের তুলে নিয়ে যায়—গাড়ির গায়ে নাম লেখা আছে ‘মহাকালী পাঠশালা’।
ভগনিপতি হরি মুখুয্যে বলেন—পাগল আর কী! অতটুকু মেয়ে স্কুলে ভরতি আবার কী হবে?…হুজুগে পড়ে যেতে চাচ্ছে—ছেলেমানুষ, ও কী আর গিয়ে টিকতে পারে? যাও নিয়ে দু-দিন—এখানে তো ম্যালেরিয়ায় ম্যালেরিয়ায় হাড় সার করে তুলেছে—যদি দু-দিন হাওয়া বদলাতে পারলে সেরে যায়…
ট্রেনে কলিকাতা আসিবার পথে উমা খুব খুশি। প্রথমটা তার ভয় হইয়াছিল, রেলগাড়ির জানালার ধারে মামা বসাইয়া দিয়াছে, গাড়িটা চলিতেই খুকির মনে হইল তাহার পায়ের তলা হইতে মাটিটা সরিয়া যাইতেছে, ভয়ে তাহার চোখ বড়ো বড়ো হইল—আতঙ্কে মামাকে জড়াইয়া ধরিতে যাইতেই তাহার মামা হাসিয়া বলিল—ভয় কী, ভয় কী খুকু? এ যে রেলের গাড়ি-দেখ আরও কত জোরে যাবে এখন…
রেলগাড়ি চড়িবার আনন্দকে যে বয়সে বুদ্ধি দিয়া উপভোগ করা যায়, উমার সে বয়স হয় নাই। সে শুধু চুপ করিয়া জানালার বাহিরে চাহিয়া বসিয়া থাকে। মাঝে মাঝে তাহার মামা উৎসাহের সুরে বলে—কেমন রে খুকী, সব কেমন বল
তো? কেমন লাগছে রেলগাড়ি?
খুকী বলে—খুব ভালো…
কিন্তু খানিকক্ষণ পরে তাহার মামা দুঃখের সহিত লক্ষ করে যে খুকী বসিয়া বসিয়া ঢুলিতেছে, দেখিতে দেখিতে সে ঘুমাইয়া পড়ে।
গাড়ি কলিকাতায় পৌঁছিলে একখানা রিকশা ভাড়া করিয়া তাহার মামা তাহাকে বাসায় আনিল। অখিল মিস্ত্রি লেনে একটা ছোটো মেসে বাসা, অফিসের বাবুদের মেস, সকলেই বয়সে প্রবীণ, সে-ই কেবল অল্পবয়স্ক। খুকীর আকস্মিক আবির্ভাবে সকলেরই আনন্দ হইল। বাড়িতে ছেলে-মেয়ে সকলেরই আছে, কিন্তু চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা মাস-মাহিনার বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়াইয়া পড়িবার দরুন মাসে একবার কী দুইবার ভিন্ন বাড়ি যাওয়া ঘটে না, ছেলে-মেয়ের মুখ দেখিতে পাওয়া যায় না। খুকীকে পাইয়া একটা অভাব দূর হইল। চার-পাঁচ বছরের ছোটো ফুটফুটে মেয়ে, চাঁদের মতো মুখখানি, কোঁকড়া কোঁকড়া কালো চুল, কালো চোখের তারা আপিসের ছুটির পর তাহাকে লইয়া কাড়াকাড়ি পড়িয়া যায়। এ ডাকে উহার ঘরে ও ডাকে তাহার ঘরে।
কিন্তু তাহার মামার বড়ো দুঃখ, খুকীর বেশভূষা একেবারে খাঁটি পাড়াগেঁয়ে। মাথায় বিনুনি, কপালে কাঁচপোকার টিপ, অতটুকু মেয়ের পায়ে আবার আলতা, ছোটো চুরি শাড়ি পরনে, ওসব সেকেলে কাণ্ড আজকাল শহর-বাজারে কী আর চলে? দিদি পাড়াগাঁয়ে পড়িয়া থাকে, শহরের রীতিনীতি বেশভূষার কি ধার ধারিবে? এখানকার ভদ্রঘরের ছেলে-মেয়েদের কেমন সুন্দর চুলের বিন্যাস, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ফিটফাট সাজানো, দেখিতে যেন কাচের পুতুল। খুকীকে ওই রকম সাজানো যায় না?
