এতক্ষণে হঠাৎ খুকীর কথা মনে পড়িয়া গেল তাহার মামার। সে বলিল—ওই যাঃ, তোমরা বোসো ভাই, খুকীটার অসুখ হয়েছে বলে ডোম্বলদের বাইরের ঘরে শুইয়ে রেখে এসেছি অনেকক্ষণ, দেখে আসি দাঁড়াও…
ভোম্বলদের বাড়ির বাইরের উঠানে গোয়ালের কাছে আসিতে ভোম্বলের বড়ো ছেলে টোনা বলিল—খুকু কোথায় কাকা?
খুকীর মামা বিস্ময়ের সুরে বলিল—কেন, সে তোদের বাইরের ঘরে শুয়ে নেই?
—না কাকা, সে তো অনেকক্ষণ আপনার কাছে যাবে বলে বেরিয়েছে, তখন খুব রোদুর, উঠে কাঁদত লাগল, বললে, মামার কাছে যাব—শুনলে না, তখুনি রোদুরে আপনাকে খুঁজতে বেরুল…
—সে কী রে! আমি কোথায় আছি তা সে জানবে কেমন করে? আর তোরা বা ছেলেমানুষকে ছেড়ে দিলি কী বলে? বেশ লোক তো! আর এ মেয়ে নিয়েও হয়েছে—
মামা অত্যন্ত ব্যস্ত ও উদবিগ্নভাবে পুনরায় পাড়ার দিকে ফিরিল। পরিচিত স্থানগুলিতে খোঁজা শেষ হইল, কোথাও সে নাই, কোন পথ দিয়া কখন চলিয়া গিয়াছিল কাহারও চোখে পড়ে নাই, কেবল মতি মুখুয্যের ছেলে বলিল, অনেকক্ষণ আগে একটি অপরিচিত ছোটো খুকীকে চড়চড়ে রৌদ্রে টলিতে টলিতে ভোম্বলদের বাড়ির উঠোনের আগল পার হইয়া আসিতে দেখিয়াছিল বটে, খুকীকে সে চেনে না, ভাবিয়াছিল ভোম্বলদের বাড়িতে কোনো কুটুম্ব হয়তো আসিয়া থাকিবে, তাহাদের মেয়ে।
অবশেষে তাহাকে পাওয়া গেল গ্রামের বাহিরের পথে। মামাকে খুঁজিতে বাহির হইয়া পথ হারাইয়া ঘুরিতে ঘুরিতে নিরুপায় অবস্থায় পথের উপর বসিয়া কাঁদিতেছিল, বৃদ্ধ হারাণ সরকার দেখিতে পাইয়া লইয়া আসেন।
জিজ্ঞাসা করিয়া জানা গেল, সে সারাদিন কিছু খায় নাই—খাইবার মধ্যে দুপুরবেলা ডোম্বলদের বাড়ির কোন ছেলে এক টুকরা আমসত্ব হাতে দিয়াছিল, জ্বরের ঘোরে সেটুকু শুধু চুষিয়াছে শুইয়া শুইয়া। তাহার মামাকে সকলে বকিতে লাগিল। সরকারমশায় বলিলেন—তোমারও বাপু আক্কেলটা কী—ছোটো মেয়েটাকে নিয়ে দুপুর রোদে এক কোশ হাঁটিয়ে আনলে, পথে এল তার জ্বর, দেখলেও না, শুনলেও না, ওদের চণ্ডীমণ্ডপে কাৎ করে ফেলে রেখে তুমি বেরুলে আড্ডা দিতে—না একটু দুধ, না কিছু—ছিঃ…
তাহার মামা অপ্রতিভ হইয়া বলিল—তা আমি কী আনতে গেছলাম, আমি বেরুবার সময় ছাড়ে না কোনোরকমেই—তোমার সঙ্গে যাব মামা, তোমার সঙ্গে যাব মামা—আমি কী করব?
—বেশ, খুব আদর করেছ ভাগনিকে—এখন চলো আমার বাড়ি, ওকে একটু দুধ খাইয়ে দি, কচি মেয়েটাকে সারাদিন—ছিঃ–
খুকীর মামা একটু দমিয়া গিয়াছিল, বাড়ি ফিরিবার সময় খুকীকে বলিল—কিন্তু বাড়ি গিয়ে কিছু বোলো না যেন খুকু! মার কাছে যেন বোলো না যে জ্বর হয়েছিল, কি হারিয়ে গিয়েছিলে, কেমন তো? লক্ষ্মী মেয়ে, বললে আমি কলকাতা যাব পরশু, সঙ্গে করে নিয়ে যাব না…
—আমি কলকাতা যাব মামা…
—যদি আজ কিছু না বলো, পরশু ঠিক নিয়ে যাব…বলবিনে তো?
কিন্তু বাড়ি পৌঁছিয়া খুকী বুদ্ধির দোষে সব গোলমাল করিয়া ফেলিল। তাহার শুষ্ক মুখ ও চেহারায় তাহার মা ঠাওরাইয়া লইল একটা কিছু যেন ঘটিয়াছে। জিজ্ঞাসা করিল—কী খেলি রে খুকী সেখানে?
খাওয়ার কথা মামা কিছু শিখাইয়া দেয় নাই, সুতরাং খুকী বলিল—আমসত্ব খুব ভালো—এত বড়ো আমসত্ব…
—আমসত্ব? আর কিছু খাসনি সেখানে সারাদিনে? হ্যাঁ রে ও যতীশ, খুকী সেখানে কিছু খায়নি?
—খেয়েছে বইকী, খেয়েছে বইকী—তা, হ্যাঁ–জানোই তো ওকে, কিছু খাওয়ানোই দায়…
মা একটু অড়ালে গেলে খুকী মুখ নীচু করিয়া হাসিমুখে মামার দিকে চাহিয়া হাত নাড়িয়া বলিল—মাকে কিছু বলিনি মামা—কাল আমায় কলকাতায় নিয়ে যাবে তো?
—ছাই যাব, না-খাওয়ার কথা বললি কেন? বাঁদর মেয়ে কোথাকার…
মামার রাগের কারণ খুকী কিছু বুঝিতে পারিল না।
খাওয়ার কথা সম্বন্ধে মামা তো কিছু বলিয়া দেয় নাই, তবে সে কথা যদি বলিয়া থাকে তাহার দোষ কী?
তাহার মামা এ কথা বুঝিল না। রাগিয়া বলিল—তোমার জন্যে যদি আর কখনো কিছু কিনে আনি খুকী, তবে দেখো বলে দিলাম—কখনো আনব না, কলকাতাতেও নিয়ে যাব না।
তাহার প্রতি এই অবিচারে খুকীর কান্না আসিল। বা রে, তাহাকে যে কথা বলিয়া দেয় নাই, তাহা বলাতেও দোষ? সে কী করিয়া অতশত বুঝিবে?
খুকী খুব অভিমানী, সে চিৎকার করিয়া হাত-পা ছুড়িয়া কাঁদিতে বসিল না, এক কোণে দাঁড়াইয়া চুপ করিয়া নিঃশব্দে ঠোঁট ফুলাইয়া ফুলাইয়া কাঁদিতে লাগিল।
পরদিন সকালে তাহার মামা কলিকাতায় রওনা হইল—যাইবার সময় তাহার সহিত কথাটিও কহিল না।
আবার দিন কাটিতে লাগিল। বর্ষা শেষ হইয়া গেল, শরৎ পড়িল—ক্রমে শরৎও শেষ হয়। পূজা এবার দেরিতে, কার্তিক মাসের প্রথমে, কিন্তু বাড়ি-বাড়ি সবাই জ্বরে পড়িয়া, পূজায় এবার আনন্দ নাই। প্রবীণ লোকেও বলিতে লাগিলেন, এরকম দুর্বৎসর তাঁহারা অনেকদিন দেখেন নাই।
উমা সারা আশ্বিন ধরিয়া ভুগিয়া সারা হইয়াছে। একে কিছু না-খাওয়ার দরুন রোগা, তাহার উপর জ্বরে ভুগিয়া রোগা—তাহার শরীরে বিশেষ কিছু নাই। তবুও জ্বরটা একটু ছাড়িলেই কাঁথা ফেলিয়া উঠিয়া পড়ে…কারুর কথা শোনে না তারপর গয়লাপাড়া, সদগোপপাড়া, কোথায় নবীন ধোপার তেঁতুলতলা—এই করিয়া বেড়ায়। বাড়ি ফিরিলেই দুম দুম কিল পড়ে পিঠে। মা বলে—দস্যি মেয়ে, মরেও না যে আপদ চুকে যায়, কবে যাবে ষষ্ঠীর মাঠে। কবে তোমায় রেখে খুকি খুকি বলে কাঁদতে কাঁদতে আসব…।
ওঘর হইতে বড়ো-জা বলিয়া ওঠে—আচ্ছা, ওসব কী কথা সকাল বেলা ছোটো বউ…বলি মেয়েটার ষষ্ঠীর মাঠে যাবার আর তো দেরি নেই, ওর শরীরে আর আছে কী?…তার ওপর রোগা মেয়েটাকে ওইরকম করে মার?…ছি ছি, একটা পেটে ধরেই এত ব্যাজার, তবুও যদি আর দু একটা হত। এসো উমা, আমার দাওয়ায় এসো তো মাণিক! এসো এদিকে।
