গফুর মাঝি ডাবা হুকায় তামাক টানিতে টানিতে বলিতেছে—তা নেন গো কয়াল মশাই, একটু হাত চালিয়ে নেন দিকি, মোরা একবার দেখি? ইদিকি নোনা গাঙের গোন নামলি কী আর নৌকো বাইতি দেবানে?
হরি মুখুয্যে মহাশয়কে একটু ব্যস্তসমস্তভাবে আসিতে দেখিয়া হীরু চক্রবর্তী বলিলেন—আরে এসো হরি, কী মনে করে?…এসো তামাক খাও…
—না থাক—তামাক—ইয়ে আমার মেয়েটাকে ইদিকে দেখেছ হীরু? …বড়ো মুশকিলে ফেলেছে বাঁদর মেয়ে…বারোটা বাজে, সেই বাড়ি থেকে নাকি বেরিয়েছে সকাল ন-টার সময়…একটু দেখি ভাই খুঁজে, এত জ্বালাতনও করে তুলেছে মেয়েটা, সে আর তোমাকে কী বলব…
অনেক খোঁজাখুঁজির পরে রায়বাড়ির পথে উমাকে ধুলার উপর পা ছড়াইয়া বসিয়া কী একটা হাতে লইয়া চুষিতে ও আপন মনে বকিতে দেখা গেল।
ওরে দুষ্টু মেয়ে…
হরি মুখুয্যে গিয়া মেয়েকে কোলে তুলিয়া লইলেন। বাবার কোলে উঠিতে পাইয়া উমা খুব খুশি হইল, হাত-পা নাড়িয়া বলিতে লাগিল—বাবা, ও বাবা…ওই ওদের নাদু ভারি দুত্ত…এই, এই দুধ এই খায় না…আমি দুধ খাই, না বাবা?
—বেশ মেয়ে, দুধ খেতে হয়। ওটা কী খাচ্ছিস, হাতে কী?
—নেবেথুস, ওই পুঁটির মামা এসেছে, তাই দিয়েছে।
বাড়িতে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উমার শাস্তি শুরু হয়। বাটিভরা দুধ, ঝিনুক, টানাটানি ইত্যাদি। তাহার কান্না, কাকুতি-মিনতি পাষাণী মা শোনে না, জোর করিয়া ঝিনুক মুখে পুরিয়া দিয়া ঢোঁকে ঢোঁকে দুধ খাওয়ায়…শেষের দিকটায় সে পা ছুড়িতে গিয়া খানিকটা দুধসুদ্ধ বাটিটা উলটাইয়া ফেলিয়া দিল।
দুম দুম দুই নির্ঘাত কিল পিঠে। পিঠ প্রায় বাঁকিয়া যায়।
–হতভাগা দস্যি আপদ কোথাকার—ছ-সের করে দুধ টাকায়, ভাত জোটে, দুধের খরচ জোগাতে জোগাতে প্রাণ গেল…দস্যি মেয়ের ন্যাকরা দেখো…আদ্ধেকটা দুধ কিনা ঠ্যাং ছুড়ে মাটিতে দিলে ফেলে!…
খুকী দম সামলাইয়া লইবার পরে পা ছড়াইয়া কাঁদিতে লাগিল। অনেকক্ষণ কাঁদিল।
বেলা পড়িয়া আসে। ওদের উঠোনে পূর্বপুরুষের আমলের বীজু আমগাছের ছায়ায় অপরাহের রোদকে আটকাইয়া রাখে। খুকি বসিয়া বসিয়া ভাবে অপরের বাড়িতে ভালো খাবার খাইতে পাওয়া যায়—মিষ্টি—তাহাদের বাড়িতে শুধু দুধ
আর দুধ!
তাহার মা বলিল—টিপ পরবি ও দস্যি?
খুকী ঘাড় নাড়িয়া মায়ের কাছে সরিয়া আসিল।
—বলে নয়নতারা টিপ, দুটো করে এক পয়সায়, বেশ টিপগুলো—সরে এসে। বোস দিকি।
টিপ পরিয়া খুকী আবার পাড়া বেড়াইতে বাহির হয়। বাঁশবনের তলা দিয়া গুটি গুটি হাঁটে। পুনরায় সে লোভে লোভে রায়বাড়ি যায়, পরের বাড়িতেই যত ভালো খাবার। বিস্কুট, নেবেথুস, কত কী।
নানুদের উঠানে পেঁপেগাছের মাথার দিকে তাহার চোখ পড়িতে সে প্রথমটা অবাক হইয়া গেল। সঙ্গিনীকে ডাকিয়া দেখাইয়া কহিল—ও নানু, ওই পিঁপে।
পেঁপে তাহার মা কাটিয়া খাইতে দেয়, বেশ খাইতে লাগে, কিন্তু তাহা গাছের আগডালে কি অমনভাবে দোলে! চাহিয়া চাহিয়া সে কিছু ঠাহর করিতে পারিল না।
পূজার কিছু পূর্বে খুকীর আপন মামা কলিকাতা হইতে আসিল। এত ধরনের খাবার কখনও সে চক্ষেও দেখে নাই। কিশমিশ দেওয়া মেঠাই, বড়ো বড়ো অমৃতি জিলিপি, গজা, কমলালেবু আরও কত কী।
পাশের গ্রামে মামার এক বন্ধুর বাড়ি। মামা পরদিন সকালে উঠিয়া তাহাকে সাজাইয়া সঙ্গে করিয়া লইয়া চলিল।
পথে কে একজন সাইকেলে চড়িয়া যাইতেছে, খুকী চাহিয়া চাহিয়া দেখিল। মামাকে বলিল—ও কে গেল মামা?
–ও রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে একজন লোক…
উমা বলিল—ফরসা মুখ, ফরসা জামা গায়, না মামা?…চমৎকার!…
তাহার মামা হাসিয়া বলিল—’চমৎকার’ কথাটা তুই শিখলি কী করে?…আচ্ছা খুকু, তুই ওকে বিয়ে করবি?
উমা সপ্রতিভ মুখে ঘাড় নাড়িয়া জানাইল—তাহার কোনো আপত্তি নাই।
ভাদ্রের শেষ, ম্যালেরিয়ার সময়, তবে এখনও খুব বেশি আরম্ভ হয় নাই, বাড়ি বাড়ি কাঁথামুড়ি দেওয়া শুরু হইতে এখনও দেরি আছে। উমার হাঁটুনির বেগ নিস্তেজ হইয়া পড়িতে থাকে, ক্রমে সে মাঝে মাঝে পথের ধারে বসিতে লাগিল, মাঝে মাঝে হাই তুলিতে লাগিল। তাহার মামা বলিল—কী হয়েছে খুকু, রোদুর বড্ড বেশি রে, আর বেশি নেই, চল…
বন্ধুর বাড়ি পৌঁছিবার পূর্বেই উমা বলিল—মামা, আমার শীত লাগছে…
—শীত কী রে? ভাদ্র মাসে এই গরমে শীত? ও কিছু না, চল… খুকী আর কিছু না-বলিয়া বেশ চলিল বটে, কিন্তু খানিক দূর গিয়া তাহার মনে হইল শীত একটু বেশিই করিতেছে। শুধু শীত নয়, তৃষ্ণাও পাইয়াছে। সে সাহসে ভর করিয়া বলিল—মামা, আমি জল খাব।
—বড়ো বিপদ দেখছি তো, আচ্ছা, আগে চল গিয়ে পৌঁছাই—খেও এখন জল…
গন্তব্যস্থানে পৌঁছিয়া উমার মামা তাহার কথা ভুলিয়াই গেল। অনেকদিন পরে পুরাতন বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, গল্পগুজব ও হাসিঠাট্টায় মশগুল হইয়া উমার সুখ দুঃখের দিকে চাহিবার অবকাশ পাইল না। উমা দু-একবার কী বলিল, আলাপের গোলমালে সেকথা কেহ কানে তুলিল না।
খানিকক্ষণ পরে তাহার মামা ফিরিয়া দেখিল, সে গুটিসুটি হইয়া রৌদ্রে বসিয়া আছে, মামার প্রশ্নের উত্তরে বলিল—জল খাব মামা, জলতেষ্টা পেয়েছে…।
—দেখি? তাই তো রে, গা যে বড়ো গরম—উঃ, খুব জ্বর হয়েছে—যে ম্যালেরিয়ার জায়গা! আয়, চল ওদের ঘরে শুইয়ে রাখিগে, ওঠ…
খুকীকে জল খাওয়াইয়া বিছানায় শোয়াইয়া দিয়া মামা পুনরায় পাড়ার দিকে বাহির হইল, স্নানাহার বন্ধুদের বাড়িতেই সম্পন্ন হইল; ক্রমে দুপুর গড়াইয়া গেল, মুখুয্যে পাড়ার হাফ-আখড়াই-এর ঘরে গ্রামের নিষ্কর্মা ছোকরার দল একে একে আসিয়া পৌঁছিল, প্রকাণ্ড কেটলিতে চায়ের জল চড়িল, গল্পে গল্পে বেলা একেবারেই গেল পড়িয়া।
