—আরে এই যে কেষ্টদা, আজকাল আর দেখিনে যে?
—কেষ্টদা, কোত্থেকে? বিয়েথাওয়া করলেন নাকি এ বয়সে?
—আজকাল কোনো কোম্পানিতে আছেন কেষ্টদা? দেখিনে ট্রেনে আর?
—জমিজমা দেখতে গেছলে ভায়া? তা দেখবেই তো, থাকলেই দেখে–আমাদের কোনো চুলোয় কিছু নেই, যা করে এই বিশ্বাস কোম্পানি, হিংসা হয় তোমায় দেখে, দু-শো টাকা বছরে আয়ের সম্পত্তি? বলো কী! তবে তো তুমি– ইত্যাদি, ইত্যাদি।
কৃষ্ণলালকে এ বিড়ি দেয়, ও পানের কৌটো খুলিয়া সামনে ধরে। পুরাতন বন্ধুর দল। ইহাদের ফেলিয়া সে এতকাল ঘুমন্তপুরীতে কাল কাটাইল যে কী ভাবিয়া? এখানে কাজ আছে, আমোদ আছে, পয়সা রোজগার আছে, তারপর ইয়ে আছে। আর সে কোথাও যাইবে না কলিকাতা ছাড়িয়া। মরিতে হয় এখানেই মরিবে।
পনেরো-বিশ দিন এখানে ওখানে হাঁটাহাঁটি করিয়াও কিন্তু চাকুরি মিলিল না। বসু মহাশয় ঝাড়া জবাব দিলেন। এখন সুশ্রী চেহারার ছোকরা ক্যানভাসার—বেশ লম্বা জুলপি, ঘাড় বাহির করিয়া চুল ছাঁটা, লপেটা জুতা পায়ে, থিয়েটারের রামের মতো গলা, এই সবাই চায়। বয়স হইয়া গেলে, মানে, উহাদের লোক আছে, দরকার হইলে চিঠি লিখিয়া জানাইবেন পরে।
পুরোনো মেসেই উঠিয়াছিল, বারান্দাতে আছে। গোলাপীর সঙ্গে দেখা করে নাই। এখন করিতে চাহেও না সে। অনাহারে দু-দিন কাটিল মধ্যে। অবশেষে একদিন আহিরীটোলার ঘাটেই গিয়া হাজির হইল, যদি হাতকাটা তেলওয়ালা সেই ছোকরার সঙ্গে দেখা হইয়া যায়! সে সাড়ে বারোটার স্টিমারে রোজ বালি হইতে আসে বলিয়াছিল। সাত-আট দিন ক্রমাগত ঘুরিয়াও কিন্তু ছোকরার দেখা মিলিল না। কৃষ্ণলালের দুঃখ শেষ সীমায় আসিয়া পোঁছিয়াছে। আর চলে না। আচ্ছা, সে ক্যানভাসারি ভুলিয়া যাইতেছে না তো? আজ কতদিন চাকুরি নাই, কতদিন বক্তৃতা দিবার অভ্যাস নাই। চর্চা-অভাবে শেষে কিনা ছোকরা ক্যানভাসারেরা তাহাকে— কৃষ্ণলালকে ছাড়াইয়া যাইবে!
সেদিন কৃষ্ণলাল নিজের টিনের ছোটো সুটকেসটি হাতে লইয়া ড্যালহাউসি স্কোয়ারের মোড়ে দাঁড়াইয়া হাত-পা নাড়িয়া ক্যানভাসারের বক্তৃতা জুড়িয়া দিল, চর্চা রাখা দরকার তো বটেই, তা ছাড়া সে নিজের শক্তি পরীক্ষা করিতে চায়, খরিদ্দার জোটে কিনা সে একবার দেখিবে। এখনও তাহার যাহা গলা আছে, থিয়েটারের রামের মতো গলাওয়ালা কোনো ছোকরা ক্যানভাসার তাহার সঙ্গে পাল্লা দিবে, সে দেখিতে চায়!—দত্তপুকুরের বাতের তেল! ব্যবহারে সর্বপ্রকার বাতবেদনা, মাথা ধরা, দাঁতশূলানি, হাত-বেদনা, পিঠ-বেদনা…ভদ্রমহোদয়গণ! এই ঔষধটি আজ ত্রিশ বছর ধরিয়া এই লালদিঘির মোড়ে…
কৃষ্ণলাল মিনিট পাঁচ-ছয় পরে সগর্বে একবার চারিদিকে পচহিয়া দেখিয়া লইল। বেশ ভিড় জমিয়া গিয়াছে। একজন ভিড় ঠেলিয়া কাছে আসিয়া বলিল—আমায় একটা ছোটো ফাইল—
কৃষ্ণলাল গম্ভীরভাবে বলিল—আমার কাছে ওষুধ নেই—আমি বসু ইন্ডিয়ান ড্রাগ সিন্ডিকেটের পাবলিসিটি ডিপার্টমেন্টে র লোক, যাঁদের দরকার হবে, তাঁরা একশো ছয়ের সি হরিধন পোদ্দার লেনে বসু ইন্ডিয়ান ড্রাগ সিন্ডিকেটের অফিসে…আমার নামের এই স্লিপটা নিয়ে যান দয়া করে, টাকায় চার আনা কমিশন পাবেন—দাঁড়ান লিখে দিচ্ছি—
দিন পাঁচ-ছয় কাটিল। কৃষ্ণলালের নেশা লাগিয়া গিয়াছে। সে বেলা তিনটার সময় রোজ সুটকেস হাতে ঝুলাইয়া ডালহাউসি স্কোয়ারের মোড়ে গিয়া বক্তৃতা জুড়িয়া দেয়। আফিস–ফেরতা লোকেরা ভিড় করিয়া শোনে।
সেদিন কৃষ্ণলাল দাঁড়াইয়া দত্তপুকুরের বাতের তেলের গুণ ব্যাখ্যা করিতেছে। এমন সময় একজন ভদ্রলোক ভিড় ঠেলিয়া একেবারে তাহার সামনে আসিয়া দাঁড়াইলেন।
কৃষ্ণলাল চমকিয়া উঠিল, বসু ড্রাগ সিন্ডিকেটের মালিক নৃত্যগোপাল বসু মহাশয় স্বয়ং।
বসু মহাশয় কৃষ্ণলালের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন, শুনুন একবার এদিকে—
কৃষ্ণলাল ভিড়ের পাশ কাটাইয়া কিছু দূরে বসু মহাশয়ের সঙ্গে গিয়া অপ্রতিভের মতো দাঁড়াইল। বসু মহাশয় বলিলেন, এ কী হচ্ছে?
কৃষ্ণলাল অপরাধীর মতো মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে বলিল,–আজ্ঞে, আজ্ঞে, একবার চর্চাটা রাখচি, নইলে–
বসু মহাশয় বলিলেন, তাই তো বলি, এ কী কাণ্ড! গত দিন পাঁচ-ছয়ের মধ্যে আফিসে আপনার নামের স্লিপ নিয়ে বোধ হয় একশো কী দেড়শো খদ্দের গিয়েছে। এত ওষুধ বিক্রি গত ক-মাসের মধ্যে হয়নি। একে তো এই ডাল সিজন যাচ্ছে, আমি তো অবাক! সবাই বলে লালদিঘির মোড়ে আপনাদের পাবলিসিটি অফিসার, তাঁরই মুখে শুনে…আমি বলি আজ নিজে গিয়ে ব্যাপারটা কী দেখি তো নিজের চোখে! তা আমি খুব সন্তুষ্ট হয়েচি, আপনার এরকম কাজে–
কৃষ্ণলাল বিনীতভাবে বলিল, আজ্ঞে, ভাবলাম ছোকরা ক্যানভাসারদের মতো থিয়েটারি রামের গলা কোথায় পাব—তবুও একবার দেখি দিকি—
বসু মহাশয় বলিলেন, শুনুন, ওসব থাক, আপনি আজই অফিসে আসুন এক্ষুনি।
আপনাকে আজ থেকে হেড ক্যানভাসার অ্যাপয়েন্ট করলাম। ষাট টাকা মাইনে পাবেন আর কমিশন, শুধু তদারক করে বেড়াবেন কে কেমন কাজ করছে, আর ছোকরাদের একটু তালিম দিয়ে দেবেন, বুঝলেন না? আসুন চলে আমার গাড়িতে–
সন্ধ্যাবেলা।…নবীন কুণ্ডুর লেনে খোলর ঘরের সংকীর্ণ রোয়াকে গোলাপী ক্যানেস্ত্রারাকাটা তোলা উনুনে আঁচ দিয়া প্রাণপণে পাখার বাতাস করিতেছে, এমন সময় বাহিরে কে পরিচিত গলায় ডাকিল—গোলাপী, ও গোলাপী, বাইরে এসে জিনিসগুলো ধরো দিকি! হাত ধরে গিয়েছে—
» খুঁটি-দেবতা
ঘোষপাড়ায় দোলের মেলায় যাইবার পথে গঙ্গার ধারে মঠটা পড়ে।
