জ্ঞাতিরা অবশ্য কৃষ্ণলালকে জায়গা দিল। কিন্তু কিছুদিন থাকিয়া কৃষ্ণলালের কেমন অসহ্য বোধ হইতে লাগিল। গ্রামে তাহার মন টেকে না। কখনো সে দীর্ঘদিন ধরিয়া গ্রামে বাস করে নাই—এখানকার লোকে কথাবার্তা বলিতে জানে না, ভালো করিয়া মিশিতে জানে না, চা খায় না। কলিকাতায় রাস্তার ভিখারিও চা খায়। তাহার উপর এই পাড়াগাঁয়ে যেমন জলকাদা, তেমনি জঙ্গল—রাত্রে মশার উৎপাতে নিদ্রা হয় না। এর মধ্যে ম্যালেরিয়া প্রায় সকল বাড়িতেই দেখা দিয়াছে।
না, এখানে মন টেকে না। কৃষ্ণলাল চেষ্টা করিয়া দেখিল—এখানে সবাই যেন সারাদিন ঘুমাইয়া আছে। সকাল হইতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ইহারা চড়কতলার ক্ষুদ্র মাঠে বেলতলায় বসিয়া হুকা হাতে আড্ডা দেয়, পরচর্চা করে। কোনো কাজ নাই অথচ দুপুরের ভাত দুটি মুখে দিতে না-দিতে এদের চোখ ঘুমে ঢুলিয়া পড়ে। দিবানিদ্রা চলে চারিটা পর্যন্ত—তারপর ঘুম হইতে রক্তবর্ণ চোখে উঠিয়া কেহ-বা বাজারে দু-পয়সার সওদা করিতে যায়—সেখানেও আবার আড্ডা…এ দোকানে ও দোকানে বসিয়া তামাক খাওয়া…চার পয়সার সওদা করিতে তিন ঘণ্টা লাগাইয়া সন্ধ্যার পর বাড়ি আসে। তারপরই আহার ও নিদ্রা। কেরোসিন তেলের দাম চড়িয়া গিয়াছে—তেল খরচ করিয়া আলো জ্বালাইয়া রাখিতে কেহ রাজি নয়। কয়েক বাড়ি যাও—অন্ধকারে বসিয়া দু-একটা কথা বলো, গল্প করো—এক-আধ কল্কে তামাক খাও—তাহার পর বাড়ি ফিরিয়া আবার বিছানা আশ্রয় করো, দিন শেষ। হইয়া গেল।
কৃষ্ণলাল এরকম জীবনে অভ্যস্ত নয়। এ কী জীবন? অথচ সকলেই বলিবে, দাদা, সংসার আর চলে না, বড়ো কষ্ট! কষ্ট ঘুচাইবার চেষ্টা কোথায়? আজ দীর্ঘ পঁচিশ-ত্রিশ বছর ধরিয়া যার কলিকাতায় ভীষণ কর্মব্যস্ত জীবন কাটিয়াছে—এ ধরনের অলস, শ্রমবিমুখ জীবনের ধারণাই করিতে পারে না সে!
সকালে উঠিয়াই নীচের তলার কলে স্নান সারিয়া লইতে হইত। খুব ভোরে স্নান না-সারিলে এমন ভিড় জমিয়া যাইবে কলে যে আর স্নান করা চলিবে না। নীচের তলায় সেকরার দোকানের লোকেরা, শালওয়ালা, দরজি, পুব দিকের ঘরে যে মুটেরা থাকে সবাই আসিয়া কলে ভিড় লাগাইয়া দিবে। ইহার পর আসিবে একদল বালতি হাতে জল ধরিতে ও চাউল ধুইতে। সারি সারি লোক দাঁড়াইয়া যাইবে কলসি হাতে জল ভরিতে। ওপরে তিনতলায় তিনটি মেসের চাকরেরা— সকলেই কর্মব্যস্ত, ঘড়ি ধরিয়া কাজ কলিকাতায়, “সময় গেল। ছ-টা বাজে, কখন কী হবে?” দিন আরম্ভ হইয়াছে…এখনি বাবুরা আসিয়া ভাত চাহিবে আটটা বাজিতে-না-বাজিতে, এতটুকু দেরি করিলে চলিবে না!
স্নান সারিয়া কৃষ্ণলাল ব্যাগ হাতে বাহির হইত শেয়ালদ’ স্টেশনে, প্রথমেই সাতটা দশ বারাসত, সাতটা পঁচিশ নৈহাটি, পৌঁনে আটটা রানাঘাট প্যাসেঞ্জার; সাড়ে আট-টা বনগাঁ লোকাল, আটটা পঞ্চাশ দত্তপুকুর, ন-টা কেষ্টনগর লোকাল…শুরু হইয়া গেল দিনের কাজ। বাতের তেল! বাতের তেল! যত প্রকার বাত, ফোলা, শূলানি, কনকনানি, মাথাধরা, পেটবেদনা, ইহার একমাত্রা ব্যবহারে…ভদ্রমহোদয়গণ, এই ওষুধটি আজ ত্রিশ বছর যাবৎ এই লাইনে সুখ্যাতির সহিত চলিতেছে,—এই চলিল বেলা বারোটা পর্যন্ত। বারোটা পঞ্চান্ন শান্তিপুর ছাড়িয়া গেলে তবে সকালের কাজ মিটিল। কী জীবন! কী আনন্দ! কী পয়সা রোজগার! কাঁচাপয়সা রোজ আসে, রোজ সন্ধ্যায় উড়িয়া যায়। যে পয়সা আয় করিতে জানে, সে-ই জানে খরচ করিতে, ইহাতে ক্ষোভ কী?
কৃষ্ণলাল আরও মাসখানেক কোনোরকমে কাটাইল।
আর চলে না। এ অলস জীবন তাহার অসহ্য। কখনো পা গুটাইয়া কূর্মবৃত্তি অবলম্বন করিয়া এভাবে সে থাকে নাই। বেশিদিন এভাবে থাকিলে সে পাগল হইয়া যাইবে, নয়তো মরিয়া যাইবে।
কিন্তু কলিকাতায় গিয়া সে খাইবে কী? কোনো উপায় তো দেখা যাইতেছে না! ইন্ডিয়ান ড্রাগ সিন্ডিকেটে আর চাকরি হইবার সম্ভাবনা নাই। তবুও একবার বসু মহাশয়কে গিয়া ধরিয়া দেখিলে কেমন হয়? কিছু যদি না-জোটে, তবে আহিরীটোলার ঘাটে সেই হাতকাটা তেলের ক্যানভাসার ছোকরার সঙ্গে দেখা করিয়া…তবে ছুরি দিয়া নিজের হাতটা ফালা ফালা করিয়া কাটা—এ বৃদ্ধ বয়সে, ক্যানভাসারের চাকুরির মতো সম্মানের চাকুরি, আরামের চাকুরি আর নাই, কিন্তু হাত কাটিয়া দেখাইয়া জিনিস বিক্রয় করা! ওতে মানসম্ভম থাকে না।
এভাবে গ্রামে বসিয়া থাকা জীবন নয়। চিরকাল কাজের মধ্যে থাকিয়া আজ বাঁচিয়া মরিয়া থাকা তাহার পোষাইবে না। গ্রামেও তো হাওয়া খাইয়া জীবনধারণ করা যায় না— কেহ কেহ তাহাকে সামনের বছর দু-এক বিঘা ধান করিতে পরামর্শ দিল—কেহ বলিল, ডোবার ধারে জমিটা পড়ে আছে কেষ্ট খুড়ো, তোমারই পৈতৃক জমি, এই শীতকালে মানকচু লাগাও ওটাতে, তবু হাটে হাটে কিছু ঘরে আসবে, সামনের শীতকাল নাগাৎকৃষ্ণলালের হাসি পায়।
কলিকাতায় রোজগার যে কী ধরনের, সেখানে ক্যানভাসারের কাজে মাসে যে টাকা এক সময় তাহার আয় ছিল, এখানে গোটা বছর ধরিয়া কচু, কুমড়ো বেচিয়াও যে সে আয় হওয়া অসম্ভব—এই মূর্খ, অর্বাচীনেরা তাহা কী করিয়া বুঝিবে?
অবশেষে সে একদিন বাক্সবিছানা বাঁধিয়া কলিকাতায় আসিয়া হাজির হইল।
বাঁচিতে হয় তো ভালো করিয়াই সে বাঁচিবে।
ট্রেনে পুরোনো ক্যানভাসারদের সঙ্গে দেখা। নবশক্তি ঔষধালয়, কবিরাজ অনঙ্গমোহন দেব, বিশ্বাস কোম্পানি—ইন্ডিয়ান ড্রাগ সিন্ডিকেট প্রভৃতি ফার্মের লোক সব। সবাই জানে, সবাই খাতির করে।
