মঠ বলিলে ভুল বলা হয়। ঠিক মঠ বলিতে যাহা বুঝায়, সে ধরনের কিছু নয়। ছোটো খড়ের ঘর খান চার-পাঁচ মাঠের মধ্যে। একধারে একটা বড়ো তেঁতুলগাছ। গঙ্গার একটা ছোটো খাল মাঠের মধ্যে খানিকটা ঢুকিয়া শুকাইয়া মজিয়া গিয়াছে —জোয়ারের সময়ে তবুও খালটা কানায় কানায় ভরিয়া উঠে। ঠিক সেই সময় জেলেরা দোয়াড়ী পাতিয়া রাখে। জোয়ারের তোড়ের মুখে মাছ খালে উঠিয়া পড়ে, ভাটার টানে নামিবার সময় দোয়াড়ীর কাঠিতে আটকাইয়া আর বাহির হইতে পারে না। কাছেই একটু দূরে শঙ্করপুর বলিয়া ছোটো গ্রাম। কিছুকাল পূর্বে রেল-কোম্পানি একটা ব্রাঞ্চ লাইন খুলিবার উদ্দেশ্যে খানিকটা জমি সার্ভে করাইয়া মাটির কাজ আরম্ভ করাইয়াছিলেন, কোনো কারণে লাইন বসানো হয় নাই। মাঠের উত্তর-দক্ষিণে লম্বা প্রকাণ্ড উঁচু রেলওয়ে বাঁধটার দুই পাশের ঢালুতে নানাজাতীয় কাঁটাগাছ, আকন্দ ও অন্যান্য বুনো গাছপালা গজাইয়া বন হইয়া আছে। আকন্দ গাছটাই বেশি।
খুঁটি-দেবতার অপূর্ব কাহিনি এইখানেই শুনিয়াছিলাম।
গল্পটা বলা দরকার।
শঙ্করপুর গ্রামের পাশে ছিল হেলেঞ্চা-শিবপুর। এখন তাহার কোনো চিহ্ন নাই। বছর পনেরো পূর্বে গঙ্গায় লাটিয়া গিয়া মাঝ-গঙ্গার ওই বড়ো চরটার সৃষ্টি করিয়াছে। পূর্বস্থলীর চৌধুরী জমিদারদের সহিত ওই চরার দখল লইয়া পুরোনো প্রজাদের অনেক দাঙ্গা ও মোকদ্দমা হইয়াছিল। শেষপর্যন্ত প্রজারাই মামলায় জেতে বটে, কিন্তু চরটা চিরকালই বালুময় থাকিয়া গেল, আজ দশ বৎসরের মধ্যে চাষের উপযুক্ত হইল না। পাঞ্জা দখলে আসিলেও চরটা প্রজাদের কোনো উপকারে লাগে না, অনাবাদী অবস্থায় পড়িয়াই থাকে। আজকাল কেহ কেহ তরমুজ, কাঁকুড় লাগাইতেছে দেখা যায়।
এই গ্রামে রাঘব চক্রবর্তী পূজারি বামুন ছিলেন।
রাঘব চক্রবর্তীর কেহ ছিল না। পৈতৃক আমলের খড়ের বাড়িতে একা বাস করিতেনঃ একাই নদীর ঘাট হইতে জল আনিয়া, বনের কাঠ কুড়াইয়া রাঁধিয়া বাড়িয়া খাইতেন! গায়ে শক্তিও ছিল খুব, পিতামহের আমলের সেকেলে ভারী পিতলের ঘড়া ভরিয়া দুটি বেলা এক পোয় পথ দূরবর্তী গঙ্গা হইতে জল আনিতেন। ক্লান্তি বা আলস্য কাহাকে বলে জানিতেন না।
রাঘব চক্রবর্তী পয়সা চিনিতেন অত্যন্ত বেশি। বাঁশের চটার পাখা তৈয়ারি করিয়া কুড়ি দরে ডোমেদের কাছে ঘোষপাড়ার দোলে বিক্রয় করিতে পাঠাইয়া দিতেন। অবসর সময়ে ঝুড়ি, কুলোডালা বুনিয়া বিক্রয় করিতেন। মাটির প্রতিমা গড়িতে পারিতেন। উলুখড়ের টুপি, ফুল-ঝাঁটা তৈয়ারি করিতেন। সুন্দর কাপড় রিপু করিতে পারিতেন। এসব তাঁহার উপরি আয়ের পন্থা ছিল। সংসারে কেহই নাই, না-স্ত্রী, না-ছেলে-মেয়েকে তাঁহার পয়সা খাইবে, তবুও রাঘব টাকা জমাইয়া যাইতেন। একটা মাটির ভাঁড়ে পয়সাকড়ি রাখিতেন, সপ্তাহে একবার বা দুইবার ভাঁড়টি উপুড় করিয়া ঢালিয়া সব পয়সাগুলি সযত্নে গুনিতেন। ভাঁড়ের মধ্যে যাহা রাখিতেন পারতপক্ষে তাহা আর বাহির করিতেন না। গ্রামের সবাই বলিত, রাঘব চক্রবর্তী হাতে বেশ দু-পয়সা গুছাইয়া লইয়াছেন।
একদিন দুপুরে পাক সারিয়া রাঘব আহারে বসিবার উদ্যোগ করিতেছেন, এমন সময়ে একখানা ছই-ঘেরা গোরুরগাড়ি আসিয়া তাঁহার উঠানে থামিল। গাড়ি হইতে একটি পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের যুবক বাহির হইয়া আসিল। রাঘব চিনিলেন, তাঁর দূর-সম্পৰ্কীয় ভাগিনেয় নন্দলাল।
নন্দলাল আসিয়া মামার পায়ের ধূলা লইল।
রাঘব বলিলেন—এসো বাবা। ছই-এর মধ্যে কে?…
নন্দলাল সলজ্জমুখে বলিল—আপনার বউমা।
–ও! তা কোথায় যাবে? ঘোষপাড়ার দোল দেখতে বুঝি?
নন্দলাল অপ্রতিভের সুরে বলিল—আজ্ঞে না। আপনার আশ্রয়েই—আপাতত —মানে, বামুনহাটির বাড়িঘর তো সব গিয়েছে। গত বছর মাঘমাসে বিয়ে—তো এতদিন বাপের বাড়িতেই ছিল—সেখান থেকে না-আনলে আর ভালো দেখাচ্ছে। না। তাই নিয়ে আজ একেবারে এখানেই…
রাঘব বিশেষ সন্তুষ্ট হইলেন না। তিনি চিরকালই একা থাকিয়া আসিয়াছেন, একা থাকিতেই ভালোবাসেন। এ আবার কোথা হইতে উপসর্গ আসিয়া জুটিল, দ্যাখো কাণ্ড!
যাহাহউক, আপাতত বিরক্তি চাপিয়া তিনি ভাগিনেয়-বধূকে নামাইয়া লইবার ও পূর্বদিকের ভিটার ছোটো ঘরখানাতে তাহাদের থাকিবার বন্দোবস্ত করিলেন।
সন্ধ্যার পরে ভাগিনেয়কে জিজ্ঞাসা করিলেন—এখানে নিয়ে তো এলে, হাতে কিছু আছে–টাছে তো? আমার এখানে আবার বড়ো টানাটানি। ধান অন্যবার যা হয়, এবার তার সিকিও পাইনি। যজমানদের অবস্থা এবার যা…
নন্দ এ কথার কিছু সন্তোষজনক জবাব দিতে পারিল না।
রাঘব বলিলেন-বউমার হাতে কিছু নেই?
—ও কোথায় পাবে! তবে বিয়ের দরুন গয়না কিছু আছে। ওর ওই হাতবাক্সটাতে আছে যা আছে।
—জায়গা ভালো নয়। গয়নাগুলো বাক্সে রাখাই আমি বলি বেশ। পাঁচজন টের–পায়। আমি আবার থাকি গাঁয়ের এক কোণে পড়ে—আর এই তো সময় যাচ্ছে। ওগুলো আগে সাবধান করা দরকার।
দিন দুই পরে নন্দলাল মামাকে বলিল—আমাকে আজ একবার বেরুতে হচ্ছে মামা। একবার বীজপুরে যাব। লোকো-কারখানায় একটা সন্ধান পেয়েছি—একটু দেখে আসি।
নন্দলাল ইতিপূর্বেও বীজপুরের কারখানায় কাজ খুঁজিয়াছিল কিন্তু তেমন লেখাপড়া জানে না বলিয়া কাজ জোটাইতে পারে নাই। বলিল—লোকো কারখানায় যদি মুগুর ঠ্যাঙাতে পারি তবে এক্ষুণি কাজ জোটে, ভদ্দরলোকের ছেলে, তা তো আর পেরে উঠিনে। এই আমার সঙ্গে পাঠশালায় পড়ত মহেন্দ্র, তারা জেতে যুগী। সে বাইসম্যানি করছে, সাড়ে সাত টাকা হপ্তা পায়—দিব্যি আছে। কিন্তু তাদের ও-সব সয়। আমাকে বলেছিল হেডমিস্ত্রির কাছে নিয়ে যাবে, তা আমায় দ্বারা কী আর হাতুড়ি পিটুনো চলবে?
