সে যত্ন করিয়া কৃষ্ণলালকে খাওয়াইল—কৃষ্ণলাল বিদায় লইয়া যখন আসে তখন বলিল—একটা কথা বলি শোনো। যদি খাওয়া-দাওয়ার কোনো কষ্ট হয়, তবে আমার কাছে এসে অবিশ্যি খেয়ে যাবে। এই বেদ্দ বয়েসে না-খেলে শরীর থাকবে কেন? আমায় কিছু দিতে হবে না এখন। ওই সোনারবেনেদের ঠাকুরবাড়িতে একটা ঝিয়ের দরকার, সকাল-সন্ধে কাজ করব—আমি কাল থেকে সেখানে কাজে লেগে যাব—তা তোমায় বলাও যা না বলাও তাই—তুমি কি আসবে? তোমায় আমি চিনি কিনা?
কৃষ্ণলাল হাসিয়া বলিল—ভালোই তো। তোর রোজগারে এইবার খাই দিনকতক—সে সাধ আমার কাছে অনেকদিন থেকেই। আচ্ছা তাহলে এখন আসি, ওবেলা হয়তো আসব—সন্ধের পর।
তাহার পর এক মাস কাটিয়া যায়, কিন্তু গোলাপীর বাড়ি কৃষ্ণলাল আর আসিল। সুখের দিনে গোলাপীকে সে অনেক দিয়াছে—এখন দুঃখের দিনে বসিয়া বসিয়া গোলাপীর অন্ন ধ্বংস করিবে, তেমন-বংশে জন্ম নয় কৃষ্ণলালের। বিশেষত দেখিতে হইবে, গোলাপীও প্রৌঢ়া—ঝি-গিরি ভিন্ন এখন আর তার কোনো উপায় নাই!
মেসের ভাড়া বাকি পড়িয়াছিল দু-মাসের, মেসের অধ্যক্ষ কৃষ্ণলালকে ডাকিয়া বলিল—কী কৃষ্ণবাবু, আমাদের রেন্ট টার কী হবে?
—আজ্ঞে ক্ষেত্রবাবু, দেখতেই তো পাচ্ছেন—চাকুরিটা গেল, হাতে কিছু নেই। এ অবস্থায়
—ফি-মাসে আমি পকেট থেকে ঘরভাড়া জোগাব কোথা থেকে, সেটাও তো দেখতে হবে! দু-দিন সময় নিন—তারপর আপনি দয়া করে সিট ছেড়ে দিন, আমি অন্য ব্যবস্থা দেখি।
কৃষ্ণলাল পড়িল মহা বিপদে। একে খাইবার পয়সা নাই—তাহার উপর মাথা পুঁজিবার যে জায়গাটুকু ছিল, তাহাও তো আর থাকে না। তিনদিন কাটিয়া গেল, দু-একটি পূর্বপরিচিত বন্ধুর নিকট হইতে চাহিয়া-চিন্তিয়া দু-চার আনা ধার লইয়া পাইস হোটেলের ডাল-ভাতে কোনোরকমে ক্ষুধানিবৃত্তি করিয়া এই তিনদিন পরে তাহার সত্যই অনাহার শুরু হইল। দু-পয়সায় ছাতু বা মুড়ি সারাদিনে—শুধু ছাতু, একটু গুড় বা চিনি জোটে না তাহার সঙ্গে! তাহার পর পেট পুরিয়া জল, কলের নির্মল জল!
মেসে ম্যানেজার আবার ডাক দিলেন। বলিলেন—কিছু হল?
—আজ্ঞা এখনো—এই ভাবচি
—আমার লোক এসে গিয়েচে-কাল মাসের পয়লা। দু-মাসের ভাড়া পকেট থেকে দিয়েচি—এ মাসেরও দিতে হবে? আমিও ছাপোষা মানুষ মশাই—কত লোকসান হজম করি বলুন! আপনি জিনিসপত্তর নিয়ে চলে যান—আমার ভাড়ার দরকার নেই।
পরদিন সকালেই জিনিসপত্রসমেত (একটা টিনের ট্রাঙ্ক ও একটি ময়লা বিছানা) কৃষ্ণলালকে পথে দাঁড়াইতে হইল। বর্ষাকাল—জিনিসপত্র রাখিবার মতো জায়গা কোথায় পাওয়া যায়? গোলাপী অনেকবার মেসে খবর লইয়াছে—মধ্যে একদিন দু-ঘণ্টা মেসের বাহিরের ফুটপাতে বসিয়াছিল তাহার অপেক্ষায় (কারণ ম্যানেজার তাহাকে চেনে, মেসে কুচরিত্রা স্ত্রীলোক ঢুকিতে দিবে না)—কৃষ্ণলাল দুর হইতে দেখিয়া সরিয়া পড়িয়াছিল। এখন গোলাপীর বাড়ি গেলে সে কান্নাকাটি করিবে, আটকাইয়া রাখিতে চাহিবে। নতুবা সেখানে জিনিসপত্র রাখা চলিত।
মেস হইতে কিছু দূরে বড়ো রাস্তার উপর একটা চায়ের দোকানের মালিকের সঙ্গে কৃষ্ণলালের পরিচয় ছিল। বলিয়া-কহিয়া সেখানে কৃষ্ণলাল জিনিসপত্র আপাতত রাখিয়া দিল। তাহার পর উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরিতে ঘুরিতে হঠাৎ দেখিল সে গঙ্গার ধারে আহিরীটোলার স্টিমারঘাটে আসিয়া পড়িয়াছে।
সকাল হইতে কিছু খাওয়া হয় নাই। ঘাটের ধারে একটা গাছতলায় হিন্দুস্থানী ফিরিওয়ালা ভুট্টা পোড়াইতেছে, কৃষ্ণলাল এক পয়সায় একটা ভুট্টা কিনিয়া জলের ধারে বসিয়া সেটি পরম তৃপ্তির সহিত খাইল।
একটা বিড়ি পাইলে হইত এই সময়।
এই সময় একটি ছোকরা ব্যাগহাতে আসিয়া তাহার পাশে ব্যাগটি নামাইয়া পকেট হইতে ঝাড়ন বাহির করিয়া সিমেন্ট বাঁধানো রানার উপর পাতিল। বসিতে যাইবে এমন সময় ছোকরা হঠাৎ পকেটে হাত দিয়া কী দেখিয়া একবার চারিদিকে চাহিল এবং কাছেই কৃষ্ণলালকে দেখিয়া বলিল—একটু দয়া করে ব্যাগটা দেখবেন? এক পয়সার বিড়ি কিনে আনি—
বিড়ি কিনিয়া আনিয়া সে কৃষ্ণলালকে একটি বিড়ি দিল। কৃষ্ণলাল আগেই আন্দাজ করিয়াছিল, ছোকরা একজন ক্যানভাসার। এখন জিজ্ঞাসা করিল—আপনি বুঝি ক্যানভাস করেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ—
—কী জিনিস?
—হাতকাটা তেল—সার্জিক্যাল মলম—
—বেশ পাওয়া যায়? কমিশন কেমন?
—ভালোই। খদ্দেরকে হাত কেটে দেখাতে—সঙ্গে ছুরি থাকে—এই যে—
ছোকরা জামার আস্তিন গুটাইয়া দেখাইল—কবজি হইতে কনুই পর্যন্ত হাতের সমস্ত অংশটা ছুরি দিয়া ফালা ফালা করিয়া চেরা! কৃষ্ণলাল শিহরিয়া উঠিয়া বলিল—এ কী, লাগে না?
ছোকরা হাসিয়া বলিল—লাগে—আবার মলম লাগালে সেরে যায়।
—কীরকম আয় করেন?
—চব্বিশ টাকা থেকে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ টাকা মাসে।
কৃষ্ণলালের মন বেজায় দমিয়া গেল। এত কাণ্ড করিয়া ত্রিশ টাকা! অথচ এমন সময় গিয়াছে—যখন দত্তপুকুরের বাতের তেল ফিরি করিয়া সে মাসে ষাট-সত্তর টাকা অনায়াসে রোজগার করিয়াছে—তাহার জন্য নিজের হাত ছুরি দিয়া ফালা ফালা করিয়া কাটিবার প্রয়োজন হয় নাইঅ্যা
ক্যানভাসারের কাজে আর সুখ নাই। আর সে এ কাজ করিবে না।
পরদিন কৃষ্ণলাল কলিকাতা ছাড়িয়া স্বগ্রামে রওনা হইল। বসিরহাট স্টেশনে নামিয়া সাত ক্রোশ হাঁটিয়া তাহার পৈতৃক গ্রাম ইলশেখালি পৌঁছিতে বেলা তিনটা বাজিল। গ্রামে তাহার দূর-সম্পর্কের জ্ঞাতি ছাড়া অন্য কেহ আপনারজন নাই— নিজের পৈতৃক ভিটা জঙ্গলাকীর্ণ হইয়া পড়িয়া আছে। বহুদিন এদিকে আসে নাই, দেখাশোনাও করে নাই—খড়ের ঘর কতদিন টেকে? আজ প্রায় সতেরো-আঠারো বছর পূর্বে দু-পাঁচ দিনের জন্য একবার পিসিমার শ্রাদ্ধে গ্রামে আসিয়াছিল—সেই আর এই!
