—কত টাকা ভাড়ার মধ্যে হবে বলো—এই আমাদের পাড়াতেই আছে—
—যা তুমি বলবে! কুড়ি কী পঁচিশ
—ত্রিশ টাকায় একখানা ভালো বাড়ি এ পাড়াতেই আছে—তাহলে তাই না হয়—
—হ্যাঁ হ্যাঁ—এ আবার আমায় জিজ্ঞেস করতে হয় মা?
গোলাপীরা নতুন বাড়িতে উঠিয়া আসিল। বড়ো পাঁচী বলিল—ওলো, একটু রয়ে-সয়ে নিস—দেখিস যেন আবার দড়ি না হেঁড়ে! খুব বরাত তোর যাহোক গোলাপী—আর আমাদের ওই বুড়ো রায়বাবু রোজ আসেন আর বাঁধানো দাঁত জলের গেলাসে খুলে রাখেন—ক-দিন বললাম একখানা ঢাকাই শাড়ি আর একটা বাজা-ঘড়ি দাও দেয়ালে টাঙানোের, তা বুড়ো মড়া আজ সাত মাস ঘুরুচ্চে—আজ এলে হয় একবার—ওর দাঁত খুলে জলের গেলাসে ডুবিয়ে রাখা বের করে দেব–
শুধু বাড়ি? গোলাপীর টেবিল-হারমোনিয়ম হইল, জোড়া জোড়া শাড়ি, চেয়ার, এমনকী শেষে কলের গান পর্যন্ত। কোন সুখ গোলাপীর বাকি ছিল? প্রতি রবিবারে কৃষ্ণলালের সঙ্গে গাড়ি করিয়া (অবশ্য ঘোড়ার গাড়ি) কালীঘাটে গঙ্গাস্নান ও দেবীদর্শন করিতে যাওয়া তাহার অভ্যাসের মধ্যে দাঁড়াইয়া গিয়াছিল। বছরের পর বছর কাটিয়া গেল।
গোলাপী আর কৃষ্ণলাল, কৃষ্ণলাল আর গোলাপী।
ইতিমধ্যে গোলাপীকে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে প্রতিষ্ঠিতা দেখিয়া তাহার মা একদিন নবীন কুণ্ডু লেনের মায়া কাটাইয়া বোধ হয় ঊর্বশী বা তিলোত্তমালোকে প্রস্থান করিল। অমন জাঁকের শ্রাদ্ধ এ অঞ্চলে কেহ দেখে নাই তার আগে।
ক্রমে ক্রমে গোলাপীর যৌবনে ভাটা পড়িল। কৃষ্ণলালেরও আয়ের অঙ্ক কমিতে লাগিল। দত্তপুকুরের তেলের অনুকরণে শত শত বাতের তেল বাজারে বাহির হইল—রেলগাড়ির কামরাও নিত্যনূতন ক্যানভাসারে ভরিয়া গেল। যা ছিল কৃষ্ণলালের একার—তাহার মধ্যে অনেক ভাগ বসিল। পূর্বের সচ্ছলতা কমিতে লাগিল।
তারপর দশ-বারো বছর কাটিয়া গিয়াছে।
এই দশ-বারো বছরে সুন্দরী গোলাপী কুরূপা প্রৌঢ়াতে পরিবর্তিত হইয়াছে— তাহার সে বাড়ি চলিয়া গিয়া আবার সাত-আটটি নানা বয়সের সঙ্গিনীর সঙ্গে পূর্বের বাড়িটিতে থাকিতে হয়।
তবুও কৃষ্ণালের যাহা কিছু উপার্জন, এইখানেই তাহার সদব্যয়। গোলাপীও তাহা বোঝে—এই ত্রিশ বছরের মধ্যে সে কৃষ্ণলালকে ছাড়িয়া অন্য কোথাও যায় নাই।
কৃষ্ণলাল বলিল—গোলাপী, চাকরিটা গেল!
গোলাপী বিস্ময়ের সুরে বলিল—সে কী গা!
—বড়োবাবু রাগ করেচে, কাল ক্যাশ জমা দিইনি বলে।
—কী করলে সে টাকা?
–খরচ হয়ে গেল।
—কোথায় খরচ হয়ে গেল—কীসে খরচ হয়ে গেল? তোমার এখনও দোষ গেল না, তা ওরা কী করে রাখে তোমায়? কাল কোথায় গিয়েছিলে?
—সে খরচ নয় গোলাপী। দক্ষিণেশ্বর সেদিন যাওয়ার দরুণ দেনা ছিল, মনে নেই? কাবুলির কাছ থেকে টাকা নিইনি? রাত দশটার পরে ইস্টিশনের গেটে আমায় ধরেচে–রূপি দেও। শেষে ভাবলাম কী, ছোরা মারবে নাকি? ভয়ে পড়ে দিয়ে দিলাম টাকা। কাবুলির দেনা, ও হজম করা কঠিন।
—তা নেও বেশ হয়েছে। এখন খাওয়া হয়েছে, না হয়নি? আমার অদেষ্টে ঝি গিরি নাচছে সে তো দেখতে পাচ্ছি! তখন বনু, পাড়াগাঁয়ের দিকে চলো—কোথাও একখানা ঘরদোর বেঁধে দুজনে থাকা যাবে—তা না, তোমার বাপু কলকেতা আর কলকেতা! কলকেতা ছেড়ে আমি থাকতে পারবোনি! এখন থাক কলকেতায়! কে। এখানে খাওয়ায় দেখি!
—জুটে যাবে, এখানেই জুটে যাবে। অত ভাবনার কারণ নেই—
—তোমার এ বুড়ো বয়সে চাকরি নিয়ে তোমার জন্যে বসে আছে। এখন আর কি তোমার হাত পা নেড়ে বক্তিমে করবার গতর আছে নাকি?
—দেখিয়ে দেব, গোলাপী, দেখবি! ভদ্রমহোদয়গণ, এই সেই বিখ্যাত আদি ও অকৃত্রিম দত্তপুকুরের বাতের তেল—ইহা ব্যবহারে সর্বপ্রকার বাত, বেদনা, মাথাধরা, দাঁত-কনকনানি, কাউর, ছুলি, কাটা-ঘা, পোড়া-ঘা—
গোলাপী হাসিতে হাসিতে বলিল—থাক গো গোঁসাই, আর বিদ্যে দেখাতে হবে …সবাই জানে তুমি খুব ভালো বক্তিমে দিতে পারো—আহা, কী হাত পা নাড়ার ছিরি! যেন থিয়েটারের অ্যাক্টো করছেন!
—তাহলে বল চাকুরিতে নেবে কিনা?
—নেবে না আবার! একশোবার নেবে—আমি যাই এখন ঝি-গিরি করে নিজের পেট চালাবার চেষ্টা দেখি—নিজেই খেতে পাবে না তা আমায় আর খাওয়াবে কোত্থেকে! কী অদেষ্ট যে নিয়ে এসেছিলাম!
কৃষ্ণলাল চলিয়া যাইতে উদ্যত হইয়াছে দেখিয়া গোলাপী বলিল—বোসো, দুটো মুড়িটুড়ি মেখে দি—খেয়ে একটু চা খেয়ে যাও—
অগত্যা কৃষ্ণলাল বসিল। বলিল—তাহলে বক্তৃতা এখনও দিতে পারি, কি বলো?
—নেও, আর আদিখ্যেতায় কাজ নেই। দিতে পারো তো—সত্যি কথা যদি বলি তবে তো পায়া ভারী হয়ে যাবে!
—কী, বলো না গোলাপী, বলতেই হবে।
—তোমার মতো অমন কারো হয় না, আমি তো কতই দেখলাম দাঁতের মাজনের, ওষুধের ফিরিওয়ালা আমাদের এই গলির মুখে হারমোনিয়াম গলায় বেঁধে নাচে, বক্তিমে দেয় পোড়ারমুখোরা—কিন্তু সে-সব ফিরিওয়ালা তোমার মতো নয়—
কৃষ্ণলাল রাগের সুরে বাধা দিয়া বলিল—কীসের সঙ্গে কীসের তুলনা! তোকে নিয়ে আর পারিনে দেখচি—তারা হল ফিরিওয়ালা—আমরা হলুম ক্যানভাসার— হারমোনিয়াম পিঠে বেঁধে যারা গান গেয়ে ঘুঙুর পায়ে দিয়ে নেচে বেড়ায়, আমরা
কী সেই দলের? অপমান হয়, ওকথা আমাদের বোলো না।
–যাক যাক, ভুল হয়েছে, তুমি এখন ঠান্ডা হয়ে বসে চা খেয়ে নেও।
গোলাপীর মন আজ বেশ খুশি। কতদিন পরে যেন যুবক কৃষ্ণলালের অঙ্গভঙ্গি ও সুন্দর সতেজ গলার স্বর সে আবার শুনিল! ত্রিশ বৎসরের অন্ধকার কালো হেঁড়া পর্দাটা কে টানিয়া সরাইয়া দিল!
