সেদিন বসু মহাশয় (ইন্ডিয়ান সিন্ডিকেটের মালিক নৃত্যগোপাল বসু) কৃষ্ণলালকে ডাক দিয়া বলিলেন—পাল মশায়, কাল রাত্রের ক্যাশ জমা দেননি কেন?
—আজ্ঞে আজ্ঞে—অনেক রাত হয়ে গেল—খুলনার ট্রেন—প্রায় বিশ মিনিট লেট।
—দেখুন, আগেও আমি অন্তত সতেরো বার আপনাকে সাবধান করে দিয়েছি। খুলনা ট্রেন দশটা একুশে স্টেশনে আসে, আমি সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত অফিসে বসেছিলাম শুধু আপনার জন্যে। নিত্যাই দু-বার স্টেশনে দেখে এল ট্রেন রাইটটাইমে এসেছে, লেট এক মিনিটও ছিল না—
–আজ্ঞে বড়োবাবু, শরীরটা কাল বড়োই—
–ও আপনার পুরোনো কথা। ও কথা আর শুনবো না আজ। যাক, ক্যাশ এনেচেন এখন?
কৃষ্ণলাল অপরাধীর মতো বড়োবাবুর মুখের দিকে চাহিল। বলিল—ক্যাশটা আনিগে যাই—না—একটু মুশকিল হয়েচে, আচ্ছা আসি—
—যান আসুন—
কৃষ্ণলাল তবুও দাঁড়াইয়া আছে দেখিয়া নৃত্যগোপালবাবু বলিলেন—কী হল?
—আজ্ঞে ওবেলা দেব ওটা। বাসায় এনে রেখেছিলাম, চাবি দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছে, আমি যার সঙ্গে থাকি।
—আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?
—একটু বেড়াতে বার হয়েছিলাম ওই গোলদিঘির দিকে—
—সব বাজে কথা। আমি বিশ্বাস করিনে। কেন করিনে তাও আপনি জানেন। রাত দশটার পরেই ক্যাশ এনে দেওয়ার কথা—আপনি বুড়ো হয়ে গেলেন এই ক্যানভাসারের কাজ করে, জানেন না যে ক্যাশ তখুনি জমা দেওয়ার নিয়ম আছে?
—আজ্ঞে, আজ্ঞে—
—এরকম আরও কতবার হয়েছে বলুন দিকি! আপনার কথার ওপর বিশ্বাস করা যায় না আর। বড়োই দুঃখের কথা। আপনি আমাদের পুরোনো ক্যানভাসার বলে আপনার অনেক দোষ সহ্য করেছি আমরা। কিন্তু এবার আর নয়। আপনি এ মাসের এই ক-দিনের মাইনে নিয়ে যাবেন অফিস খুললে—কমিশনের হিসেবটাও সেই সঙ্গে দেবেন। যান এখন।
অবশ্য এত সহজে কৃষ্ণলাল যাইতে রাজি হয় নাই—নৃত্যগোপালবাবুকে সে যথেষ্টই বলিয়াছিল, নৃত্যগোপালবাবুর বুড়োকর্তাকে গিয়া পর্যন্ত ধরিয়াছিল। শেষপর্যন্ত কিছুই হইল না।
মুশকিল এই, চাকুরি যখন যাইবার হয়, তখন তাহাকে কিছুতেই ধরিয়া রাখা যায় না। মৃত্যুপথযাত্রী মানবের মতোই তার গতিপথ নির্মম, ধরাবাঁধা!
সুতরাং চাকুরি গেল।
তখন বেলা আড়াইটা। সকাল হইতে ইহাকে উহাকে ধরাধরির ব্যাপারেই এতক্ষণ সময় কাটিয়াছে। স্নান-আহার হয় নাই।
২৫/২ রামনারায়ণ মিত্রের লেনে ঢুকিয়াই যে টিনের চালওয়ালা লম্বা দোতলা মাটির ঘর, অর্থাৎ যে মাঠকোঠার ঠিক সামনেই আজকাল কর্পোরেশনের সাধারণ স্নানাগার নির্মিত হইয়াছে—তারই পশ্চিম কোণে সতেরো নম্বর ঘরে আজ প্রায় এগারো বছর ধরিয়া কৃষ্ণলালের বাসা।
কৃষ্ণলাল ঘরে একা থাকে না। ছোট্ট ঘরে তিনটি ময়লা বিছানা মেঝেরে উপর পাতা। সে ঢুকিয়া দেখিল ঘরে কেবল যতীন শুইয়া ঘুমাইতেছে। আর একজন রুমমেট ট্রামের কান্ডাকটার, সাড়ে চারটার পরে সে ডিউটি হইতে ছুটি লইয়া একবার আধঘণ্টার জন্য বাসায় আসে এবং তারপরেই সাজিয়া-গুজিয়া কোথায় বাহির হইয়া যায়।
নীচে পাইস হোটেলে ইহাদের খাইবার বন্দোবস্ত।
কৃষ্ণলালের সাড়া পাইয়া যতীনের ঘুম ভাঙিয়া গেল। সে বলিল—এত বেলায়?
—বেলায় তা কী হবে! চাকরিটা গেল আজ।
—সে কী! এতদিনের চাকরিটা—
—কত করে বললুম বড়োবাবুকে। তা শোনে কী কেউ? গরিবের কথা কে রাখে বলো?
—হয়েছিল কী?
—ক্যাশ জমা দিতে দেরি হয়েছিল। বলে, তুমি ক্যাশ ভেঙেচ!
—তাই তো…তাহলে এখন উপায়?
—দেখি কোথাও আবার চেষ্টা—জুটে যাবে একটা-না-একটা। আমাদের এক দোর বন্ধ হাজার দোর খোলা—আমাদের অন্ন মারে কে?
সামান্য কিছু পয়সা হাতে ছিল—পাইস হোটেল হইতে শুধু ডাল-ভাত খাইয়া আসিয়া কৃষ্ণলাল কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিল, পরে নবীন কুণ্ডু লেনে একটি খোলার বাড়িতে ঢুকিয়া ডাক দিল—ও গোলাপী—গোলাপী—
তাহার সাড়ায় যে বাহির হইয়া আসিল সে বর্তমানে রূপযৌবনহীনা প্রৌঢ়া, পরনে আধময়লা খয়েরি রং-এর শাড়ি, হাতে গাছকয়েক কাচের চুড়ি, দু-গাছা সোনাবাঁধানো পেটি। মাথার চুলে পাক ধরিয়াছে, গায়ের রং এখনও বেশ ফর্সা।
গোলাপীকে ত্রিশ বছর আগে দেখিলে ঠিক বোঝা যাইত গোলাপী কী ছিল? এখন আর তাহার কী আছে? কৃষ্ণলাল তখন সবে ঔষধের ক্যানভাসারের পদে বহাল হইয়াছে—তাহার চমৎকার চেহারা ও কথাবার্তা বলিবার ভঙ্গিতে রেলগাড়ির প্যাসেঞ্জার কী করিয়া সহজেই ভুলিয়া যাইত-জলের মতো পয়সা আসিতে লাগিল।
এই নবীন কুণ্ডু লেনেই অন্য এক বাড়িতে এক বন্ধুর সহিত আসিয়া সে গোলাপীকে দেখে। তখন নতুন যৌবন, হাতেও কাঁচা পয়সা। গোলাপীর তখন বয়স ষোলো-সতেরো। রূপ দেখিয়া রাস্তার লোক চমকিয়া দাঁড়াইয়া যায়। গোলাপীর মার হাতে বছরে বছরে মোটা টাকা জমে। কৃষ্ণলাল সেই হইতেই নবীন কুণ্ডু লেনের নৈশ অধিবাসী। কত কালের কথা,-গোলাপীর ঘরে মেহগনি কাঠের দেরাজ হইল, ঘরের দেয়ালে বিলম্বিত বড়ো বিলাতি কাচ বসানো আয়না হইল, সেকালে প্রচলিত ম্যাকাসার অয়েলের শিশির পর শিশি ভিড় জমাইয়া তুলিল—বাতায়ন মালতী ফুলের টবে সজ্জিত হইয়া বাড়ির অন্যান্য ঘরের অধিবাসীদের মনে ঈর্ষার উদ্রেক করিল।
কাঁচা পয়সা কৃষ্ণলালের হাতে। প্রতিদিনের আয় তিন টাকা—আড়াই টাকার নীচে নয়।
একদিন গোলাপীর মা অভিমানের সুরে বলিল—যাই বলো বাপু, গোলাপী আমায় প্রায়ই বলে, একখানা বাড়ি তার নিজের না-হলে চলে না আর—তা তেমন কপাল কী—এই এক বাড়িতে ছত্রিশ জনার সঙ্গে
—কেন মা? তার ভাবনা কী? কালই ঘর দেখে দিচ্চি—
