কী জানি কেন এখানে আসিয়া কণার কথা তাহার বড়োই মনে পড়িতে লাগিল। আজ তাহার এই সাজানো বাংলো, সুখ ঐশ্বর্য—ইহাদের ভাগ কণা কিছুই পাইল না। সেই সুদূর পাড়াগাঁয়ে দারিদ্র্য ও নিরাশার অন্ধকারের মধ্যে ভাঙা পুরোনো ইটের পুরোনো কোঠাবাড়ি আঁকড়াইয়া পড়িয়া রহিল!
প্রতুলের মনটা যেন হা-হা করিয়া ওঠে। সে বুঝিল, এখনও কণার কথা তাহার মন জুড়িয়া বসিয়া আছে, তাই তাহাকে ভুলিয়া যাওয়া প্রতুলের পক্ষে সহজ নয়। প্রতুলের স্ত্রী বড়লোকের মেয়ে, বাল্যকাল হইতে সে সুখ ভোগ করিয়া আসিতেছে, তাহাকে খাওয়াইয়া-পরাইয়া নতুন জিনিস দেখাইয়া লাভ কী? তেলা মাথায় তেল দেওয়া। বরং যে চিরবঞ্চিতা—জীবন যাহাকে কিছু দেয় নাই— তাহাকে যদি আজ সে—কেন এমন হয় জীবনে কে বলিবে?
যে পাইয়া আসিতেছে সে-ই বরাবর পায়, যে পায় না সে কখনই পায় না। যাহাকে খাওয়াইয়া সুখ পরাইয়া সুখ, দেখিয়া দেখাইয়া সুখ—তাহাকে খাওয়ানো যায় না, পরানো যায় না, দেখানোও যায় না।
কেন এমন হয়?
এসব চার-পাঁচ বছর আগের কথা।
আজ কয়েক দিন হইল প্রতুল কলিকাতায় আসিয়াছে চাকুরির খোঁজে।
কোলিয়ারি আছে কিন্তু প্রতুলের স্ত্রী নাই। পুনর্মুষিকের পর্যায়ে আসিয়া দাঁড়াইবার ইতিহাস আছে। সংক্ষেপে এই যে, গত বৎসর স্ত্রীর মৃত্যুর পর হইতেই শ্বশুরের কোলিয়ারিতে থাকা প্রতুলের ভালো মনে হইল না এবং তারপরে দেখা গেল প্রতুলের শ্বশুরেরও তাহা ক্রমশ ভালো বলিয়া মনে হইতেছে না। সুতরাং আজ কয়েকদিন হইল প্রতুল তাহার ছেলেটিকে সঙ্গে লইয়া কলিকাতায় আসিয়া এই পরিচিত মেসটিতে উঠিয়াছে এবং চাকুরির সন্ধানে আছে।
এই সেই শশধর। কণার ভাই। এতকাল পরে হঠাৎ এভাবে কোথা হইতে কেমন করিয়া আসিয়া পড়িল! কিছুক্ষণ বসিয়া শশধর চা খাইয়া সুস্থ হইবার পরে প্রতুল বলিল, তারপরে কী মনে করে? কেমন আছ?
শশধর বলিল, ভালোই আছি। আপনি এখানে আছেন তা শুনলুম জীবনদার কাছে। আপনি নাকি চাকুরি খুঁজছেন? সেই জন্যেই আমার এখানে আসা। আপনার সব কথাই শুনেছি।
কী ব্যাপার? চাকুরি সন্ধানে আছে নাকি?
আমাদের দেশের মিউনিসিপ্যাল অফিসের সেই কেরানির পোস্ট খালি হয়েছে। আপনি গেলে ওরা লুফে নেবে এখুনি। কিশোরী চাটুয্যে এখন চেয়ারম্যান, আপনাকে বড়ো ভালোবাসত, আমাদের আপনার লোক। দিন একখানা দরখাস্ত করে। আমি লিখলে একবার গিয়ে ইন্টারভিউ করে আসবেন চেয়ারম্যানের সঙ্গে।
আবার সেই নাথপুর! সেই মিউনিসিপ্যাল অফিসের ত্রিশ টাকা বেতনের কেরানির পদ! তাহাই হউক। প্রতুল দরখাস্ত লিখিয়া পরদিন সকালে শশধরের হাতে দিল। চাকরি না-করিলে চলিবে না। ছোটো ছেলেটি লইয়া ত্রিশ টাকায় তাহার খুব চলিয়া যাইবে। তাহার বাবা-মা জীবিত বটে, কিন্তু ছেলের রোজগারের উপর তাঁহাদের নির্ভর করিতে হয় না।
দিন পনেরো পরে শশধর লিখিল—চাকুরির সব ঠিক, একবার আসিয়া চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করা দরকার। প্রতুল ছেলেকে লইয়া নাথপুরে গেল। দশ বৎসর আসে নাই এদিকে, অথচ যেন মনে হইতেছে কাল এ গ্রাম ছাড়িয়া গিয়াছে। কণার কথা সে শশধরকে জিজ্ঞাসা করিতে পারে নাই, কোথায় যেন বাধিয়াছিল—বহু চেষ্টা করিয়াও পারে নাই। আজ স্টেশনে নামিতেই কণার কথা প্রথমেই মনে পড়িল। কণা যেখানে থাকে, সেখানেই সে থাকিবে জীবনের বাকি কয়টা দিন।
বেলা প্রায় একটা, শশধর স্টেশনে ছিল। বলিল—প্রতুলদা, আপনার সেই পুরোনো বাসা ভাড়া করে রেখেছি। কোনো অসুবিধে হবে না। আর কণা বলে দিয়েছে আজ ওখানে খাবেন। চাকুরি হয়ে যাবে এখন, সব বলা আছে।
প্রতুল বলিল—এবেলা খাব না। খোকাকে বরং নিয়ে যাও কণার কাছে। আমি অফিসের পরে যাব। আমরা দুজনেই সকালে খেয়ে গাড়িতে চড়েচি।
—বিকালের দিকে চেয়ারম্যানের সহিত সাক্ষাৎ করিবার পরে প্রতুল শশধরদের বাড়ি গেল। প্রথমেই কণা আসিয়া সামনে দাঁড়াইয়া বলিল—প্রতুলদা, এতদিন পরে মনে পড়ল? তারপর সে পায়ের ধুলো লইয়া প্রণাম করিল।
প্রতুল অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল। সে কণা কোথায়? কোথায় সেই লাবণ্যময়ী কিশোরী? এ কণাকে সে চেনে না। কণা পূর্বাপেক্ষা শীর্ণা হইয়াছে। যৌবনের সৌন্দর্য অন্তর্হিত হইয়াছে অনেককাল বলিয়াই হয়—যদিও বর্তমানে সাতাশ আটাশ বছরের বেশি বয়স নয় কণার। মুখের কোথাও পূর্ব লাবণ্যের চিহ্ন আছে। কিনা প্রতুল বিশেষভাবে খুঁজিয়া দেখিয়াও পাইল না।
সঙ্গে সঙ্গে প্রতুল দেখিল কণার উপর তাহার সে ভালোবাসা যেন এক মুহূর্তে মন হইতে কপূরের মতো উবিয়া গিয়াছে। এ কণা অন্য একজন স্ত্রীলোক—তাহার ভালোবাসার পাত্রী, তাহার পরিচিত কণা এ নয়। কাহাকে সে ভালোবাসিবে?
কণা অবশ্য খুব আদর-যত্ন করিল। আহারাদির পরে প্রতুলকে পান আনিয়া দিয়া কণা বলিল, কতদিন আসেননি, অনেক কথা আছে আপনার সঙ্গে প্রতুলদা। বসুন আমি আসছি।
প্রতুল ভাবিতেছিল, ভাগ্যে কণার সঙ্গে তাহার বিবাহের সুবিধা বা যোগাযোগ হয় নাই! কি বাঁচিয়াই গিয়াছে সে! ভগবান বাঁচাইয়া দিয়াছেন। উঃ!
দু-চারটি মামুলি কথা বলিয়া প্রতুল ছেলের হাত ধরিয়া উহাদের বাড়ি হইতে বাহির হইয়া হাঁপ ছাড়িয়া যেন বাঁচিল।
পরদিন সকালে শশধরকে ডাকিয়া বলিল, না ভাই, ছেলেটার শরীর খারাপ হয়েছে কাল রাত্রেই। তোমাদের যা ম্যালেরিয়ার দেশ, ছেলে নিয়ে এখানে চাকুরি পোষাবে না। অন্যত্র চেষ্টা দেখিগে।
ক্যানভাসার কৃষ্ণলাল
চাকুরি গেল। এত করিয়াও কৃষ্ণলাল চাকুরি রাখিতে পারিল না। সকাল হইতে রাত দশটা পর্যন্ত (ডাউন খুলনা প্যাসেঞ্জার, ১০-৪৫ কলিকাতা টাইম) টিনের সুটকেস হাতে শিয়ালদ হইতে বারাসত এবং বারাসত হইতে শিয়ালদ পর্যন্ত ‘তাঁতের মাকু’র মতো যাতায়াত করিয়া ও ক্রমাগত “দত্তপুকুরের বাতের তেল, দত্তপুকুরের বাতের তেল—বাত, বেদনা, ফুলো, কাটা ঘা, পোড়া-ঘা, দাঁত কনকনানি, এককথায় যতরকম ব্যথা, শূলানি, কামড়ানো আছে—সব এক নিমেষে চলে যাবে—আজ চব্বিশ বছর এই লাইনে, ওষুধটি প্রত্যেক ভদ্রলোক ব্যবহার করছেন, সকলেই এর গুণ জানেন—” বলিয়া চিৎকার করিয়াও চাকুরি রাখা গেল না।
