শীতকালের বিকাল, কণাদের বাড়ির চারিপাশে বনজঙ্গলে বনমৌরি লতায় ফুল ফুটিয়াছে—বেশ একটা উগ্র সুগন্ধে অপরাহের শীতল বাতাস ভরপুর। ভাঙা ইটের পাঁচিলের গায়ে রাঙা রোদ পড়িয়া কণাদের পুরোনো পৈতৃক ভদ্রাসনের প্রাচীনত্ব ও দারিদ্র্য যেন আরও বাড়াইয়া তুলিয়াছে।
কণা বসিল, প্রতুলের মুখের দিকে আগ্রহের সহিত চাহিয়া বলিল, কী প্রতুলদা?
—তোমাকেই কথাটা বলি, কিছু মনে কোরো না কণা। অনেকদিন থেকে কথাটা আমার মনে রয়েছে—বলি বলি করে বলা ঘটে উঠছে না। তুমি আমার বিয়ে করবে কণা? আমি অত্যন্ত সৌভাগ্য বলে মনে করব, যদি—
কণা খানিকটা চুপ করিয়া রহিল। খানিকক্ষণ দুজনের কেহই কথা বলিল না। তারপরে কণা ধীরে ধীরে অনেকটা চাপা সুরে বলিল, সে হয় না, প্রতুলদা।
প্রতুল বিস্মিত হইল। কণার এ উত্তর সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত তাহার কাছে। বলিল, হয় না কণা?
কণা মাটির দিকে চোখ রাখিয়া পূর্ববৎ নিম্নসুরে বলিল, হয় না প্রতুলদা। কারণ আছে অবিশ্যি। কিন্তু সে-কথা বলব না। বিয়ে হতে পারে না।
কেন? কণা কি অন্য কোনো যুবককে ভালোবাসে? কই, আর কোনো যুবককে তো প্রতুল কোনোদিন উহাদের বাড়িতে যাওয়া-আসা করিতে দেখে নাই? ব্যাপার কী?
—কারণটা জানতে পারলে বড়ো ভালো হত, কণা। খুব বেশি বাধা কিছু আছে কি?
—হ্যাঁ।
—কারণটা বলবে?
—আপনি কিছুই জানেন না? দাদা কিছু বলেনি আপনাকে?
প্রতুল আরও বিস্মিত হইল। কী জানিবে সে! শশধরই বা তাহাকে কী বলিবে! অত্যন্ত আগ্রহ ও কৌতূহলের সঙ্গে সে বলিল—না কণা, তুমি কী বলছ আমি কিছুই বুঝতে পারচিনে। শশধর কী বলবে আমায়?
—আমি বিধবা।
—তুমি!
—হ্যাঁ, আট বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়—তেরো বছর বয়সে—এই পাঁচ বছর হল।
প্রতুলের মাথা বন বন করিয়া ঘুরিতে লাগিল যেন। সর্বশরীর যেন ঝিম ঝিম করিতেছে। কণা বিধবা! কণার বিবাহ হইয়াছিল আট বছর বয়সে! অদৃষ্টের কী দারুণ পরিহাস! আর সে কত আকাশ-কুসুম না-রচনা করিয়াছে মনে মনে এই কণাকে লইয়া…ইহাদের প্রতি মনে মনে কত অবিচার করিয়াছে তাহাকে জামাই করিবার উদ্দেশ্য প্রতি-আরোপ করিয়া! গ্লানি ও অনুতাপে প্রতুলের মন পূর্ণ হইয়া গেল।
—কিন্তু কণা, এ কথা তো আমি কিছুই জানিনে। আমাকে তো কেউ কিছু বলেনি।
—আমার কিন্তু ধারণা ছিল যে, আপনি জানেন, দাদা বলেছে আপনাকে। আমিও অবাক হয়ে গেছি এ কথা শুনে।
—একটা কথা বলব! বিধবার পুনর্বিবাহ তো হচ্ছে সমাজে।
—প্রতুলদা ওসব কথা থাক। যা হয় না যেখানে, সেখানে সে-কথা তোলা মিথ্যে।
—না, আমার কথার উত্তর দাও কণা, আমি অমন ধরনের কথা শুনব না তোমার মুখে; তোমায় সুখী করার দিকে আমার লক্ষ্য। সেজন্যে সংস্কার এবং সমাজ আমি অনায়াসেই ঠেলব।
কণার চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িল। সে মুখ নীচু করিয়া আঁচলের প্রান্ত দিয়া চোখ মুছিয়া বলিল—আপনার পায়ে পড়ি প্রতুলদা—
প্রতুল আর কিছু বলিল না। পরদিন অফিসে আসিয়াই সে চাকুরিতে ইস্তফা দিয়া দিল এক মাসের নোটিশে। এখানে আর থাকিবে না, থাকিয়া লাভ নাই।
এই এক মাসের মধ্যে সে কণাদের বাড়ি গেল প্রায় প্রত্যেকদিনই, কিন্তু চাকুরিতে নোটিশ দেওয়ার কথা কাহাকেও বলিল না। বিবাহ সম্বন্ধে কণার সাথে আর কোনো কথাও সে বলে নাই, যদিও কণা আগের মতোই তাহার কাছে নিঃসংকোচে আসে, বসে, কথাবার্তা কয়।
যাইবার পূর্বে সে কণাদের বাড়ি গেল। অন্যান্য কথাবার্তার পর সে বলিল, কণা, আমি এখানে থেকে চলে যাচ্ছি কাল।
কণা আশ্চর্য হইয়া প্রতুলের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল—চলে যাবেন? কেন?
—চাকুরি ছেড়ে দিচ্চি।
—সে কী কথা!
—কথা ঠিকই তাই। কাল যাচ্ছি।
—সত্যি?
—সত্যি। মিথ্যে বলে লাভ কী?
—সে-কথা তো একদিনও বলেননি—
—না বলিনি। বলেই বা লাভ কী? যেতেই যখন হবে।
—কেন, এখানে আপনার অসুবিধা কী হচ্ছিল? ভালো চাকুরি পেয়েছেন বুঝি কোথাও?
—কোথাও না।
কণা চুপ করিয়া রহিল। প্রতুলও তাই।
খানিক পরে কণা বলিল, যাবেন তা জানতুম। বিদেশি লোক আপনি আপনাকে তো ধরে রাখা যাবে না। আমাদের কথা আপনি শুনবেনই বা কেন?
—অনেক জ্বালাতন করেচি, কিছু মনে কোরো না কণা।
কণা চুপ করিয়া রহিল।
এই পর্যন্ত সেদিন কণার সঙ্গে কথাবার্তা। পরদিন আর একবার কণাদের বাড়ি যাইবার কথা ভাবিয়াও প্রতুলের যাওয়া ঘটিল না, দুপুরের ট্রেনে প্রতুল চলিয়া আসিল।
সারাপথ কেবল কণার কথা মনে হইল প্রতুলের। সেই অভাব-অনটনের সংসারে চিরকাল কাটাইতে হইবে তাহাকে। গরিবের ঘরের অল্পবয়সি বিধবা মেয়ে, দাদার সংসার ছাড়া আর উপায় নাই। কণার জীবন অন্ধকার, কোন আলো নাই কোনোদিক হইতে। প্রতুলের বুকের মধ্যে কোথায় যেন টনটন করিতেছে। কণাকে কাহার কাছে রাখিয়া যাইতেছে সে!
পরক্ষণেই ভাবিল, কী মুশকিল! কণা রয়েছে তার বাপের ভিটেতে ভাই বোনের কাছে, দাদার কাছে। আমার সঙ্গে তার কী?
মাস পাঁচ-ছয় পরে, সেই ফান্তুন মাসেই মায়ের পীড়াপীড়িতে তাহাকে বিবাহ করিতে হইল।
প্রতুলের শ্বশুরের দু-তিনটি ছোটো বড়ো কোলিয়ারি ছিল। কিন্তু কলিয়ারিগুলির অবস্থা ছিল খারাপ। চুরি হইত, নির্ভরযোগ্য ম্যানেজারের অভাবে কোলিয়ারিগুলি লোকসানি মহল হইয়া পড়িয়া থাকিত।
প্রতুলের শ্বশুর একদিন প্রস্তাব করিলেন—সে অফিসে পরের চাকুরি না-করিয়া যদি কোলিয়ারিগুলির তত্বাবধান করে, তবে অফিসে যে বেতন পাইতেছে তাহা তো পাইবেই, উপরন্তু ভবিষ্যতে একটা উন্নতির আশা থাকে শ্বশুর-জামাই উভয়েরই। প্রতুল শ্বশুরের প্রস্তাবে রাজি হইল। আরও বছর দুই পরে কোলিয়ারির অবস্থা সত্যই ফিরিল প্রতুলের কর্মদক্ষতায়। প্রতুল আসানসোলের রেলস্টেশন হইতে তিন মাইল দূরে বুদ্ধচক কোলিয়ারিতে সাজানো বাংলোতে স্ত্রী-পুত্র (ইতিমধ্যে তাহার একটি ছেলে হইয়াছিল) লইয়া বাস করে—একটু স্টাইলের উপরই থাকে, না-থাকিলে চলে না, কাজের খাতিরেই থাকিতে হয় নাকি।
