কণা আজকাল প্রতুলের দিকেও বড়ো টানে, তাহার সুখ-দুঃখ, সে রাত্রে ঘুমাইল কিনা, তাহাকে চা ঠিক সময়ে দেওয়া এবং সেই সঙ্গে কিছু না-হোক এক মুঠা মুড়িও তেল নুন মাখিয়া দেওয়া—এসব দিকে কণার সতর্ক দৃষ্টি—এত দুঃখ বিপদের মধ্যেও—ইহাও প্রতুলের মনে বড়ো আনন্দ দিয়াছে কয়দিন।
শ্রাদ্ধের আগের দিন প্রতুল শশধরকে নিজের মাহিনা হইতে কুড়িটি টাকা দিয়া তাহাকে কী করিতে হইবে-না-হইবে পরামর্শ দিল, জিনিসপত্র ও লোকজন খাওয়ানোর ফর্দ ধরিল। সামান্য তিলকাঞ্চন শ্রাদ্ধ হইবে—শ্রাদ্ধের দিন বারোটি ব্রাহ্মণ এবং নিয়মভঙ্গের দিন জন পনেরো জ্ঞাতি-কুটুম্ব খাইবে। এসব কথা কণাদের বাড়ি বসিয়াই হইতেছিল—পরামর্শান্তে প্রতুলকে বসাইয়া রাখিয়া শশধর কোথায় বাহির হইয়া গেল। প্রতুলের বসিয়া থাকিবার কারণ সে এখনও বৈকালিক চা পান করে নাই, না-খাইয়া গেলে কণা চটিয়া যাইবে।
কণা চা লইয়া ঘরে ঢুকিল, প্রতুল কণার হাত হইতে পেয়ালাটি লইয়া বলিল —বোস কণা। কালকার সব জোগাড় করে রাখো—ফর্দ দিয়েছেন নবীন ভটচায্যি। সন্ধের পর একবার দেখে নিও সে-খানা—শশধর কেনাকাটা করতে গিয়েছে, যদি কিছু বাদ পড়ে, আনিয়ে নিও।
—আপনি টাকা দিলেন?
—আমি? হ্যাঁ—তা ইয়ে—
—কত টাকা দিলেন?
—সে কথায় দরকার? সে এমন কিছু নয়—তা ছাড়া ধার—শশধর আবার আমায়—
—দাদা আবার আপনাকে ছাই দেবে। আপনাকে কথাটা বলব ভেবেচি। কেন আপনি আমাদের পেছনে এমন খরচ করবেন? রোগের সময় টাকা দিয়েছেন— আবার কাজের সময় দেবেন! আপনি কী এমন ন-শো পঞ্চাশ টাকা ব্যাঙ্কে জমিয়েছেন শুনি? মাইনে তো পান ত্রিশটি টাকা। আপনার নিজের বাবা-মা ভাই বোন রয়েছে, তাদের কী দেবেন? নিজে কী খাবেন? আপনাকে বলি শুনুন। দাদা বেকার বসে আছে, আপনার কাছ থেকে টাকা নিয়ে তা কখনো আর উপুড় হাত করবে না। ওর ওই স্বভাব। আপনি আর একপয়সা দেবেন না বলে দিচ্ছি। মায়ের কাজ হোক-না-হোক আপনার কী? আপনি কেন দিতে যাবেন?
প্রতুল বিস্মিত দৃষ্টিতে কণার মুখের দিকে চাহিল। কণার মুখে একটি সবল তেজস্বী সারল্য…সত্যবাদী ও স্পষ্টভাষী ওর ডাগর চোখ দুটি, যা খোশামোদ করিতে বা ছলনা করিতে শেখে নাই, আজও প্রতুলের মনে হইল।
কিন্তু কণা আজ এ কী নতুন ধরনের কথা বলিল? ভারি আশ্চর্য কথা। এতদিন কণাকে চিনিতে পারে নাই সে, আজ চিনিল বটে। শ্রদ্ধায় ও সম্ভ্রমে প্রতুলের মন পূর্ণ হইয়া উঠিল। কণা সাধারণ মেয়ে নয়।
শ্রাদ্ধশান্তি মিটিয়া গেল। প্রতুল নিয়মিত উহাদের বাড়ি যাতায়াত করিতে লাগিল। কণার সেবায় অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছে, সে যত্ন ও সেবায় এতটুকু খুঁত কোনোদিন প্রতুলের চোখে পড়িল না আজও। মায়ের শোক খানিকটা প্রশমিত হইবার পরে কণা আরও সুশ্রী হইয়া উঠিয়াছে এখন, পরিস্ফুট যৌবন-শ্রী তাহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে।
প্রতুল ইতিমধ্যে মনে মনে ভাবিয়া স্থির করিয়াছে কী করিয়া কথাটা এইবার সে পাড়িবে। কথাবার্তা পাকা না-হয় রহিল, অশৌচ কাটিয়া গেলে বিবাহ হইতে বাধা কী! পরের বাড়ির তরুণী পূর্ণযৌবন মেয়ের সহিত এভাবে মেলামেশা উচিত হইতেছে না—একটা পাকাপাকি কথা হওয়া ভালো। বৈকালে প্রতুল কণাদের বাড়ি গেল।
কণা আসিয়া বলিল, ওইরে বাস! আমি বলেছি কিনা বলেছি, প্রতুলদা তো এল বলে। দুধ নেই চা করবার, ওবেলা পিন্টু দুধের কড়া আলগা করে দিয়েছে, আর সব দুধখানি উপুড় করে রেখে দিয়েচে বেড়ালে।
-–বসো কণা এখানে। চা হবে এখন, তার জন্যে কিছু নয়।
কণা এখন মাতৃহীন ছোটো ভাই-বোনের মায়ের স্থান পূর্ণ করিয়া আছে, সংসারে সেই এখন কত্রী, প্রতুল তা জানে। কিন্তু এই ক্ষুদ্র কীটি মাঝে মাঝে কীরকম ফাঁদে পড়িয়া যায় পয়সা-কড়ির অভাবে তাহাও প্রতুল দেখিয়াছে। কণা তাহাকে কিছু বলে না—কোনোদিন না—কিন্তু সে নানা রকমে টের পায়, যেমন আজই পাইল।
কণা কী কাজে একটু উঠিয়া গিয়াছে, প্রতুল কণার ছোট্ট ভাই বিনুকে ডাকিয়া বলিল, কি খেয়েচ খোকাবাবু?
—ভাত খেয়েছি।
—এখন কী খেয়েচ?
—আর কিছু নেই, ভাত নেই। দিদি খায়নি।
তখন সেখানে কণার ছোটো বোন এগারো বছরের পিন্টু আসিল। প্রতুল বলিল, কণা খায়নি কেন?
পিন্টু বলিল, ভাত ছিল না। ওবেলা চাল ধার করে নিয়ে এল দিদি ওই সরকারদের বাড়ি থেকে। দাদা কাল কোথায় গিয়েছে, আজও তো ফিরল না। মহেশ চক্কত্তির দোকানে টাকা পাবে বলে চাল-ডাল দেয় না আজকাল, দিদি এখন কোথায় পাবে, কোন দিকে যাবে?
প্রতুল অনেক কথা ভাবিল। কণা সংসার চালাইতে পারে না টাকার অভাবে, সে নিজে যদি বাহির হইতে দু-দশ টাকা সাহায্য করে সেটা যেন ভিক্ষা দেওয়ার মতো দেখায়। সে টাকা হাত পাতিয়া লওয়ায় কণার গৌরব ক্ষুন্ন হয়। কণাকে সে অপমানের মধ্যে টানিয়া আনিতে তাহার মন সরে না, অথচ এরকম কষ্ট করিয়াই বা কণা কতদিন বাঁচিবে?
সবদিকের মীমাংসা করিতে হইলে বিবাহের কথাটা পাড়িতে আর বিলম্ব করা উচিত নয়। আজই সে কণার সঙ্গে এ বিষয়ে একটা বোঝাপড়া করিবে আগে— তাহার পরে শশধরকে জানাইলেই চলিবে এখন। শশধরটা মানুষ নয়, সে ইতিমধ্যে বেশ বুঝিয়া ফেলিয়াছে।
কণা চা লইয়া ঘরে ঢুকিল, বলিল—একটু দেরি হয়ে গেল প্রতুলদা, দুধ ছিল না একেবারে। আনলাম রায় কাকাদের বাড়ি থেকে। দেখুন তো চা-টা খেয়ে কেমন হয়েছে?
প্রতুল বলিল—ব্যস্ত হয়ে ঘুরচ কোথায় কণা? বোসো এখানে, কথা আছে।
