দিনকতক যাইবার পরে প্রতুল ইহাতে সংকোচ বোধ করিতে লাগিল। শশধরদের সাংসারিক ব্যবস্থা বিশেষ সচ্ছল নয়, রোজ রোজ তাহার জলযোগের জন্য উহাদের খরচ করাইতে প্রতুলের মন সায় দিল না। সে খাওয়া বন্ধ করিল। অবশ্য মুখে সোজাসুজি কোনো কিছু বলিতে পারা সম্ভব ছিল না—তবে যাইবার ইচ্ছা না-থাকিলে ওজর-আপত্তির অভাব হয় না।
একদিন শশধর আসিয়া বলিল—আজ যেতেই হবে প্রতুলদা—কণা বলেছে তোমাকে নিয়ে না-গেলে সে ভয়ানক রাগ করবে আমার ওপর।
প্রতুল আশ্চর্য হইয়া বলিল—কণা?
—হ্যাঁ হ্যাঁ, কণা—আমার ছোটো বোন। ভুলে গেলেন নাকি? চলুন আজ। প্রতুলের মনে বিস্ময় এবং আনন্দ দুই-ই হইল। কণার বয়েস পনেরো-ষোলো— রং ফর্সা, বেশ সুশ্রী মেয়ে। কথাবার্তা বলে চমৎকার—পাড়াগাঁয়ের তুলনায় লেখাপড়াও জানে ভালো। তাহার সম্বন্ধে কণা আগ্রহ দেখাইয়াছে কথাটা শুনিতে খুব ভালো।
কণা সেদিন প্রতুলের কাছে কাছেই রহিল। কয়দিন না-দেখাশোনার পরে দুজনেরই দুজনকে যেন বেশি করিয়া ভালো লাগিতেছে। ফিরিবার সময় প্রতুলের মনে হইল, কণাকে আজ যেন তাহার অত্যন্ত আপনজন বলিয়া মনে হইতেছে। কেন?
নির্জন বাসায় ফিরিয়া কথাটা সে ভাবিল। কণা মেয়েটি ভালো, সত্যই বুদ্ধিমতী, সেবাপরায়ণা। তাহাদেরই পালটি ঘর। আহা, এই জন্যই কী শশধরের এ তাগাদা—তাহাকে ঘন ঘন বাড়ি লইয়া যাইবার জন্য?
কথাটা মনে হইবার সঙ্গে সঙ্গে এ চিন্তাও তাহার মনে না-আসিয়া পারিল না, তাই কণার অত গায়ে পড়িয়া আলাপ করার ঝোঁক তার সঙ্গে।
প্রতুল আবার শশধরদের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করিল।
শশধর আসিয়া পীড়াপীড়ি আরম্ভ করিতে আদৌ বিলম্ব করিল না। এবার কিন্তু প্রতুল অত সহজে ভুলিল না। তাহার মনে দ্বন্দ্ব লাগিয়াছে। কণা তাহাকে সত্যই ভালোবাসে, না তাহাকে বিবাহের ফাঁদে ফেলিবার জন্য ইহা তাহার একটি ছলনা মাত্র? কণার মা কীজন্য তাহাকে অত আদর করিয়া থাকেন বা শশধর তাহাকে বাড়ি লইয়া যাইতে অত আগ্রহ দেখায়—ইহার কারণ প্রতুলের কাছে ক্রমশ স্পষ্ট হইয়া উঠিল। গরিবের মেয়ে, বিবাহ দিবার সংগতি নাই উপযুক্ত পাত্রে—সে হিসাবে প্রতুল পাত্র ভালোই, ত্রিশ টাকা মাহিনা পায় অফিসে, বয়স কম, দেখিতে শুনিতেও এ পর্যন্ত তো প্রতুলকে কেহ খারাপ বলে নাই।
ইহাদের সকল স্নেহ ভালোবাসা আগ্রহের মধ্যে একটি গৃঢ় স্বার্থসিদ্ধির সন্ধান জানিয়া প্রতুলের মন ইহাদের প্রতি নিতান্ত বিরূপ হইয়া উঠিল।
মাস-দুই কাটিয়া গিয়াছে।
ভাদ্র মাস। সাত-আট দিন বেশ ঝলমলে শরতের রৌদ্র—খালের ধারে কাশফুল ফুটিয়াছে, জল-কাদা শুকাইয়া আসিতেছে। পূজার ছুটির আর বেশি দেরি নাই, প্রতুল বসিয়া বসিয়া সেই কথা ভাবিতেছিল—মিউনিসিপ্যাল অফিসে বারো দিন ছুটি।
এই সময় একদিন কাহার মুখে প্রতুল শুনিল শশধরের বাড়িতে বড়ো বিপদ। শশধরের মা মৃত্যুশয্যায়। শুনিয়া সে ব্যস্ত হইয়া উঠিল। শশধর এদিকে অনেক দিন আসে নাই তা নয়, প্রতুল উহাদের বাড়ি না-গেলেও সে এখানে প্রায়ই আসিয়া বসিয়া থাকে, চা খায়, গল্পগুজব করে। কই, মায়ের এমন অসুখের কথা তো শশধর বলে নাই?
প্রতুল শশধরদের বাড়ি গেল। এমন বিপদের সময় না-আসিয়া চুপ করিয়া থাকা —সেটা ভদ্রতা এবং মনুষ্যত্ব উভয়েরই বিরুদ্ধে। প্রতুলের কড়া নাড়ার শব্দে কণা আসিয়া দরজা খুলিয়া দিল। প্রতুলের মনে হইল কণা তাহাকে দরজায় দেখিয়া বিস্মিত হইয়াছে। প্রতুলই আগে কথা কহিল। বলিল, মা কেমন আছেন?
—আসুন বাড়ির মধ্যে। দাদা নেই বাড়িতে, ডাক্তার ডাকতে গিয়েছে। অবস্থা ভালো না।
—চলো চলো, দেখি গিয়ে। আমি কিছুই জানিনে কণা অসুখের কথা, শশধর কদিন আমার ওখানে যায়নি। তবে মাঝে যা গিয়েছিল, তখন কিছু বলেনি।
—বলবে কী, মার অসুখ আজ সবে পাঁচ দিন হয়েছে তো। পরশু রাত্তির থেকে বড়াবাড়ি যাচ্ছে। এর আগে এমন তো হয়নি।
ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া যেটা প্রতুলের চোখে সর্বপ্রথম পড়িল, সেটি ইহাদের দারিদ্র্যের কুশ্রী ও মলিন রূপ। সে নিজেও বড়োলোকের ছেলে নয়, কিন্তু তবুও তাহাদের বাড়িতে গৃহস্থালীর যে শ্রীছাঁদ আছে, এখানে তার সিকিও নাই।
কণা বলিল, এতকাল আসেননি কেন এদিকে? আমাদের তো ভুলেই গিয়েছেন।
প্রতুলের মনে কষ্ট হইল। কণার ক্লান্ত, উদবেগপূর্ণ এবং ঈষৎ বিষণ্ণ চোখ দুটির দিকে চাহিয়া তাহার মনে হইল সে বড়ো নিষ্ঠুর কাজ করিয়াছে এতদিন এখানে না-আসিয়া। কণা বড়ো ভালো মেয়ে, যতক্ষণ প্রতুল তাহাদের বাড়ি রহিল ততক্ষণের মধ্যেই প্রতুল জানিতে পারিল কণার কী কর্তব্যজ্ঞান, রুগণ মায়ের কী সেবাটাই করিতেছে কণা। এত দুঃখে উদবেগেও কণার সুন্দর রূপ ম্লান হয় নাই। অনেক মেয়েকে সে দেখিয়াছে—সাজিলে-গুজিলে সুশ্রী বলিয়া মনে হয়, কিন্তু মলিন কাপড় পরিয়া থাকিলে বা চুল না-বাঁধা থাকিলে কিংবা হয়তো সদ্য ঘুম হইতে ওঠা অবস্থায় দেখিলে বড়ো খারাপ দেখায়।
কণার রূপের মধ্যে একটা কিছু আছে যাহাতে কোনো অবস্থাতেই খারাপ দেখায় না। এত অনিয়ম, রাত্রি জাগরণ, উদবেগ, পরিশ্রমের মধ্যেও কণা তেমনই ফুটন্ত ফুলটির মতো তাজা, তেমনই লাবণ্য, ওর সুকুমার মুখে।
কণার সম্বন্ধে এই একটি মূল্যবান সত্য আবিষ্কার করিয়া প্রতুল আনন্দিত ও বিস্মিত দুই-ই হইল।
ইহার পর প্রতুল কয়দিনই কণাদের বাড়ি নিয়মিত যাইতে লাগিল—রোগিণীর সেবায় সেও কণাকে সাহায্য করিত—স্টোভ জ্বালা, জল গরম করা, বিছানার চাদর বদলানোর সময় রোগিণীকে বিছানার একপাশে সরানো, ডালিম বেদানার দানা ছাড়ানো। পঞ্চম দিনের প্রাত:কালে কণার মা যখন ইহলোকের মায়া কাটাইয়া চলিয়া গেলেন তখন সেই শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সে যথাযোগ্য সান্ত্বনা দিবার চেষ্টা করিতে লাগিল, দাহকার্যের খরচপত্র নিজ হইতে দিল, কারণ শশধর একেবারে কপর্দকশূন্য সেদিন। নিজে শ্মশানে গিয়া শেষপর্যন্ত রহিল। আবার সকলের সঙ্গে সেখান হইতে কণাদের বাড়ি ফিরিয়া আগুন তাপিল এবং নিমের পাতা দাঁতে কাটিল।
