প্রতুল একটা বিড়ি ধরাইল। সকাল হইতে এক বান্ডিল বিড়ি উঠিয়া গিয়াছে— বসিয়া বসিয়া বিড়ি খাওয়া ছাড়া সময় কাটাইবার উপায় কই? সিগারেট কিনিবার পয়সা নাই। এই সময়টা সিগারেট খাইয়া কাটাইতে হইলে দুই বাক্স ক্যাভেন্ডার নেভিকাট সিগারেট লাগিত।
প্রতুলের হঠাৎ মনে পড়িল, এবেলা এখনও চা খাওয়া হয় নাই। মেসের চাকরকে ডাকিবার উদ্যোগ করিতেছে—এমন সময় দুয়ারে কে ঘা দিল। হয়তো হরিশ চাকরের মনে পড়িয়াছে তাহার ঘরে চা দেওয়া হয় নাই। দুয়ার খুলিয়া প্রতুল অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল।
—এই যে প্রতুলদা, ভালো আছেন? নমস্কার। এলাম আপনার এখানেই—
একটি ত্রিশ-বত্রিশ বছরের লোক, গায়ে ময়লা পাঞ্জাবি, পায়ে রবারের জুতা, হাতে একটা ছোটো টিনের সুটকেস, সঙ্গে একটি বছর নয়-দশের ছোটো ছেলে লইয়া ঘরে ঢুকিল। ছাতি হইতে জল গড়াইয়া পড়িতেছে—ভিজা জুতায় ঘরের দুয়ারের সামনের মেঝেটাতে জলে দাগ পড়িল খোলা দরজা দিয়া ইতিমধ্যে বৃষ্টির ঝাপটা আসিয়া ঘরে ঢুকিল।
—আয় রে খোকা, যা, গিয়ে বোস গে যা—তোর জ্যাঠামশায়, প্রণাম কর। দাঁড়া,–টা মুছে দিই গামছা দিয়ে—যা—
প্রতুল তখনও ঠিক করিতে পারে নাই লোকটা কে, এমন দুর্যোগের দিনে তাহার আশ্রয় গ্রহণ করিতে আসিয়াছে। দেশের লোক, গ্রামের লোক তো নয়— কোথায় ইহাকে সে দেখিয়াছে? হঠাৎ তাহার মনে পড়িয়া গেল, এ সেই শশধর, নাথপুরের শশধর গাঙ্গুলী। এত বড়ো হইয়া উঠিয়াছে সেই আঠারো-উনিশ বছরের ছোকরা! আর বাল্যের সেই চমৎকার চেহারা এত খারাপ হইয়া উঠিল কীভাবে?
—চিনতে পেরেছেন প্রতুলদা?
—হ্যাঁ, এসো বোসো, ও কতকাল পরে দেখা, তা তুমি জানলে কী করে এখানে আমি আছি? ভালো আছ বেশ? এটি কে—ছেলে? বেশ, বেশ।
শশধর রাঙা দাঁত বাহির করিয়া একগাল হাসিয়া বলিল, তা হবে না? সে আজ কত বছরের কথা বলুন তো? আজ বারো-তেরো কী চোদ্দো বছরের কথা হয়ে গেল যে! আপনার ঠিকানা নিলুম জীবন ভটচায্যির কাছ থেকে। জীবন ভটচার্যকে মনে পড়ছে না? সেই যে জীবনদা, আমাদের লাইব্রেরির সেক্রেটারি ছিল।
—কিন্তু জীবনবাবুই বা আমার ঠিকানা জানলেন কী করে—তাঁর সঙ্গেও তো বারো-তেরো বছর দেখা নেই—যতদিন নাথপুর ছেড়েছি ততদিন তাঁর সঙ্গেও
—জীবনদার শালার এক বন্ধু আপনারও বন্ধু—রাধিকাবাবু, চিনতে পেরেছেন এবার? সেখানে জীবনদা শুনেছে—আপনি তো আমাদের খবর রাখেন না— আমরা আপনার রাখি। এই, স্থির হয়ে বোসো খোকা—এক কাপ চা খাওয়ান না দাদা, বড্ড ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে।
সঙ্গের ছোটো ছেলেটি অমনি বলিতে শুরু করিল, খিদে পেয়েছে, বাবা— আমার খিদে পেয়েছে।
তাহার বাবা ধমক দিয়া বলিল—থাম, ছোঁড়ার অমনি খিদে খিদে শুরু হল, থাম না, খেইচিস তো দুপুরবেলা—
প্রতুল বলিল—আহা, ওকে ধমকাচ্চ কেন, ছেলেমানুষের খিদে তো পেতেই পারে! দাঁড়াও খোকা, আমি খাবার আনাচ্চি।
চা ও জলযোগের পর্ব মিটিয়া গেলে প্রতুল বলিল—তারপর শশধর, এখন হচ্ছে কী?
শশধর বলিল—করব আর কী! রামজীবনপুরের ইউ. পি স্কুলের হেডপণ্ডিত। আজ দু–দিন ছুটি নিয়ে কলকাতায় এলাম, একটু কাজ আছে। ভালো কথা
প্রতুলদা, এখানে একটু থাকবার জায়গা হবে?
প্রতুল বলিল—হ্যাঁ হ্যাঁ, তার আর কী। থাকো না। জায়গা তো যথেষ্টই রয়েছে। আমি বলে দিচ্ছি তোমাদের খাওয়ার কথা রাত্রে।
আজ প্রায় বারো-তেরো বছর আগে প্রতুল নাথপুর গ্রামের মিউনিসিপ্যাল অফিসে কেরানির চাকুরি লইয়া যায়। নাথপুর নিতান্ত ক্ষুদ্র গ্রাম নয়, আশপাশের চার-পাঁচখানি ছোটো-বড়ো গ্রাম লইয়া মিউনিসিপ্যালিটি—ইলেকশন লইয়া দলাদলি মারামারি পর্যন্ত হইত। লাইব্রেরি ছিল, ডাক্তারখানা ছিল, হাই স্কুল ছিল, একটা পুলিশের ফাঁড়ি পর্যন্ত ছিল।
একদিন নিজের ক্ষুদ্র বাসাটিতে বসিয়া আছি একা, একটি আঠারো-উনিশ বছরের ছোকরা আসিয়া প্রণাম করিয়া বলিল—আপনি বুঝি নতুন এসেছেন আমাদের গাঁয়ে?
—হ্যাঁ। এসো, বোসো। তোমার নাম কী?
—আমার নাম শশধর। আপনার সাথে আলাপ করতে এলুম—একলাটি বসে থাকেন।
–এসো এসো, ভালোই। তুমি স্কুলে পড়ো বুঝি?
শশধর পরিচয় দিল।
না, সে স্কুলে পড়ে না। অবস্থা ভালো না, স্কুলে কে পড়াইবে? তাহা ছাড়া সংসারে বাবা নাই, তাহারই ঘাড়ে সংসার। মা, দুই বোন, তিনটি ছোটো ছোটো ভাই, স্ত্রী।
প্রতুল বিস্মিত হইয়া বলিল, তুমি বিয়ে করেছ নাকি?
—আজ্ঞে হ্যাঁ, ওবছর বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
ছেলেটি দেখিতে খুব সুশ্রী, সুপুরুষ। অল্প বয়সে বিবাহ হওয়াটা আশ্চর্য নয় বটে।
কিছুক্ষণ বসিয়া থাকিবার পরে ছেলেটি সেদিন চলিয়া গেল। তাহার পর হইতে মাঝে মাঝে সে প্রায়ই আসিত। এ গ্রামে প্রতুল নতুন আসিয়াছে, বিশেষ কাহারও সহিত পরিচয় নাই, এ অবস্থায় একজন তরুণ বন্ধু লাভ করিয়া প্রতুলও খুশি হইল। সময় কাটাইবার একটা উপায় হইল। সন্ধ্যাবেলাটা দুজনের গল্পগুজবে কাটিয়া যাইত।
একদিন শশধর প্রতুলকে বাড়িতে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করিল। শশধরের মা তাকে ছেলের মতো যত্ন করিয়া খাওয়াইলেন, শশধরের বোন কণা তাকে প্রথম দিনেই ‘প্রতুলদা’ বলিয়া ডাকিল—এই নির্বান্ধব পল্লিগ্রামে ইহাদের স্নেহসেবা প্রতুলের বড়ো ভালো লাগিল সেদিন।
ইহার পর অফিস হইতে প্রতুল নিজের বাসায় ফিরিতে-না-ফিরিতে শশধর প্রতুলকে ডাকিয়া নিজের বাড়িতে প্রায়ই লইয়া যায়—প্রায়ই বৈকালিক চা-পানের ও জলযোগের ব্যবস্থা সেখানেই হইয়া থাকে।
