আমি পূর্ণবাবুর এ গল্প বিশ্বাস করিনি। কিন্তু সেটেলমেন্ট ক্যাম্পে আমরা একসঙ্গে দেড় বছরের উপর ছিলাম—এই দেড় বছরের প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যায় কী রাত্রে একসঙ্গে বসবার সুযোগ হলেই পূর্ণবাবু আমায় তাঁর পিসিমার সম্পত্তির গল্প করতেন। কখন কোনটা হয়তো বলে ফেলেচেন ছ-মাস আগে তাঁর মনে থাকবার কথা নয়, আবার আজ যখন নতুন কথা বলচেন ভেবে বললেন তখন খুঁটিনাটি ঘটনাগুলোও ছ-মাস আগের কাহিনির সঙ্গে মিলে যেত—নানা টুকরো কথার জোড়াতালি মিলিয়ে এই দেড় বছরে পূর্ণবাবুর সমস্ত গল্পটা আমি জেনেছিলুম—একদিন তিনি বসে আগাগোড়া গল্প আমায় করেননি, সে ধরনের গল্প করার ক্ষমতাও ছিল না পূর্ণবাবুর।
সেই থেকে পূর্ণবাবুর দুর্দশার সূত্রপাত হল। বন্ধুবান্ধব ছেড়ে গেল, শ্বশুরবাড়িতে খাতির কমে গেল, সংসারে দারিদ্রের ছায়া পড়ল। দু-এক জন হিতৈষী বন্ধুর পরামর্শে পূর্ণবাবু আমিনের কাজ শিখতে গেলেন—বউ-ছেলেকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন।
এসব আজ ত্রিশ বছর আগেকার কথা।
এই ত্রিশ বছরে পূর্ণবাবু আমোদপ্রিয়, শৌখিনচিত্ত, অপরিণামদর্শী যুবক থেকে কন্যাদায়গ্রস্ত, রোগজীর্ণ, অকালবৃদ্ধ, দারিদ্রভারে কুজদেহ ত্রিশটাকা মাইনের আমিনে পরিণত হয়েছেন—এখন আর মনে তেজ নেই, শরীরে বল নেই, খেলে হজম করতে পারেন না, চুল অধিকাংশই পেকে গিয়েছে, কষের অনেকগুলো দাঁত পড়ে গেলেও পয়সার অভাবে বাঁধাতে পারেন না বলে গালে টোল খেয়ে যাওয়ায় বয়সের চেয়েও বুড়ো দেখায়।
বাড়ির অবস্থাও ততোধিক খারাপ। পনেরো টাকা ভাড়ার এঁদো ঘরে বাসকরার দরুণ স্ত্রী-ছেলে-মেয়ে সকলেই নানারকম অসুখে ভোগে—অথচ উপযুক্ত চিকিৎসা হয় না। তিনটি মেয়ের বিয়েতে পূর্ণবাবু একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছেন, অথচ মেয়ে তিনটির প্রথম দুটি ঘোর অপাত্রে পড়েছে। বড়ো জামাই বউবাজারে দরজির দোকান করে, ঘোর মাতাল, কুচরিত্র—বাড়িতে স্ত্রীকে মারপিট করে প্রায়ই, তবুও সেখানে মেয়েকে মুখগুজে পড়ে থাকতে হয়—বাপেরবাড়ি এলে শোবার জায়গাই দেওয়া যায় না। মেজো জামাই মাতাল নয় বটে, কিন্তু তার একপয়সা রোজগারের ক্ষমতা নেই—রেলে সামান্য কী চাকুরি করে, সে-সংসারে সবাই একবেলা খেয়ে থাকে, তাই নাকি অনেক দিন থেকে নিয়ম। আর একবেলা সকলে মুড়ি খায়। মেজো মেয়ের দুঃখ পূর্ণবাবু দেখতে পারেন না বলে মাঝে মাঝে তাকে বাড়িতে আনিয়ে রাখেন; সেখানে এলে তবু মেয়েটা খেতে পায় পেট পুরে দু-বেলা। আজকাল প্রায়ই জ্বরে ভোগে, শরীরও খারাপ হয়ে গিয়েছে, ডাক্তারে আশঙ্কা করচে থাইসিস। বুড়ি পিসিমা কিন্তু এখনো বেঁচে। এখনও বুড়ি গঙ্গাস্নানে যায়, নিজের হাতে বেঁধে খায়। বয়স নব্বই-এর কাছাকাছি, কিন্তু এখনও চোখের তেজ বেশ, দাঁত পড়েনি। বুড়ি একেবারে অশ্বামার পরমায়ু নিয়ে জন্মেছে, এদিকে যারা তার মরণের পানে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, তাদের জীবন ভাঁটিয়ে শেষ হতে চলল।
সেটেলমেন্টের কাজ ছেড়ে পাটনা থেকে চলে এলাম। পূর্ণবাবু তখনও সেখানে আমিন। বছরতিনেক পরে একদিন গয়া স্টেশনে পূর্ণবাবুর সঙ্গে দেখা। দুপুরের পর এক্সপ্রেস আসবার সময় স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করচি, একটু পরেই ট্রেনটা এসে দাঁড়াল। পূর্ণবাবু নামলেন একটা সেকেন্ড ক্লাস কামরা থেকে, অন্য কামরা থেকে দুজন দারোয়ান নেমে এসে জিনিসপত্রের তদারকে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। পূর্ণবাবুর পরনে দামি কাঁচি ধুতি, গায়ে সাদা সিল্কের পাঞ্জাবি, তার ওপরে জমকালো পাড় ও কল্কাদার শাল, পায়ে প্যারিস গার্টার আটা সিল্কের মোজা ও পাম্পশু, চোখে সোনার চশমা, হাতে সোনার ব্যান্ডওয়ালা হাতঘড়ি।
আমি গিয়ে আলাপ করলাম। পূর্ণবাবু আমায় চিনতে পেরে বললেন—এই যে রামরতনবাবু, ভালো আছেন? তারপর, এখন কোথায়?
আমি বললাম—আমি এখানে চেঞ্জে এসেচি মাসতিনেক, আপনি এদিকে— ইয়ে—
তাঁর অদ্ভুত বেশভূষার দিকে চেয়ে আমি কেমন হয়ে গিয়েছিলাম। পূর্ণবাবুকে এ বেশে দেখতে আমি অভ্যস্ত নই, আমার কাছে সুতির ময়লা-চিট সোয়েটার ও সবুজ আলোয়ান গায়ে পূর্ণবাবু বেশি বাস্তব, তা ছাড়া চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন বছরের বৃদ্ধের এ কী বেশ!
কী ব্যাপারটা ঘটেছে তা অবশ্য পূর্ণবাবু বলবার আগেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
জিনিসপত্র গুছিয়ে পূর্ণবাবু ওয়েটিং রুমে ঢুকলেন; তিনি সাউথ বিহার লাইনের গাড়িতে যাবেন। গাড়ির এখনও ঘণ্টা-দুই দেরি। একজন দারোয়ানকে ডেকে বললেন—ভূপাল সিং, এখানে ভালো সিগারেট পাওয়া যায় কিনা দেখে এসো— নইলে কাঁচি নিয়ে এসো এক বাক্স
আমায় বললেন—ওঃ, অনেক দিন পরে আপনার সঙ্গে দেখা। আর বলেন কেন, বিষয় থাকলেই হাঙ্গামা আছে। সামনে আসচে জানুয়ারি কিস্তি—তহশিলদার বেটা এখনও একপয়সা পাঠায়নি, লিখেচে এবার নাকি কলাই ফসল সুবিধে হয়নি। তাই নিজে যাচ্ছি মহালে, মাসখানেক থাকব। গাড়িটা এখানে আসে ক-টায়? ভালো কথা, এখানে টাইমটেবল কিনতে পাওয়া যাবে? কিনতে ভুল হয়ে গেল হাওড়ায়—
আমি জিজ্ঞেস করলাম—আপনার পিসিমা?
দারোয়ান সিগারেট নিয়ে এল। পূর্ণবাবু একটা সরু ও সুদীর্ঘ হোল্ডার বার করলেন, আমার দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বললেন, আসুন।
তারপর সিগারেট ধরিয়ে আরামে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন—পিসিমা মারা গিয়েচেন আর-বছর কার্তিক মাসে। তারপর থেকেই বিষয়-আশয়ের ঝাটে পড়েচি—নিজে না-দেখলে কি জমিদারি টেকে? আর এই বয়সে ছুটোছুটি করে পারিনে, একটা ভালো কাজ-জানা লোকের সন্ধান দিতে পারেন রামরতনবাবু? টাকা-চল্লিশ মাইনে দেব, খাবে থাকবে—
