ট্রেন আর একটা স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে। শান্তিরাম আলোয়ান মুড়ি দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে, মাঝে মাঝে ঢুলচে। স্টেশনে পানের বোঝা উঠছে। শান্তিরামকে বললাম—শান্তিরাম, ঘুমুচ্চ নাকি? আমি একটা গল্প জানি এইরকমই, তোমার গল্পটা শুনে আমার মনে পড়েছে সেটা, শুনবে?…
কিন্তু শান্তিরাম এখন গল্প শোনবার মেজাজে নেই। সে আরামে ঠেস দিয়ে আরও ভালো করে মুড়িসুড়ি দিয়ে বসল। সে একটু ঘুমুবে।
পূর্ণবাবুর কথা আমার মনে পড়েছে, শান্তিরামের গল্পটা শোনবার পরে এখন। পূর্ণবাবু আমিন ছিল, পাটনায় আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। পূর্ণবাবুর বয়স তখন ছিল পঞ্চাশ কী বাহান্ন বছর। লম্বা রোগা চেহারা, বেজায় আফিম খেত—দাঁত প্রায় সব পড়ে গিয়েছিল, মাথার চুল সাদা,নাক বেশ টিকোলো, অমন সুন্দর নাক কিন্তু আমি কম দেখেছি, রং না-ফর্সা না-কালো। পূর্ণবাবু কম মাইনে পেত, এখানে কোনোরকমে চালিয়ে বাড়িতে তার কিছু টাকা না পাঠালেই চলবে না— কাজেই তার পরনে ভালো জামাকাপড় একদিনও দেখিনি। পূর্ণবাবু নিজে বেঁধে খেত। একদিন তার খাবার সময় হঠাৎ গিয়ে পড়েছি—দেখি পূর্ণবাবু খাচ্চে শুধু ভাত—কোনো তরকারি, কী শাক, কী আলুভাতে—কিছু না, কেবল একতাল সবুজ পাতালতা-বাটা ওষুধের মতো দেখতে—কী একটা দ্রব্য ভাতের সঙ্গে মেখে খাচ্চে। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, সবুজ রঙের দ্রব্যটা কাঁচা নিমপাতাবাটা। পূর্ণবাবু একটু অপ্রতিভের সুরে বললেন, নিমপাতা-বাটা এত উপকারী, বিশেষ করে লিভারের পক্ষে। ভাত দিয়ে মেখে যদি খাওয়া যায়—আমি আজ দু-বছর ধরে আজ্ঞে দেখবেন খেয়ে, শরীর বড়ো ঠান্ডা—তা ছাড়া কী জানেন, লোভ যত বাড়াবেন ততই বাড়বে—
উপকারী দ্রব্য তো অনেকই আছে, ডাল-ঝোলের বদলে কুইনাইন মিক্সচার ভাতের সঙ্গে মেখে দু-বেলা খাওয়ার অভ্যেস করতে পারলে দেশের ম্যালেরিয়া সমস্যার একটা সুসমাধান হয়, তাও স্বীকার করি। কিন্তু জীবনে বড়ো বড়ো উপদেশগুলো চিরকাল লঙঘন করে চলে এসে এসে আজ নীতি ও স্বাস্থ্য পালন সম্বন্ধে এত বড়ো একটা সজীব আদর্শ চোখের সামনে পেয়ে খানিকক্ষণের জন্যে নির্বাক হয়ে গেলাম। আর একদিন-দু-দিন নয়, দু-বছর ধরে চলছে এ ব্যাপার।
একদিন পূর্ণবাবু নিজের জীবনের অনেক কথা বললেন। কলকাতায় তাঁদের বাড়ি, ভবানীপুরে। তাঁর একজন পিসিমা আছেন, একটু দূর সম্পর্কের। সেই পিসিমার মৃত্যুর পরে তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন পূর্ণবাবু। কিন্তু পিসিমা মরি-মরি করচেন আজ ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর।
পূর্ণবাবুর বিবাহ হয় বাগবাজারের সম্রান্ত বংশের মেয়ের সঙ্গে—তবে তখন তাদের অবস্থা খুব ভালো ছিল না। পূর্ণবাবুদের পৈতৃক বাড়িও নেই কলকাতায়, ভবানীপুরে খুব আগে নাকি প্রকাণ্ড বাড়ি পুকুর ছিল, এখন তাদের দু-পুরুষ ভাড়াটে বাড়িতে থাকে। পূর্ণবাবুর আঠারো-উনিশ বছর বয়সে পিতৃবিয়োগ হয়, তিনি ছেলের জন্য শুধু যে কিছু রেখে যাননি তা নয়, ছেলেটিকে লেখাপড়াও শেখাননি। কারণ তিনিও জানতেন এবং সবাই জানত যে তার দরকার নেই, অতবড়ো সম্পত্তির যে মালিক হবে দু-দিন পরে—তার কী হবে লেখাপড়ায়?
ছেলেটিও জ্ঞান হওয়া পর্যন্ত তাই জানত বলে লেখাপড়া শেখবার কোনো চেষ্টাও ছিল না। পূর্ণবাবুর শ্বশুরও তাই ভেবে মেয়েকে ওই গরিব ঘরে দিয়েছিলেন।
পূর্ণবাবুর বাবা তো মারা গেলেন, পূর্ণবাবুর ঘাড়ে রেখে গেলেন সংসার, নব বিবাহিতা পুত্রবধূ, অল্প কিছু দেনা। কিন্তু পূর্ণবাবুর ক্রেডিট তখন পুরোমাত্রায়—কী বাজারে কী বন্ধুবান্ধব মহলে। টাকা হাত পাতলেই পাওয়া যায়—ধারে দোকানে জিনিস পাওয়া যায়, নিত্যনতুন বন্ধু জোটে। পূর্ণবাবু খুশি, পূর্ণবাবুর তরুণী বউ খুশি, আত্মীয়-স্বজন খুশি, বন্ধুবান্ধব খুশি। কারণ সবাই জানে, বুড়ি আর ক-দিন? না–হয় মেরেকেটে আর পাঁচটা বছর!
অবশ্য পূর্ণবাবুর তখন বয়স অনেক কম, সংসারের কিছুই বোঝেন না, জানেন না—মনে উৎসাহ, আশা অদম্য, আনন্দের উৎস—চোখের সামনে দীপ্ত রঙিন ভবিষ্যৎ—যে ভবিষ্যতের সম্বন্ধে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই, আশঙ্কা নেই, যা একদিন হাতের মুঠোয় ধরা দেবেই—এ অবস্থায় যে যা বুঝিয়েচে পূর্ণবাবু তাই-ই বুঝেছেন, টাকাকড়ি ধার করে দু-হাতে উড়িয়েছেন, বন্ধুবান্ধবদের সাহায্যও করেচেন, ধারে যতদিন এবং যতটা নবাবি করা চলে, বাকি রাখেননি।
কিন্তু ক্রমে বছর যেতে লাগল, দু-তিন বছর পরে আর ধার মেলে না— সকলেই হাত গুটিয়ে ফেললে। পাওনাদারের যাতায়াত শুরু হল এইজন্যে আরও বিশেষ করে পূর্ণবাবু বাজারে ক্রেডিট হারিয়ে ফেললেন যে, সবাই দেখলে পূর্ণবাবুর পিসিমা ওঁদের আদৌ বাড়িতে ডাকেন না, পূর্ণবাবুকেও না, পূর্ণবাবুর বউ ছেলে-মেয়ে কাউকে না।
পিসিমার কাছে খাতির পেলে বাজারেও পূর্ণবাবুর খাতির থাকত—অনেকে বলতে লাগল পূর্ণবাবুর পিসিমা ওদের দেখতে পারে না, সমস্ত সম্পত্তি হয়তো দেবোত্তর করে দিয়ে যাবে—একটি পয়সাও দেবে না ওদের।
পূর্ণবাবুর পিসিমার বিশ্বাস যে এরা তাঁকে বিষ খাইয়ে মারবে—যত বয়স হচ্ছে এ বিশ্বাস আরও দিন দিন বাড়ছে—এতে করে হয়েছে এই যে পূর্ণবাবুর, কী পূর্ণবাবুর স্ত্রীর, কী পূর্ণবাবুর ছেলে-মেয়ের পিসিমার বাড়ির ত্রি-সীমানায় ঘেঁষবার জো নেই। কাজেই অতবড়ো সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়েও পূর্ণবাবু আজ ত্রিশ টাকা মাইনের আমিনগিরি করচেন।
