ওয়েটিং রুমে বসে পূর্ণবাবু দু-বোতল লেমনেড খেলেন এই শীতকালে। একবার দারোয়ানকে দিয়ে গরম জিলিপি আনালেন দোকান থেকে, একবার নিমকি বিস্কুট আনালেন। আর একবার নিজে স্টেশনের বাইরের দোকান থেকে এক ডজন কমলালেবু কিনে আনলেন। আমায় প্রতিবারেই খাওয়ানোর জন্য পীড়াপীড়ি করলেন, কিন্তু আমার শরীর খারাপ, খেতে একেবারেই পারিনে, সে-কথা জানিয়ে ক্ষমা চাইলাম। একটু পরেই পূর্ণবাবুর ট্রেন এসে পড়ল।
দিন পনেরো-কুড়ি পরে আবার বেড়াতে গিয়েচি স্টেশনে। সেদিন খুব শীত পড়েছে, বেশ জ্যোৎস্না, রাত আটটার কম নয়। স্টেশনের রাস্তা যেখানে ঠেকেছে সেখানে চপকাটলেট চায়ের দোকান থেকে কে আমার নাম ধরে ডাকলেও রামরতনবাবু—এই যে—এদিকে—ফিরে চেয়ে দেখি পূর্ণবাবু একটা কোণে টেবিলে বসে। পূর্ণবাবুর মাথায় একটা পশমের কানঢাকাঃটুপি, শালের কম্ভার গলায় জড়ানো, হাতে দস্তানা। আমায় বললেন—আসুন, বসুন—কিছু খাওয়া যাক। আজ ফিরে এলাম মহাল থেকে—এই রাতের গাড়িতে ফিরব কলকাতায়— কিছু খাবেন না?…না, না, খেতেই হবে কিন্তু, সেদিন তো কিছু খেলেন না—এই বয়, ইধার আও—
আমাকে জোর করে পূর্ণবাবু চেয়ারে বসালেন। তারপর তাঁর নিজের জন্যে যা খাবার নিলে, তা দেখে আমার তো হৃৎকম্প উপস্থিত হল। এত খাবেন কী করে পূর্ণবাবু এই বয়সে? আর একটা অতিবাজে দোকানে খানআষ্টেক চপ, খানচারেক কাটলেট, এক প্লেট মাংস, পাঁউরুটি, ডিমের মামলেট, পুডিং, কেক, চা—তিনি কিছু বাদ দিলেন না। আমাকে দেখিয়ে বললেন—এই, বাবুকো ওয়াস্তে এক প্লেট মাটন আউর তিন পিস—
আমি সবিনয়ে বললাম—আমার শরীর তো জানেন পূর্ণবাবু, ওসব কিছু আমি–
–আরে, তা হোক, শরীর শরীর করলে কী চলে! খান খান—মাংসটা বেশ করেছে—কলকাতায় মাংস রাঁধতে জানে না মশাই রেস্টোরেন্ট—আমি ঝাল পছন্দ করি, কলকাতায় শুধু মিষ্টি খেয়ে দেখুন মাংসটা–কাটলেটেও এরা কাঁচালঙ্কা বাটা দিয়েচে-ভারি চমৎকার খেতে—এই বয়…আউর দুটো কাটলেট–
কথাটা শেষ হবার আগেই তাঁর বেজায় কাশির বেগ হল—কাশতে কাশতে দম আটকে যায় আর কী!
একটু সামলে বললেন—বড্ড ঠান্ডা লেগেছে মহালে—সেইজন্যে বেশ একটু গরম চা–চপ খেয়ে দেখবেন? ভারি চমৎকার চপ করেছে! এই বয়,–
আমি কথাটা মুখ ফুটে বললাম—পূর্ণবাবু, আপনার শরীরে এসব খাওয়া উচিত নয়—আর এ ধরনের দোকান তো খুব ভালো নয়! চা বরং এক কাপ খান, কিন্তু এত—এগুলো খেলে—
পূর্ণবাবু হেসে উড়িয়ে দিলেন—খাব না বলেন কী রামরতনবাবু, খাবার জন্যেই সব। শরীরকে ভয় করলেই ভয়, ওসব ভাবলে কী আর—আপনিও যেমন।
রেস্টোরেন্ট থেকে বার হয়ে এসে আমায় নীচু স্বরে বললেন—কিছু মনে করবেন না রামরতনবাবু, একসঙ্গে অনেকদিন কাজ করেছি এক জায়গায়, এখানে কোনো ভালো বাইজির বাড়ি-টাড়ি জানা আছে? থাকে তো চলুন না, আজ রাতটা —শুনেছি পশ্চিমে নাকি ভালো ভালো—কলকাতায় না-হয় আজ না-ই গেলাম–
আমি বুঝিয়ে বললাম, পশ্চিমের যেসব জায়গায় ভালো বাইজি থাকে, গয়া সে তালিকায় পড়ে না। বিহারের কোথাও নয়। কাশি, লক্ষৌ, দিল্লি ওদিকেই সত্যিকার বাইজি বলতে যা বোঝায় তা আছে।
পূর্ণবাবু বললেন—পাটনাতে নেই?
—আমার তাই মনে হয়।
—এদিকে আর কোথাও নেই? না-হয় এমনি আর কোথাও—
কোথাও কিছু নেই। আমি ঠিক জানি।
পূর্ণবাবু ওয়েটিংরুমে ঢুকে আমায় বসতে বললেন। পূর্ণবাবুকে আরও বেশি বৃদ্ধ দেখাচ্ছিল। আমি তাঁর বাড়িতে কে কেমন আছে জিজ্ঞেস করলাম। থাইসিসের রোগী সেই মেয়েটিকে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করাচ্ছেন, বড়ো ছেলেটি বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েচে আজ বছর দুই—সম্পত্তি পাবার আগেই। কাগজে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে তার খোঁজ করেছেন। অনেকক্ষণ পর্যন্ত এসব গল্প শুনলাম বসে বসে। পূর্ণবাবু গল্পের মধ্যে আরও দু-বার চা আনিয়ে খেলেন, ব্যাগ খুলে ওষুধ খেলেন তিন-চার রকম, কোনোটা কবিরাজি, কোনোটা বিলেতি পেটের ওষুধ। দু-প্যাকেট সিগারেট শেষ করলেন।
দেখলাম পূর্ণবাবু চিরবঞ্চিত জীবনের সর্বগ্রাসী তৃষ্ণার ভোগলালসা মেটাতে উদ্যত হয়েচেন বিকারের রোগীর মতো। চারিধারে ঘনায়মান মৃত্যুর ছায়ার মধ্যে স্বল্পতৈল জীবনদীপের আলো যত সংকীর্ণ থেকে সংকীর্ণতর জ্যোতি :বৃত্তের সৃষ্টি করেচে, উনি ততই উন্মাদ আগ্রহে যেখানে যা পাবার আছে পেতে চান—যা নেবার আছে নিতে চান। জীবনে ওঁর যখন সুবৃষ্টি এল, জল না-পেয়ে তখন তা আধ-মরা। সেই এল—কিন্তু এত দেরি করে ফেললে!
* * * *
আমায় বললেন—একটু কিছু বাড়াবাড়ি খেলেই, ওষুধ খেয়ে রাখি। আর হজম করতে পারি-নে এখন। আমাদের পাড়ায় আছে গদাধর কবরেজ…খুব ভালো চিকিচ্ছে করে, একহপ্তার ওষুধ নেয় দু-টাকা—তারই কাছে ভাবছি এবার। পূর্ণবাবুর সেই নিমপাতাবাটা মেখে ভাত খাওয়ার কথা আমার মনে পড়ল, আরও মনে পড়ল পূর্ণবাবুর প্রথম জীবনের শৌখিনতার কথা। এখন তিনি বুঝেছেন আর বেশি দিন বাঁচবেন না, চিরবঞ্চিত জীবনের সর্বগ্রাসী তৃষ্ণার ভোগলালসা তাঁর বিকারের রোগীর মতো অসংযত, অবুঝ।
শান্তিরামকে গল্পটা বলব ভেবেছিলাম, কিন্তু সে দিব্যি নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্চে।
উপেক্ষিতা
পথে যেতে যেতেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়।
সে বোধ হয় বাংলা দুই কী তিন সালের কথা। নতুন কলেজ থেকে বার হয়েছি, এমন সময় বাবা মারা গেলেন। সংসারের অবস্থা ভালো ছিল না, স্কুলমাস্টারি নিয়ে গেলুম হুগলি জেলার একটা পাড়াগাঁয়ে। …গ্রামটির অবস্থা একসময়ে খুব ভালো থাকলেও আমি যখন গেলুম তখন তার অবস্থা খুব শোচনীয়। খুব বড়ো গ্রাম, অনেকগুলি পাড়া, গ্রামের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত বোধ হয় এক ক্রোশেরও ওপর। প্রাচীন আম-কাঁটালের বনে সমস্ত গ্রামটি অন্ধকার।
