এ প্রস্তাবেও অবনী রাজি হল, একটা ভালো দিন দেখে সবাই এ বাড়িতে চলে এল। অবনীর বউ নিসু চৌধুরীর বাড়ি কখনো দেখেনি, কারণ সে ওপাড়ার বউ, এ-পাড়ায় আসবার দরকার তেমন হয়নি কখনো। ঘরবাড়ি দেখে বউ যেমন অবাক হয়ে গেল, তেমনি খুশি হল। নিসু চৌধুরীর বাবা রোজগারের প্রথম অবস্থায় শখ করে বাড়ি উঠিয়েছিলেন—তখনকার দিনে সস্তাগণ্ডার বাজার ছিল, দেখে অবাক হবার মতো বাড়িই করেছিলেন বটে, পাড়াগাঁয়ের পক্ষে অবিশ্যি। কলকাতার কথা ছেড়ে দাও। মস্ত দোতলা বাড়ি ওদের, নীচে বড়ো বড়ো সাত-আটখানা ঘর, বারান্দা, প্রকাণ্ড ছাদ, সান-বাঁধানো উঠোন, ভেতর বাড়িতে পাকা রান্নাঘর, দারা, বাইরে প্রকাণ্ড বৈঠকখানা। বাড়ির পেছনে বাগান, ছোটো একটা পুকুর, বাঁধানো ঘাটপাড়াগাঁয়ে সম্পন্ন গৃহস্থবাড়ি যেমন হয়ে থাকে।
ওরা বাড়িতে উঠে এসে জাঁকিয়ে সত্যনারায়ণের পুজো দিলে, লোকজন খাওয়ালে, লক্ষ্মীপুজো করলে। সবাই বললে অবনীর বউ-এর পয় আছে, নইলে অমন বিষয়সম্পত্তি পাওয়া কী সোজা কথা আজকালকার বাজারে। আবার অনেকেরই চোখ টাটালো।
এসব হল গিয়ে ওবছর ফাল্গুন মাসের কথা! গত বছর বৈশাখ মাসে নিসু চৌধুরী মারা গেল। জ্বর হয়েছিল, অবনী ভালো ভালো ডাক্তার দেখালে, খুলনা থেকে নৃপেন ডাক্তারকে নিয়ে এল—বিস্তর পয়সা খরচ করলে, অবনীর বউ মেয়ের মতো সেবা করলে—কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। অবনী বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধ করলে খুব ঘটা করে, সমাজ খাওয়ালে—তা সবাই বললে দেখেশুনে যে নিজের ছেলে থাকলে নিসু চৌধুরীর—সেও এর বেশি আর কিছু করতে পারত না। তারপর এখন ওরাই সম্পত্তির মালিক, অবনী নিজেই খাটিয়ে ছেলে, কোনো নেশা-ভাঙ করে না, অতি সৎ। কাজেই বিষয় উড়িয়ে দেবে সে ভয় নেই, দেখেশুনে খাবার ক্ষমতা আছে।
তাই বলছিলাম, ভগবান যাকে দেন, তাকে এমনি করেই দেন। ওই অবনীর বউ আঁচল পেতে চাল ধার করে নিয়ে গিয়েছে আমার মাসিমাদের বাড়ি থেকে, তবে হাঁড়ি চড়েচে—এমন দিনও গিয়েচে ওদের। আমার মাসিমার বাড়ি ওদের একই পাড়ায় কিনা? তাঁরই মুখে সব শুনতে পাই। আর তারাই এখন দেখো ইন্টার ক্লাসে—ভগবান যখন যাকে—
অবনীর বউটি খুব ভালো, অত্যন্ত গরিব ঘরের মেয়ে ছিল, পড়েছিলও তেমনি গরিবের ঘরে। সে নাকি মাসিমার কাছে বলেচে, যা কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি দিদি তাই যখন হল, এখন ভাবি, ভগবান সব বাঁচিয়ে বর্তে রাখতে হয়। গরিব লোকের কপাল, ভরসা করতে ভয় পাই দিদি। প্রথম যেদিন বাড়িতে ঢুকলাম, দেখি এ যেন রাজবাড়ি, অত ঘরদোর অত বড়ো জানলা-দরজা, এতে আমার ছেলে-মেয়েরা বাস করতে পারবে, জানো তো কী অবস্থায় ছিলাম—তোমার কাছে আর কি লুকোব? এ যেন সবই স্বপ্ন বলে মনে হয়েছিল। এখন ব্ৰতটা নামটা করে, দু-দশ জন ব্রাহ্মণের পাতে দু-মুঠো ভাত দিয়ে যদি ভালোয় ভালোয় দিনগুলো কাটাতে পারি, তবে তো মুখ থাকে লোকের কাছে। সেই আশীর্বাদ করো তোমরা সকলে।
সন্ধ্যার অন্ধকার চারিধারে খুব গাঢ় হয়েছে। ট্রেন হু-হু করে অন্ধকার মাঠ, বাঁশবন, বিল, জলা, আখের খেত, মাঝে মাঝে ঘন অন্ধকারের মধ্যে জোনাকি জ্বলা ঝোপ পার হয়ে উড়ে চলেচে, মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো গ্রাম, খড়ে-ছাওয়া বিশ-ত্রিশটা চালাঘর একজায়গায় জড়াজড়ি করে আছে, দু-চার-দশটা মিটমিটে আলো জ্বলে অন্ধকারে ঢাকা গাছপালায় ঢাকা গ্রামগুলোকে কেমন একটা রহস্যময় রূপ দিয়েছে।
একটা বড়ো গ্রামের স্টেশনে অবনী তার বউ ও ছেলেমেয়েকে নিয়ে নেমে গেল। স্টেশনের বাইরে একখানা ছইওয়ালা গোরুরগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, বোধ হয় ওদেরই জন্যে। অবনীর বউকে এবার প্লাটফর্মের তেলের লণ্ঠনের অস্পষ্ট আলোয় দেখে আরও বেশি করে মনে হল যে মেয়েটি সত্যিই সুশ্রী। বেশ ফর্সা রং, সুঠাম বাহু দুটির গড়ন, চলনভঙ্গি ও গলার সুরের সবটাই মেয়েলি। এমনি নিখুঁত মেয়েলি ধরনের মেয়ে দেখবার একটা আনন্দ আছে, কারণ সেটা দুষ্প্রাপ্য। ট্রেনখানা প্রায় দশ মিনিট দাঁড়িয়ে রইল; একজন লোক হারিকেন লণ্ঠন নিয়ে ওদের এগিয়ে নিতে এসেছিল, ওরা তার সঙ্গে স্টেশনের বাইরে যেতে গিয়ে ফটক খোলা না-পেয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কারণ যিনি স্টেশনমাস্টার তিনিই বোধ হয় টিকিট নেবেন যাত্রীদের কাছ থেকে—ফটকে চাবি দিয়ে তিনি গার্ডকে দিয়ে প্লাটফর্মের মধ্যে আঁধারে লণ্ঠনের আলোয় কী কাগজপত্র সই করাচ্ছিলেন।
তারপর ট্রেন আবার চলতে লাগল—আবার সেইরকম ঝোপ-ঝাপ, অন্ধকারে ঢাকা ছোটোখাটো গ্রাম, বড়ো বড়ো বিল, বিলের ধারে বাগদিদের কুঁড়ে। আমার ভারি ভালো লাগছিল—এইসব অজানা ক্ষুদ্র গ্রামে ঘরে ঘরে অবনীর বউ-এর মতো কত গৃহস্থবধূ ভারবাহী পশুর মতো উদয়াস্ত খাটচে, হয়তো পেটপুরে দু বেলা খেতেও পায় না, ফর্সা কাপড় বছরে পরে হয়তো দু-দিন কী তিনদিন, হয়তো সেই পুজোর সময় একবার, কোনো সাধ-আহ্লাদ পুরে না মনের, কিছু দেখে না, জানে না, বোঝে না, মনে বড়ো কিছু আশা করতে শেখেনি, বাইরের দুনিয়ার কিছু খবর রাখে না—পাড়াগাঁয়ের ডোবার ধারের বাঁশবাগানের ছায়ায় জীবন তাদের আরম্ভ, তাদের সকল সুখ-দুঃখ, আনন্দ, আশা-নিরাশার পরিসমাপ্তিও ওইখানে।
অবনীর বউ গৃহস্থবধূদেরই একজন। অন্তত ওদের একজনও তার সাধের স্বর্গকে হাতে পেয়েছে। অন্ধকারের মধ্যে আমি বসে বসে এই কথাই ভাবছিলাম। আমি কল্পনা করবার চেষ্টা করলাম অবনীর বউকে, যখন সে প্রথম নিসু চৌধুরীর বাড়িতে এল—কী ভাবলে অত বড়ো বাড়িটা দেখে,…অত ঘরদোর!…যখন প্রথম জানলে যে সংসারের দুঃখ দূর হয়েছে, প্রথম যখন সে তার ছেলে-মেয়েদের ফর্সা কাপড় পরতে দিতে পারলে, আমি কল্পনা করলাম দশঘরার হাট থেকে অবনী বড়ো মাছ, সন্দেশ, ছানা কিনে বাড়িতে এসেচে…অবনীর বউ এই প্রথম সচ্ছলতার মুখ দেখলে। তার সে খুশি-ভরা চোখমুখ অন্ধকারের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।…
