শান্তিরামকে পেয়ে খুশি হলাম। শান্তিরামের স্বভাবই হচ্চে একটু বেশি বকা। কিন্তু তার বকুনি আমার শুনতে ভালো লাগে। সে বকুনির ফাঁকে ফাঁকে এমন সব পাড়াগাঁয়ের ঘটনার টুকরো ঢুকিয়ে দেয়, যা গল্প লেখার চমৎকার—অতিচমৎকার উপাদান। ওর কাছে শোনা ঘটনা নিয়ে দু-একটা গল্পও লিখেচি এর আগে। মনে ভাবলাম শান্তিরাম এসেচে, ভালোই হয়েছে। একা চার ঘণ্টার রাস্তা যাব, তাতে এই শীত। তা ছাড়া এই শীতে ওর মুখের গল্প জমবেও ভালো।
হঠাৎ শান্তিরাম প্ল্যাটফর্মের দিকে মুখ বাড়িয়ে ডাকতে লাগল—অবনী ও অবনী, এই যে, এই গাড়িতে এসো, কোথায় যাবে?
গুটি তিন-চার ছেলে-মেয়ে, এক পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের স্বাস্থ্যবতী ও সুশ্রী একটি পাড়াগাঁয়ের বউ আগে আগে, পিছনে একটি ফর্সা একহারা চেহারার লোক, সবার পিছনে বাক্স পেটরা মাথায় জন দুই কুলি। লোকটি আমাদের কামরার কাছে এসে দাঁড়িয়ে হেসে বললে—এই যে দাদা, কলকাতা ফিরছেন আজই! আমি? আমি একবার এদের নিয়ে যাচ্চি পাঁচঘরার ঠাকুরের থানে। মসলন্দপুর স্টেশনে নেমে যেতে হবে; বাস পাওয়া যায়। দলটি আমাদের গাড়ির পাশ দিয়ে এগিয়ে খালি একটা ইন্টার ক্লাস কামরায় উঠল।
শান্তিরাম চেয়ে চেয়ে দেখে বললে—তাই অবনী এখানে এল না, ইন্টার ক্লাসের টিকিট কিনা? আঙুল ফুলে কলাগাছ একেই বলে! ওই অবনীদের খাওয়া জুটত না, আজ দল বেঁধে ইন্টার ক্লাসে চেপে বেড়াতে যাচ্ছে…ভগবান যখন যাকে দেন,—আমাদের বোঁচকা বওয়াই সার।
গাড়ি ছাড়ল। সন্ধ্যার পাতলা অন্ধকারে পাম্পিং এঞ্জিনের শেড, কেবিনঘর, ধূমাকীর্ণ কুলিলাইন সট সট করে দু-পাশ কেটে বেরিয়ে চলেছে, সামনে সিগন্যালের সবুজ বাতি, তারপর দু-পাশে আখের খেত, মাঠ, বাবলা বন। শান্তিরামের গলার সুর শুনে বুঝলাম, সে গল্প বলার মেজাজে আছে, ভালো করে আলোয়ান গায়ে দিয়ে বসলাম, উৎসুক মুখে ওর দিকে চেয়েঃরইলাম।
শান্তিরাম বললে—অবনীকে এর আগে কখনো দেখোনি? নিশ্চয় দেখেছ ছেলেবেলায়, ও আমাদের নীচের ক্লাসে পড়ত আর বেশ ভালো ফুটবল খেলত— মনে নেই? ওর বাবা কোর্টে নকলনবিশি করতেন, সংসারের অভাব-অনটন টানাটানি বেড়েই চলেছিল। সেই অবস্থায় অবনীর বিয়ে দিয়ে বউ ঘরে আললেন। বললেন—কবে মরে যাব, ছেলের বউয়ের মুখ দেখে যাই। বাঁচলেনও না বেশিদিন, একপাল পুষ্যি আর একরাশ দেনা ছেলের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে সংসার থেকে বিদায় নিলেন।
তারপর কী কষ্টটাই গিয়েচে ওদের। অবনী পাস করতে পারলে না, চাকরিও কিছু জুটল না, হরিণখালির বিলের এক অংশ ওদের ছিল অনেককাল আগে থেকে—শোলা হত সেখানে, সেই বিলের শোলা ইজারা দিয়ে যে কটা টাকা পেত, তাই ছিল ভরসা।
ওদের গাঁয়ে চৌধুরীপাড়ায় নিধিরাম চৌধুরী বলে একজন লোক ছিল। গাঁয়ে তাকে সবাই ডাকত নিসু চৌধুরী। নিসু চৌধুরীর কোনো কুলে কেউ ছিল না, বিয়ে করেছিল দু-দু-বার, ছেলেপুলেও হয়েছিল কিন্তু টেকেনি। ওর বাবা সেকালে নিমকির দারোগা ছিল, বেশ দু-পয়সা কামিয়ে বিষয়সম্পত্তি করে গিয়েছিল। তা শালিয়ানা প্রায় হাজার বারোশো টাকা আয়ের জমা, আম-কাঁঠালের বাগান, বাড়িতে তিনটে গোলা, এক-একটা গোলায় দেড়পাট দু-পাট করে ধান ধরে, দুটো পুকুর, তেজারতি কারবার। নিসু চৌধুরী ইদানীং তেজারতি কারবার গুটিয়ে ফেলে জেলার লোন অফিসে নগদ টাকাটা রেখে দিত। সেই নিসু চৌধুরীর বয়স হল, ক্রমে শরীর অপটু হয়ে পড়তে লাগল, সংসারে মুখে জলটি দেবার একজন লোক নেই। আবার পাড়াগাঁয়ের ব্যাপার জানো তো? পয়সা নিয়ে বাড়িতে কাউকে খেতে দেওয়া—এ রেওয়াজ নেই। তাতে সমাজে নিন্দে হয়, সে কেউ করবে না। নিসু চৌধুরী এমন একবার অসুখে পড়ে দিনকতক বড়ো কষ্ট পেলে—এসব দিকের পাড়াগাঁয়ের জানো তো ভায়া, না-পাওয়া যায় রাঁধুনি বামুন, না-পাওয়া যায় চাকর, পয়সা দিলেও মেলানো যায় না। দিন দশ-বারো ভুগবার পর উঠে একটু সুস্থ হয়ে একদিন নিসু চৌধুরী অবনীকে বাড়িতে ডাকলে। বললে—বাবা অবনী, আমার কেউ নেই, এখন তোমরা পাঁচজন ভরসা। তা তোমার বাবা আমায় ছোটো ভাইয়ের মতো দেখতেন, তোমাদের পাড়ায় তখন যাতায়াতও ছিল খুব। তারপর এখন শরীরও হয়ে পড়েছে অপটু, তোমাদের যে গিয়ে খোঁজখবর করব, তাও আর। পারিনে। তা আমি বলছি কী, আমার যা আছে সব লেখাপড়া করে দিচ্চি তোমাদের, নাও—নিয়ে আমাকে তোমাদের সংসারে জায়গা দাও। তুমি আমার দীনুদার ছেলে, আমার নিজের ছেলেরই মতো। তোমাকে আর বেশি কী বলব বাবা?
অবনী আশ্চর্য হয়ে গেল। নিসু চৌধুরীর নগদ টাকা কত আছে কেউ অবিশ্যি জানে না, কিন্তু বিষয়সম্পত্তির আয়, ধান—এসব যা আছে, এ গাঁয়ে এক রায়েদের ছাড়া আর কারু নেই। সমস্ত সম্পত্তি লিখে দিতে চায় নিসু চৌধুরী তার নামে! অবনীর মুখ দিয়ে তো কথা বেরুল না খানিকক্ষণ। তারপর বললে—আচ্ছা কাকা, বাড়িতে একবার পরামর্শ করে এসে কাল বলব।
নিসু চৌধুরী বললে—বেশ বাবা, কিন্তু এসব কথা এখন যেন গোপন থাকে। পরদিন গিয়ে অবনী জানালে এ প্রস্তাবে তাদের কোনো আপত্তি নেই। নিসু চৌধুরী বললে-বউমা তাহলে রাজি হয়েছেন? দ্যাখো তাহলে আমার একটা সাধ আছে, সেটা বলি। আমার এত বড়ো বাড়িখানা পড়ে আছে, অনেক দিন এতে মালক্ষ্মীদের চরণ পড়েনি, ঠিকমতো সন্ধে-পড়ে না। তোমাদের ও-বাড়িটাও তো ছোটো, ঘরদোরে কুলোয় না, তা ছাড়া পুরোনোও বটে। তোমরা আমার এখানে কেন এসো না সবসুদ্ধ? তোমারই তো বাড়িঘর হবে, তোমাকেই সব দিয়ে যখন যাব, তখন এখন থেকে তোমার নিজের বাড়ি তোমরা না-দেখলে নষ্ট হয়ে যাবেঃযে!
