বলিতে পারিতাম, ‘সংলগ্ন’ বলিতে দুই মাইল দূরবর্তীই কী বোঝায়? কিন্তু না, দরকার নাই। পূর্ববঙ্গের অসহায় হিন্দু আমি, এখানকার জমির মালিকের সঙ্গে অনর্থক ঝগড়া করিব না। স্থান পাওয়া লইয়া কথা। চটিয়া গেলে জমি না-দিতেও তো পারে।
বিনীতভাবে বলিলাম—কলোনি কতদূর?
—মাইলখানেক দূরে।
বিস্মিত হইয়া বলিলাম—বলেন কী! তবে সাড়ে তিন মাইল দূর পড়ল স্টেশন থেকে। এর নাম ‘সংলগ্ন’? এ তো কখনো শুনিনি—
ডাক্তারবাবু থমকিয়া দাঁড়াইয়া গেলেন। বলিলেন—না শুনেছেন কী করব? কিন্তু আপনাকে বলচি, কলোনির এক ইঞ্চি জমি পড়ে থাকবে না। সব নামে নামে রেজেস্ট্রি হয়ে যাচ্ছে। আপনার না-ইচ্ছে হয়, না-নেবেন। তবে কি দেখতে যাবেন, না দেখবেন না?
—চলুন যাই।
পকেট হইতে একগোছা চিঠি বাহির করিয়া ডাক্তারবাবু আমার নাকের কাছে ধরিয়া বলিলেন—এই দেখুন। মনি অর্ডারে টাকা আসচে অফিসে, রোজ একগোছা চিঠি আসছে, আপনি দেখুন না মশাই। না-দেখলে ঠকবেন এর পরে। তবে আপনি–
-নিলে জোর করে তো আপনাকে দেওয়া হবে না— রাস্তায় ভীষণ কাদা। একটা গোয়ালা পাড়ার ভিতর দিয়া যাইতেছিলাম, মহিষ ও গোরুর বাথান চারিদিকে। অত্যন্ত দুর্গন্ধ বাতাসে। ইহাতে মশা বিন-বিন করিতেছে। খানিকদ্দূর গিয়া একটা অবাঙালি কুলি বস্তি, যেমন নোংরা, তেমনি ঘিঞ্জি। তারপরে আবার জঙ্গল বাঁশবন আর ডোবা।
মাইলখানেক দূরে জঙ্গলের একপাশে রাস্তার ধারে একটা টিনের সাইনবোর্ডে বড়ো-বড়ো করিয়া লেখা আছে—’আচার্য কৃপালনী কলোনি’।
এখানে আসিয়া ডাক্তারবাবু দাঁড়াইলেন। সামনের দিকে হাত দিয়া দেখাইয়া বলিলেন—এই—
চারিদিক চাহিয়া চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। বিস্ময়বোধের শক্তিও যেন হারাইয়া ফেলিয়াছে। ইহারই নাম, আচার্য কৃপালনী কলোনি। এই সেই বহু বিজ্ঞাপিত ভূখণ্ড? কোথায় ইহার পাদদেশ ধৌত করিয়া গঙ্গা প্রবাহিত হইতেছে? কোথায় সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য? পঞ্চাশফুট চওড়া রাস্তা, ইলেকট্রিক আলো, জলের কল প্রভৃতি ছবির সঙ্গে এই অন্ধকার বাঁশবন, কচুবন আর মশাভরা ডোবার খাপ খাওয়াইতে অনেক চেষ্টা করিলাম; মনকে অনেক বুঝাইলাম, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ কী ছিল? অমুক কি ছিল? কিন্তু পারিয়া উঠিলাম না। তাহা ছাড়া এখানে ডাঙা-জমিই-বা কোথায়? সব তো জলেডোবা আর জলের মধ্যে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছে বনকচুর ঝাড়।
সে-কথা বলিয়া লাভ নাই।
ডাক্তারবাবু গর্বের সহিত বলিলেন—সাড়ে ছ-শো করে কাঠা, তাই পড়তে পাচ্ছে না। সব প্লটের নাম রেজেস্ট্রি হয়ে গিয়েছে মশাই।
কিন্তু প্লট’ বলিতে জমির টুকরা বোঝায়, এখানে জমিই যে নাই, এ তো সবই জলাভূমি। পুণ্যতোয়া স্বচ্ছসলিলা জাহ্নবী ইহার ত্রিসীমানায় আছেন বলিয়া মনে হইল না।
বলিলাম—গঙ্গা এখান থেকে কতদূর?
—বেশি নয়। মাইলখানেক হবে কিংবা কিছু বেশি হবে—
তাই বা কী করিয়া হয়? গঙ্গা এখান হইতে চারি মাইলের কম কী করিয়া হয়, বুঝিলাম না।
সে যাহা হউক, তর্ক করিলাম না। ফিরিয়া আসিলাম। এই জলাভূমি আর কচুবনই হয় তো ইহার পর পাইব কিনা কে জানে? মন ভীষণ খারাপ হইয়া গেল।
বাড়ি আসিতেই স্ত্রী ব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—হ্যাঁ গা, কীরকম দেখলে? ভালো?
বলিলাম—চমৎকার!
–বলো না, কীরকম জায়গা? গঙ্গার ওপর?
-–সংলগ্ন বলা যেতে পারে।
—বেশ বড়ো রাস্তা করেছে?
—মন্দ নয়, বড়োই। বীণার কাকাকে সেদিন কিছু বলিলাম না। পঞ্চাশ টাকা জলে ফেলিলাম বটে, কিন্তু হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলাম। পূর্ববঙ্গই ভালো। আর জমি খুঁজিব না ঠিক করিয়া ফেলিলাম।
পরদিন র্যাডক্লিফের রায় বাহির হইল।
আমাদের দেশ পশ্চিমবঙ্গে পড়িয়াছে।
উইলের খেয়াল
দেশ থেকে রবিবারে ফিরছিলাম কলকাতায়। সন্ধ্যার আর বেশি দেরি নেই, একটু আগে থেকেই প্ল্যাটফর্মে আলো জ্বেলেছে, শীতও খুব বেশি। এদিকে এমন একটা কামরায় উঠে বসেছি, যেখানে দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই যার সঙ্গে একটু গল্পগুজব করি। আবার যার-তার সঙ্গে গল্প করেও আনন্দ হয় না। আমার দরের কোনো লোকের সঙ্গে গল্পে করে কোনো সুখ পাইনে, কারণ তারা যে-কথা বলবে সে আমার জানা। তারা আমারই জগতের লোক, আমার মতোই লেখাপড়া তাদেরও, আমারই মতো কেরানিগিরি কী ইস্কুল-মাস্টারি করে, আমারই মতো শনিবারে বাড়ি এসে আবার রবিবারে কলকাতায় ফেরে। তারা নতুন খবর আমায় কিছুই দিতে পারবে না, সেই একঘেয়ে কলকাতার মাছের দর, এম. সি. সি-র খেলা, ইস্টবেঙ্গল সোসাইটির দোকানে শীতবস্ত্রের দাম, চণ্ডীদাস কী সাবিত্রী ফিলমের সমালোচনা—এসব শুনলে গা বমিবমি করে। বরং বেগুনের ব্যাপারী, কী কন্যাদায়গ্রস্ত পাড়াগেঁয়ে ভদ্রলোক, কী দোকানদার—এদের ঠিকমতো বেছে নিতে পারলে, কথা বলে আনন্দ পাওয়া যায়। কিন্তু বেছে নেওয়া বড়ো কঠিন–কন্যাদায়গ্রস্ত ভদ্রলোক ভেবে যাঁর কাছে গিয়েচি, অনেক সময় দেখেছি তিনি ইনসিওরেন্সের দালাল।
একা বসে বিড়ি খেতে খেতে প্লাটফর্মের দিকে চেয়ে আছি, এমন সময় দেখি আমার বাল্যবন্ধু শান্তিরাম হাতে একটা ভারী বোঁচকা ঝুলিয়ে কোন গাড়িতে উঠবে ব্যস্তভাবে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি ডাকতেই ‘এই যে!’ বলে একগাল হেসে আমার কামরার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললে—বোঁচকাটা একটুখানি ধরো না ভাই কাইন্ডলি—
আমি তার বোঁচকাটা হাত বাড়িয়ে গাড়িতে তুলে নিলাম—পেছনে পেছনে শান্তিরামও হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে আমার সামনের বেঞ্চিতে মুখোমুখি হয়ে বসল। খানিকটা ঠান্ডা হয়ে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললে—বিড়ি আছে? কিনতে ভুলে গেলাম তাড়াতাড়িতে। আর ক-মিনিট আছে? পৌঁনে ছ-টা না রেলওয়ের? আমি ছুটচি সেই বাজার থেকে—আর ওই ভারি বোঁচকা! প্রাণ একেবারে বেরিয়ে গিয়েছে। কলকাতায় বাসা করা গিয়েচে ভাই, শনিবারে শনিবারে বাড়ি আসি। বাগানের কলাটা, মুলোটা যা পাই নিয়ে যাই এসে—সেখানে তো সবই—-— বুঝলে না? দাঁতন-কাঠিটা ইস্তক তাও নগদ পয়সা। প্রায় তিন-চার দিনের বাজার খরচ বেঁচে যায়। এই দ্যাখো ওল, পুঁইশাক, কাঁচা লঙ্কা, পাটালি…দেখি দেশলাইটা—
