-বলেন কী?
—সত্যি বলচি। কলোনির জমিটা চলুন কাল দেখে আসি। দেখে এসে কিছু বেশি করে জমি ওইখানেই কিনে রাখুন। কত করে দাম নেবে তা কিন্তু এখনও বলেনি। কাল সেটাও ওদের অফিস থেকে জেনে আসি চলুন—
—কোথায় যেন ওদের আপিস?
—রাজীবনগর। কোন্নগরের কাছে।
পরদিন কিন্তু আমাকে একাই যাইতে হইল। বীণার কাকা যাইতে পারিলেন না, তাঁহার বাড়িতে আবার দুটি গৃহস্থ আসিয়া উঠিয়াছেন। তাঁহাদের লইয়া তিনি বিব্রত হইয়া পড়িলেন।
কোন্নগর স্টেশনে নামিয়া রাজীবনগর যাইতে মনটা বড়ো খারাপ হইয়া গেল। স্টেশনের সংলগ্ন তো নয়ই, পাকা আড়াই মাইল দূরে। কাঁচা রাস্তা কাদায় ভরতি। যেমন জঙ্গল তেমনি মশা।
খোঁজ করিয়া এক গ্রাম্য ডাক্তারবাবুকে জমির মালিক হিসাবে পাওয়া গেল। তিনি একখানা টিনের ঘরে রোগীপত্র দেখিতেছিলেন, যাহাদের সংখ্যা আর যাহাই হউক ডাক্তারের পক্ষে ঈর্ষার বস্তু নহে। আমার দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন— কাকে চাচ্ছেন?
বিনীতভাবে বলিলাম—আপনারই নাম মনীন্দ্র ঘটক? আমি যশোর থেকে আসছি। আপনি কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন—
ডাক্তারবাবু নিস্পৃহভাবে বলিলেন—ও—
এবং পরক্ষণেই রোগীদের দিকে মনোযোগ দিলেন পুনরায়।
আমি বড়ো আশা করিয়াই গিয়াছিলাম। কলিকাতা হইতে মাত্র নয় মাইল দূরে স্টেশনের গায়ে জমি, এ জমিটা লইতে পারিলে নানাদিক দিয়াই সুবিধা। কিন্তু জমির মালিক অত নিস্পৃহ কেন? তবে কী বিক্রয় করিবেন না স্থির করিলেন?
প্রায় মিনিট দশেক কাটিয়া গেল।
দাঁড়াইয়াই আছি, কেউ বসিতেও বলে না।
আবার সাহস সঞ্চয় করিয়া বলিলাম—আমি—মানে এই ট্রেনেই আবার— মানে—ডাক্তারবাবু মুখ তুলিয়া বলিলেন—কী বলছেন?
—জমিটা—
—কোন জমি?
—কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন—স্টেশনের সংলগ্ন—কৃপালনী কলোনি—
—ও—
আবার রোগীদিগের প্রতি তাঁহার দৃষ্টি নিবদ্ধ হইল। আমিও অতটা সুবিধাসম্পন্ন যে জমিটুকু, তাহার খোদ মালিককে বিরক্ত করিতে সাহস করিলাম না।
দশ মিনিট কাটিল।
এবার ডাক্তারবাবুই আমাকে বলিলেন—তা, বসুন।
বসিবার অনুমতি পাইয়া কৃতার্থ হইলাম। অনেকক্ষণ হইতে খাড়া দাঁড়াইয়া আছি। বসিবার মিনিট দুই পরে আমি বলিলাম—ইয়ে—জমিটার কথা—মানে—
ডাক্তারবাবু মুখ তুলিয়া বলিলেন—কী বলছেন?
জমিটার কথা বলছিলাম। মানে—একবার দেখলে ভালো হয়। এদিকে বেলা হয়ে যাচ্ছে—
—জমিটা দেখবেন? ও কার্তিক-কার্তিক! যাও এই বাবুকে জমিটা দেখিয়ে আনো।
ভাবিলাম, তাই তো ইহা আবার কী, ডাক্তারখানার পাশের ঘরে বড়ো বড়ো হরফে ইংরেজিতে লেখা আছে বটে, ‘দি নিউ ন্যাশনাল ল্যান্ড ট্রাস্ট’।
গঙ্গার ধারে বিরাট ভূখণ্ড লইয়া এই উপনিবেশ গড়িয়া উঠিবে—কিন্তু গঙ্গা হইতে রাজীবনগরই তো দেখিতেছি আড়াই মাইল দূরে। তবে ইহাও হইতে পারে, দি নিউ ন্যাশনাল ল্যান্ড ট্রাস্টের অফিস এখানে, জমি গঙ্গার ধারে।
কার্তিক নামধেয় লোকটি ডাক্তারবাবুর আহ্বানে এইমাত্র আসিয়াছিল। বলিল— কোন জমি বাবু?
—আরে, ওই যে বরোজের পশ্চিম গায়ে—
–জমি?
—আ মলো যা। হাঁ করে সঙের মতো দাঁড়িয়ে রইলে কেন? হ্যাঁ, জমি। কোথাকার ভূত?
বাড়ির চাকরটা বোধ হয় বোকা, প্রভুর এমন মূল্যবান ভালো বহুবিজ্ঞাপিত ভূমিখণ্ডের সম্বন্ধে কোনো খবর রাখে না কেন?
আমি পথে বাহির হইয়া বলিলাম—চলো—
লোকটা পশ্চিমদিকে যাইতেছে দেখিয়া বলিলাম—ওদিকে কোথায় যাচ্চো? ইস্টিশানের কাছে যে জমি—কৃপালনী কলোনি—
—ইস্টিশানের কাছে কোনো জমি নেই বাবু।
—আলবত আছে। তুমি কোনো খবর রাখে না।
—না বাবু, কোনো জমি নেই ওদিকে।
—শোনো, ইস্টিশানের গায়ে—কাগজে যে জমির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। পঞ্চাশ টাকা খরচ করে নাম রেজিষ্ট্রি করতে বলা হয়েছিল যে জমির জন্যে। আমি নাম রেজেস্ট্রি করে রেখেছি—রসিদ আছে পকেটে—
—একথাটা আপনি ওখানে বললেন না কেন বাবু? আমি তো আর কোনো জমির সন্ধান জানি না। কালও তো এক বাবু এসেছিলেন, তিনিও নাম রিজিস্টারি করে নিয়ে গেলেন।
—জমি দেখেননি?
—না। ডাক্তারবাবু বললেন, জমি দেখে যাবেন সামনের রবিবারে।
—বেশ, আমায় নিয়ে চলো—
-বাবু—
—কী বলে আবার?
—আপনি জমি দেখতে চান?
—কি বলে আবোল-তাবোল! জমি দেখব না তো কী?
—আপনি এখানে দাঁড়ান, আমি জিজ্ঞেস করে আসি।
আমি বিরক্ত হইয়া নিজেই আবার ডাক্তারবাবুর কাছে গেলাম। বলিলাম— আপনার চাকর জানে না আমাকে কোথায় নিয়ে যেতে হবে।
এবার ডাক্তারবাবু দেখিলাম, আর একজন ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা কহিতেছেন। তিনিও জমির জন্যই আসিয়াছেন মনে হইল। কারণ তিনি পকেট হইতে টাকা বাহির করিয়া নাম রেজেস্ট্রি করিলেন। ডাক্তারবাবু রসিদ কাটিয়া দিলেন দেখিলাম। লোকটির সঙ্গে আরো কী কথা হইয়াছে জানি না, দু-টাকা দিয়া রসিদ লইয়া লোকটা চলিয়া গেল।
আমাকে ডাক্তারবাবু বলিলেন—জমি দেখবেন? আচ্ছা চলুন, আমিই যাচ্ছি।
পরে আমাকে দুর্গন্ধময় জল-ভরতি নালা, কচুবন, ভাঙা চালাঘর প্রভৃতির পাশ দিয়া কোথায় কোন অনির্দেশ্য রহস্যের দিকে লইয়া যাইতে লাগিলেন, তিনিই জানেন।
আমি একবার ক্ষীণ প্রতিবাদ করিবার চেষ্টা করিলাম—তিনি বোধ হয় ভুলিয়া যাইতেছেন, এ জায়গাটি স্টেশনের খুব কাছে। স্টেশনের সংলগ্ন বলিয়া বিজ্ঞাপনে আছে—
ডাক্তারবাবু আমার দিকে কটমট দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন—আপনার তো আইডিয়া দেখছি বেশ। স্টেশন-সংলগ্ন মানে কী একেবারে কোন্নগর ইস্টিশানের টিকিটঘরের পাশে হবে মশাই?
