বৈশাখের শেষের দিকে গ্রীষ্মের দাবদাহ আরও বেড়েচে, হেলিওডোরাস কি মনে করে অপরাহুের দিকে সেই উদ্যানবাটিকাতে যদৃচ্ছাক্রমে ভ্রমণ করতে করতে গিয়ে হাজির হল। পক্ক আম্রফলের গন্ধ বৈশাখ-অপরাহের উষ্ণ বাতাসে। সেই পাষাণবেদীতে আগেকার আরও দু-বারের মতো এবারও বসল। দু-বার নিষ্ফল হয়েছে এই বৃথা প্রতীক্ষা, এবারও হবে সে জানে। তা নয়, সেজন্যে সে আসেনি —কিন্তু এই লতাগৃহের বাতাসে যেন তার দেহগন্ধ মিশিয়ে আছে—পক আম্রফলের গন্ধ যেমন মিশে রয়েছে এই নিদাঘ-অপরাহ্রে বাতাসে। সে স্বপ্ন দেখতে চায়—ভাবতে চায়—কোথায় কোন সুখী প্রেমিকযুগল এমনি জনহীন নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় পরস্পরের হাত ধরে যূথীবনে বিচরণশীল—কত কথা, কত প্রণয় গুঞ্জন, কত চুম্বন উভয়ের মধ্যে,—সে আর রাজকন্যা মালবিকা।…এমন যদি কোনোদিন—
ভাবতে ভাবতে বোধ হয় তার তন্দ্রাকর্ষণ হয়ে থাকবে। গরম তো বটেই… হঠাৎ যেন একটি সুন্দর হাস্যমুখ কিশোরমূর্তি তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে তাকে এক ঠেলা দিয়ে জাগিয়ে তুলে বল্লে—আমি কতকাল অপেক্ষা করব তোমার জন্যে? ওঠো, ওঠো—
কত এলোমেলো স্বপ্ন থাকে মাথায়।
হেলিওডোরাস জেগে উঠল। বেদীর গায়ে তার খড়গখানা ঠেকানো রয়েছে, হাতে নিয়ে বাগানের বাইরে তার রথের কাছে এল।
সত্যিই সে উদভ্রান্ত, এমন অবস্থায় সে বেশিদিন এখানে কাটাতে পারবে না। পাগল হয়ে যাবে নাকি শেষে?
পথে পা দিতেই বৃদ্ধ ভিক্ষুক ওর কাছে ভিক্ষা চাইলে। ও অন্যমনস্কভাবে কিছু মুদ্রা ওর হাতে দিতে গেল—দেখলে, সেটি একটি স্বর্ণমুদ্রা—ফিরিয়ে নিতে যাবে, কিন্তু পরক্ষণেই অপরিসীম ঔদাসীন্যের সঙ্গে মুদ্রাটি ভিক্ষুকের হাতে ফেলে দিলে। কি হবে অর্থ তার জীবনে? নীরস জীবন, মরুময় জীবন। পিতা ডিওন সুখে থাকুন, কিন্তু তাঁর বংশের পাপ—প্রজাদের অর্থশোষণ, তাদের উপর অত্যাচার
ভিক্ষুক স্বর্ণমুদ্রা হাতে পেয়ে অপ্রত্যাশিত আনন্দে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল— বাসুদেব আপনার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করুন—
হেলিওডোরাসের অন্যমনস্কতা একচমকে কেটে গেল। বল্লে—কি বলছিস তুই? এই দাঁড়া—
ভিক্ষুক ভয়ে ভয়ে বল্লে—খারাপ কিছু বলিনি বাবা, বাসুদেব আপনার মনের বাসনা পূর্ণ করুন, তাই বলচি—
—কে তিনি?
—মস্ত বড়ো মন্দির বাসুদেবের—জানেন না?
–খুব জানি। কেন জানব না—ভারতীয় দেবতার মন্দির। দেখেচি—
—তিনি যে জাগ্রত দেবতা বাবা, যে যা ভেবে মানত করে, তিনি তার মনের ইচ্ছা পূর্ণ করেন। আমি একবার—
হেলিওডোরাস আর একটি মুদ্রা তার হাতে দিয়ে বল্লে—যা পালা—মুণ্ডু কেটে ফেলে দেব, আর একটি কথা বল্লে—
সেই বৈশাখী জ্যোৎস্নারাত্রে উদভ্রান্ত হেলিওডোরাসের মনে ভিখিরির এই কথা যেন দৈববাণীর আশ্বাস নিয়ে এল। বাসুদেব…ভারতীয় দেবতা বাসুদেব…
মনের বাসনা পূর্ণ হবে তার? সে যা চায়? মালবিকাকে না-পেলে বিশাল ইরিথিয়ান সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ছাগপদ বনদেবতাদের খুঁজে বের করবে সামোস দ্বীপের বন্য দ্রাক্ষাকুঞ্জের নিভৃত আশ্রয়ে, জলপাই ও মার্টল বৃক্ষের ঝোপে ঝোপে আর্দ্র পাষাণমঞ্চে শুয়ে ওক পাইনের তলে সারাজীবন কাটিয়ে দেবে বন্যফল খেয়ে—ছাগপদ স্যাটিরদের দলে মিশে চিরযৌবনা বনদেবীদের সন্ধানে…অথবা বনদেবীদের প্রয়োজন নেই… রাজনন্দিনী মালবিকার সন্ধানে সে চিরযুগ ঘুরবে—
পরদিন বৈশাখী পূর্ণিমা। সন্ধ্যার সময় সে গিয়ে বাসুদেবের মন্দিরের বিশাল চত্বরের একপাশে এক গাছতলায় দাঁড়াল। বিরাট পাষাণমন্দিরের চূড়া ঊধর্বাকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে—মন্দিরের অভ্যন্তরে শঙ্খঘণ্টার ধ্বনি—মন্দিরের প্রাঙ্গণে শত শত নরনারীর ভিড়—স্থানে স্থানে পুষ্পবিক্রেতা বসে আছে নানা বর্ণের পুষ্পের ডালি সাজিয়ে, দলে দলে মেয়ে-পুরুষ চলেচে মন্দিরে। সে জানে তাকে মন্দিরের মধ্যে প্রবেশ করতে হয়তো বাধা দেবে, তবুও সে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ল সন্ধ্যার অন্ধকারে গা মিশিয়ে। বেশি দূর যেতে সাহস হল না কিন্তু।
দূর থেকে দেখা গেল গর্ভদেউলের অন্ধকারে ধাতুপ্রদীপের আলোয় বাসুদেবের প্রস্তরমূর্তির মুখ। কোথায় যেন সে এ মুখ দেখেচে, ঠিক মনে করতে পারলে না। কোথায়?…কবে?
অন্য লোকের দেখাদেখি হাতজোড় করে প্রার্থনা করলে—হে বাসুদেব, আমি বিদেশি, বিধর্মী। তোমার কাছে এসেছি, তুমি নাকি মানুষের মনের বাসনা পূর্ণ করো। আমার মনের বাসনা তুমি জানো, আমি অন্য ধর্মের লোক বলে তুমি আমার প্রার্থনা অবহেলা করতে পারবে না কিন্তু। আমার নাম হেলিওডোরাস— তক্ষশিলায় আমার বাড়ি। মনে করে রেখো
বাসুদেবের বিশাল মন্দিরের পাষাণচূড়া বৈশাখী পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। নরনারীর ভিড় ক্রমশই বাড়ছে—হয়তো এখানে আজ কোনো উৎসব আছে। নরনারীদের মধ্যে কেউ কেউ তার দিকে কৌতূহলের দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে গেল—হয়তো ভাবলে একজন গ্রিক যুবক বাসুদেবের মন্দিরে কি করছে?
একটি লোককে দেখে হেলিওডোরাস তাকে ডাক দিলে। লোকটি ছুটে এল তার কাছে, তার গলায় উপবীত, কপালে চন্দনের ফোঁটা, শিখায় পুষ্প বাঁধা।
হেলিওড়োরাসের অনুমান যথার্থ, সে মন্দিরের একজন পরিচারক ব্রাহ্মণ বটে। লোকটিকে সে বল্লে—কত লাগে তোমাদের দেবতাকে কিছু ফলমূল মিষ্টান্ন কিনে দিতে?
একজন গ্রিকের এত ভক্তি দেখে বোধ হয় লোকটি একটু অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে বল্লে—আপনি কি পূজো দেবেন?
