বৎসর প্রায় ঘুরে গেল। শীত এল, চলেও গেল। পুরুষপুরে এবার তুষারপাতের সংবাদ পাওয়া গিয়েছে—অতিদুর্দান্ত শীতের দিন এবার! ফাল্গুনী চতুর্দশী তিথির মনোরম জ্যোৎস্নালোকে, অজস্র বিহঙ্গকাকলী ও পুষ্পপ্যাপ্তির মধ্যে হেলিওডোরাসের দিনগুলি যেন স্বপ্নের মতো কাটছে—রাজকার্যের অবসানে নিজের রথটি নিয়ে বার হয়ে নগরীর বহু দূর পর্যন্ত চলে যায়। এখানে সে প্রায় একা, তবে দু-একটি ভারতীয় কর্মচারীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে এবং মালবের ভাষা সে একরকম আয়ত্ত করে ফেলেচে এক বৎসরে।
এই সময়ে একদিন সে তার সেই পরিচিত উদ্যানবাটিকাতে ঢুকল পথের পাশে রথ থামিয়ে। পুষ্প পুষ্পে, নববল্লীপল্লবে, চুতমুকুলের সুবাসে, কোকিল-ঝংকারে প্রাচীন উদ্যান তার বৃদ্ধত্ব পরিহার করে নবযৌবনের রূপ পরিগ্রহ করেচে, নিভৃত লতাগৃহ যেন গ্রিক রতিদেবতার আসন্ন পাদস্পর্শের আগ্রহে উৎসববেশে সজ্জিত হয়েছে। সেই পাষাণবেদীতে সে মুগ্ধ মনে চুপ করে বসে আছে, এমন সময় কার পদক্ষেপের শব্দে চমকে পিছন ফিরে যা দেখলে তাতে সে বিস্মিত ও বিচলিত হয়ে উঠল।
একটি রূপসী তরুণী তার পিছনে কিছুদূরে দাঁড়িয়ে। অপূর্ব তার অঙ্গলাবণ্য, ক্ষীণ কটিতটে রত্নমেখলা, নিবিড় কৃষ্ণ কেশপাশে টাটকা তোলা যূথীগুচ্ছ, গ্রিক মেয়েদের মতো দীর্ঘদেহা অথচ তন্বী। মেয়েটি অবশ্য ভারতীয়, সাজপোশাকেই হেলিওডোরাস বুঝল।
মেয়েটিও তাকে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছে, মনে হল হেলিওডোরাসের। বিস্ময়ে তার চারু আয়ত কৃষ্ণ নেত্ৰদুটি স্তব্ধ অচঞ্চল। কিছুক্ষণ দুজনের কেউ কথা বললে না।
তারপর হেলিওডোরাস উঠে দাঁড়িয়ে বল্লে–ভদ্রে, এ উদ্যান বোধ হয় আপনাদের! আমি পথিক, বেড়াতে এসে একটু বসেছিলাম—
মেয়েটি কোনো কথা না-বলে ফিরে চলে যেতে উদ্যত হল।
হেলিওডোরাসের মূঢ়তা ততক্ষণে ঘুচেছে। সে হাজার হলেও গ্রিক ভদ্রলোক, বিনীত সুরে বল্লে—একটু দাঁড়াবেন দয়া করে? আমার এই অনধিকার প্রবেশের
জন্যে আমি বিশেষ লজ্জিত—আমায় যদি ক্ষমা করেন—
মেয়েটি যেন কম্পিত অগ্নিশিখা, নিজের মহিমায় নিজে দীপ্তিমতী। হেলিওডোরাস এই ভারতীয় মেয়েটির অপরূপ রূপমাধুরীতে কেমন বিস্মিত হয়ে উঠেছে। এত রূপ হয় এদেশের মেয়ের? এমন শ্বেতাঙ্গ সুন্দর দেহকান্তি যেকোনো সুন্দরী গ্রিক তরুণীর পক্ষেও দুর্লভ।… মেলিবিয়া কোথায় লাগে!
হেলিওডোরাস সসংকোচে তার কথা শেষ করবার অতিঅল্পক্ষণ পরেই মেয়েটি নম্নসুরে বল্লে—আপনি কি গ্রিক?
—হাঁ, ভদ্রে—
—অল্পদিন এসেছেন এখানে?
—না ভদ্রে, এক বৎসর হল—আমি রাজসভার তক্ষশিলার গ্রিকদূত—আমার নাম হেলিওডোরাস— রূপসী বালিকা বিস্ময়ে কৃষ্ণ জ্বযুগল ঊধ্বদিকে ঈষৎ তুলে হেলিওডোরাসের দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে চেয়ে বল্লে–ও!…
—কেন? আমার কথা কি আপনি শুনেছিলেন?
—হাঁ। বাবার মুখে শুনেছিলাম, সভায় একজন রাজদূত—
হেলিওডোরাস মনে মনে ভাবলে, ইনি বোধ হয় কোনো রাজ-অমাত্যের কন্যা হবেন। বল্লে—আপনার পিতা রাজসভায় কি পদে-আমি অনেককেই চিনি—
মেয়েটি কিছু বলবার পূর্বেই আরও দুটি সুন্দরী মেয়ে—ওরই প্রায় সমবয়সি— সেখানে এসে পড়ল কোথা থেকে। ওদের দুজনকে দেখে তারাও যেন অবাক হয়ে গিয়েছে। একজন বল্লে—কত খুঁজে বেড়াচ্চি তোমাকে—বাবাঃ—এখানে কি হচ্চে?
মেয়ে দুটি বিস্ময়ের দৃষ্টিতে হেলিওডোরাসের দিকে চাইলে। সে দৃষ্টির মধ্যে প্রশ্নও ছিল।
হেলিওডোরাস বল্লে—আমি এখানে বেড়াতে এসে একটু বসেছিলাম। আমি জানতাম না যে আপনাদের বাগান! সেই সময় আপনাদের সখী—
মেয়ে দুটি সে-কথার কোনো উত্তর না দিয়ে একটু তাচ্ছিল্যের সঙ্গেই মুখ ঘুরিয়ে তাদের সখীর দিকে চেয়ে বল্লে—চলো! মহাদেবী ভাববেন—কতক্ষণ বেরিয়েচি
এমন সময় আরও তিন-চারটি তরুণী সেখানে এসে দাঁড়াল। তাদের পেছনে দেখা গেল আরও দুটি আসচে। পেছনের মেয়েগুলি কলরব করতে করতে আসছিল। ওদের মধ্যে কে বল্লে—কি হচ্ছে সব, জটলা ওখানে কি হয়েছে?
নব বসন্তের বাতাস যেন মদির হয়ে উঠেচে, ওদের সম্মিলিত কণ্ঠের তরল হাস্যকলরবে চুতমঞ্জরী এই পুষ্পলাবণী তন্বী বালিকাদের নূপুরনিক্কণে।
হেলিওডোরাস প্রথমদৃষ্টা সেই অপরূপ রূপসীকে সম্বোধন করে বল্লে—আমি চলে যাচ্চি, আমায় ক্ষমা করুন—আপনার পিতার নামটি তো শুনতে পেলাম না ভদ্রে?
একজন মেয়ে ভালো করে মুখ না-ফিরিয়েই ঈষৎ উদ্ধত স্বরে বল্লে—তাঁর পিতার নাম মহারাজ ভাগভদ্র।
তারপর সবাই মিলে একদল বন্যহংসীর মতো লঘু পদক্ষেপে লতাবিতানের অন্তরালে অদৃশ্য হল।
হেলিওডোরাস কোনোরকমে বাগান থেকে বার হয়ে এল।
স্বয়ং রাজকন্যা মালবিকা, এঁর রূপের খ্যাতি বিদিশায় এসে পর্যন্ত সমবয়সি দু একজন বন্ধুবান্ধবের মুখে সে যথেষ্ট শুনে এসেচে। নগরচত্বরে ভ্রমণশীল অনেক মেয়েকে দেখে মনে হয়েছে, রাজকন্যা কেমন রূপসী? এই রকম?
আজ এভাবে…
আশ্চর্য! কিন্তু–
হেলিওডোরাসের মাথার মধ্যে কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্চে। উঃ, কি গরম আজ! বিশ্রী জায়গা এই বেশনগর। এমন গরমে মানুষ টেকে?
অপূর্ব রূপসী এই রাজকন্যা মালবিকা! অপূর্ব…অপূর্ব…অপূর্ব-দেবী মিনার্ভার মতো মহিমময়ী, অ্যাফ্রদিতির মতো লাস্যময়ী, রূপবতী, সাক্ষাৎ রতিদেবী, অ্যাফ্রদিতি, মূর্তিমতী প্রণয়কবিতা, সাফোর বহ্নিজ্বালাময়ী প্রেমের কবিতা সাফোর—
৩.
আরও এক মাস কেটে গেল। গ্রীষ্মকাল এসে পড়েছে। বৃদ্ধা স্ত্রীলোকেরা মাথায় করে ঝাঁকে ঝাঁকে খরমুজা বিক্রি করতে আনচে বাজারে। এই একমাস কি কষ্টে যাপন করচে হেলিওডোরাস— সেই জানে। কাউকে বলতে পারেনি যে, তার সঙ্গে রাজকন্যা মালবিকার দেখা হয়েছিল, কে কি মনে করবে, কার কানে কি কথা উঠবে! এসব হিন্দুরাজ্যের আইনকানুন বড়ো কড়া কথায় কথায় প্রাণদণ্ড! মৃত্যুকে সে ভয় করে না কিন্তু নির্বোধের মতো মৃত্যুকে ডেকে আনার দরকার কি!… সেই দিনটি থেকে তার শয়নে-স্বপনে রাজকন্যা মালবিকা। কতবার সেই উদ্যানের আশেপাশে বেড়িয়েচে… দু-দিন প্রাণ তুচ্ছ করে ঢুকেও ছিল, সেই পাষাণবেদীতে গিয়ে বসেছিল, কিন্তু সে উদ্যান যেমন সে দিনটির পূর্বে ছিল জনহীন, তেমনি তখনও। অবহেলিত উৎসমুখ, ভগ্ন যক্ষমূর্তি, বনেজঙ্গলে সমাচ্ছন্ন পুষ্পবাটিকা, লতাগৃহ…শৈবালাচ্ছন্ন পাষাণ-প্রাসাদ…জনশূন্য অলিন্দ…কিন্তু হেলিওডোরাস আর বাঁচে না…সত্যিকার প্রেমজীবনে এই প্রথম এসেচে তার বহ্নিজ্বালা নিয়ে। জীবনে আর সব কিছু তুচ্ছ হয়ে গিয়েচে.আর একটিবার সেই অপরূপ রূপসী তরুণী দেবীর সঙ্গে দেখা হয় না? সব কিছু দিয়ে দিতে পারে হেলিওডোরাস…একটিবার চোখের দেখা…সব দিক থেকে অসম্ভব…সে সামান্য রাজদূত, কর্মচারী মাত্র—তাতে বিদেশি, বিধর্মী… অন্যদিকে প্রবলপ্রতাপ মহারাজ ভাগভদ্রের কন্যা সে…
