—হ্যাঁ।
—যা দেবেন আপনি! দু-দিনার, দশ দিনার–
—তক্ষশিলার স্বর্ণমুদ্রা এখানে চলবে?
—কেন চলবে না হুজুর? শ্ৰেষ্ঠীর দোকানে ভাঙিয়ে নিলেই চলবে—
—আচ্ছা নিয়ে যাও। আমার নাম হেলিওড়োরাস, নাম মনে থাকবে? আমার নামে এই মুদ্রার পরিমাণ ফল-ফুল মিষ্টান্ন কিনে দেবে—কেমন তো?
—নিশ্চয়ই। বাসুদেবের নামে দিচ্চেন—আপনি দেখচি একজন ভক্ত।
—আচ্ছা যাও–
—আমার দক্ষিণাটা—
হেলিওডোরাস পূজারিকে আরও কিছু দিয়ে সেখান থেকে বার হয়ে মন্দিরের সিংহদ্বারের কাছে এল।
সেই দিনটির পর সে মাঝে মাঝে প্রায়ই বাসুদেবের মন্দিরে এসে একবার করে দেবতাকে তার প্রার্থনা জানিয়ে যায়। মাসের পর মাস চলে গেল, মন্দিরের দেবতা তার প্রার্থনা শুনলেন কই? কোথায় তার মানসীপ্রতিমা…যার জন্যে এত আকুল প্রতীক্ষা—কেবল হাঁটাহাঁটিই সার।
৪.
একদিন এই অবস্থায় মন্দির থেকে বাড়ি ফিরে দেখলে তক্ষশিলা থেকে দূত এসেচে রাজা অ্যান্টিআলকিডাসের সেনাপতি অ্যারিওস্টোসের পত্র নিয়ে। পত্র খুলে পড়লে, এক্ষুনি তাকে ফিরে আসতে হবে তক্ষশিলায়। জরুরি দরকার।
হেলিওডোরাস বিস্মিত হল। দূতকে বল্লে—তুমি কিছু জানো?
সে ব্যক্তি বিশেষ কিছু জানে না। কোনো গোপনীয় রাজকার্য হবে।
সেইদিনই হেলিওডোরাস তক্ষশিলার প্রত্যাবর্তন করলে। সেখানে গিয়ে শুনলে ব্যাপার গুরুতর বটে। মধ্য-এশিয়া থেকে যুদ্ধদুর্মদ শ্বেতকায় হৃদল গান্ধার আক্রমণ করে ভারতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের অত্যাচারে গান্ধার ও কপিলার বহু গ্রাম, জনপদ ধ্বংস হয়েছে, বহু নগরী বিধ্বস্ত হয়েছে। পুরুষপুর, বেণুপত্র, মাত্রাবতী, বলভী প্রভৃতি রাজ্য বিপন্ন। পুরুষপুরের গ্রিকরাজ হিরাক্লিয়াস ও বেণুপত্রের মহাসামন্ত কুজ বিষ্ণুবর্ধন তক্ষশিলার সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। রাজা সৈন্যদল পাঠাচ্চেন—হেলিওডোরাসকে যেতে হবে যুদ্ধে। হেলিওডোরাস আদেশ পেলে—সেনাপতি অ্যারিওস্টোস ও মহাসামন্ত কুজ বিষ্ণুবর্ধনের অধিনায়কত্বে একদল সৈন্য ‘চন্দ্রভাগা’ পার হয়ে গান্ধারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে—ওদের সঙ্গে অবিলম্বে যোগ দিতে হবে।
তিন বছর কাটল। আজ বলভী, কাল অন্যত্র, পরশু কপিলা। পর্বত, প্রান্তর, নদী—গান্ধার থেকে পুরুষপুর, পুরুষপুর থেকে গান্ধার। শ্বেতকায় হুণেরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত—অনেকবার তাদের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ হল মরুভূমিতে, পর্বতের সংকীর্ণ অধিত্যকায়, কত গণ্ডগ্রামের রাজপথে। মানুষ মরে পাহাড় হয়ে গেল–যত না যুদ্ধে, তত দুঃখে কষ্টে অনাহারে। হুণের দল রক্তলোলুপ পশুর মতো জনপদবাসীদের উপর অত্যাচার করতে লাগল। রাত্রের আকাশে আলো হয়ে ওঠে দুহ্যমান শস্যক্ষেত্রের বা গ্রাম-জনপদের বাসগৃহের রক্ত অগ্নিশিখায়। মানুষ নৃশংস হত্যার লালসায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। যুধ্যমান সৈন্যবাহিনির নির্মম রথচক্রতলে শত শত নিরীহ নারী, শিশু, অসহায় বৃদ্ধ পিষ্ট হয়ে মেদরক্তে পথের ধূলি কর্দমাক্ত করে তোলে। সর্বগ্রাসী প্রলয়দেব করাল কৃপাণ দু-হাতে বন বন করে ঘোরান— শাণিত খড়েগর ফলকে ফলকে সূর্যকিরণ ঠিকরে পড়ে। কপিলার উত্তরভাগ শ্মশান হয়ে গেল এই তিন বৎসরে। গভীর নিশীথে সেখানে মুণ্ডমালিনী করালিনী কালভৈরবীর রক্তসিক্ত জিহ্বা লকলক করে অন্ধকারে। শিবাদলের অমঙ্গল চীৎকারে অন্তরাত্মা কাঁপে।
একটি খণ্ডযুদ্ধে হেলিওডোরাস হূণদের হাতে বন্দি হল। কেন তারা তাকে হত্যা করলে না, সে নিজেই জানে না…অবাক হয়ে গেল সে। পশুচর্মের তাঁবুতে উটের দুধ ও ছাতু খেয়ে পর্যুষিত পশুমাংস খেয়ে সে এক মাস অতিকষ্টে কাটাল। প্রতিক্ষণেই মৃত্যুর প্রতীক্ষা করে—অথচ কেন তাকে ওরা মারে না কেন জানে? একদিন সে শুয়ে আছে তাঁবুতে, স্বপ্ন দেখলে এক সুন্দর তরুণ তাকে ঠেলা মেরে উঠিয়ে বলচে—আমার সঙ্গে এসো, আমি তোমায় পথ দেখিয়ে দিচ্চি পালাবার—
বাইরের অন্ধকার ছুরি দিয়ে কাটা যায়। এখানে-ওখানে হূণ-প্রহরীদের অগ্নিকুণ্ড। আবছায়া অন্ধকারে চলেচে দুজনে, তরুণ আগেও পিছনে। পথপ্রদর্শক তরুণের মূর্তি অন্ধকারে অস্পষ্ট, ভালো দেখা যায় না। সম্মুখেই অজিরাবতী নদী…
—নামো নামো, জলে নামো। মাভৈঃ—
স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো নামচে হেলিওডোরাস। কনকনে বরফগলা জল, প্রথমে একহাঁটু, পরে কোমর, তারপরে একগলা।
আগে যে যাচ্ছে সে বলচে, ভয় নেই, চলে এসো। এই জায়গায় নদীর জল কম, চিনে রাখো এই শালগাছ—ডুবে যাবে না।
একগলা জলে পড়তেই হেলিওডোরাসের ঘুম ভেঙে গেল…ভোর হয়েছে। স্বপ্নের কথা সে ভাবলে। কে এই কিশোর, একে সে কোথাও আরও স্বপ্নে দেখেচে —পরিচিত মুখ! হঠাৎ মনে পড়ল—সেই বিদিশার প্রাচীন উদ্যানবীথি…সেই বাপীতট (স্বপ্নযোগে উদভ্রান্ত সে এক দিন একেই দেখেছিল।)—কেন সে বার বার এই কিশোরকে স্বপ্নে দেখে? কে এই তরুণ?
সারাদিন সে স্বপ্নের কথা ভাবলে। তার দৃঢ় বিশ্বাস হল, আজ রাত্রে সে পালাতে চেষ্টা করলে কৃতকার্য হবে। গভীর নিশীথে তাঁবুর বার হয়ে এল সে—হাতে-পায়ে শৃঙ্খল ছিল না। আসবপানমত্ত হূণ-প্রহরীরা অগ্নিকুণ্ডের ধারে তন্দ্রামগ্ন। অদূরে অজিরাবতী নদী, ওই সেই শালগাছ। নিঃশব্দে জলে নেমে চক্ষের নিমেষে সে ওপারে উঠল গিয়ে শালবনের মধ্যে কুজ বিষ্ণুবর্ধনের স্কন্ধাবারে।
যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল সেই শীতকালের প্রথমেই। দীর্ঘকাল পরে হেলিওডোরাস তক্ষশিলায় ফিরলে। মাসখানেকের মধ্যেই রাজার কাছে প্রার্থনা জানিয়ে মালবে সে পূর্বপদে ফিরে এল। কীসের যেন আকর্ষণ, কে যেন টানে!
