—নিয়ারা কোথায় গেল?…
ডিওন আজ বেশি সুরা পান করেননি। মন তাঁর ভালো নয়, ছেলেটা আজ কি কাল বাড়ি থেকে চলে যাবে, সঙ্গে এবার তিনি তাঁর প্রিয় বালকভৃত্য জোজিফাস ওরফে জুজুকে প্রবাসে ছেলের সেবা করতে পাঠাবেন। ডিওন অনেকদিন বিপত্নীক, বাড়িতে প্রিয়দর্শন পুত্র ও বালক-ভৃত্যটিও অনুপস্থিত থাকবে। একপাল দাসীদের মধ্যে (তাদের মধ্যে অনেকেই অসন্তুষ্ট, কারণ সময়মত বেতন পায় না) সন্ধ্যা কাটানো এই বয়সে ভালো লাগে?…কী যে করবেন–
নিয়ারা প্রবেশ করলে, বয়সে সে ডিওনের চেয়ে অনেক ছোটো তবুও চল্লিশের কম নয়, কিন্তু দেখায় ত্রিশ, সোনালিপাড় দামি রেশমি অঙ্গাবরণ, দুটি বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত হয়ে ওর গৌর অঙ্গের শোভা বর্ধিত করচে। কিন্তু মাথায় গ্রিক মহিলাদের ন্যায় পুষ্পমাল্য, সুন্দর চোখের ভুরু কাশ্মীরি জাফ্রানের রেণু, চন্দন ও বার্জ বৃক্ষের আটা মিশিয়ে চিত্রিত করা। তাতে চোখের ভুরু দুটি কালো না-দেখিয়ে হলদে দেখাচ্চে। নিয়ারার পিতা ব্যাকট্রিয়ান গ্রিক, কিন্তু মাতা পারস্যদেশীয়া।
ন্যানিফাসের কথার উত্তরে নিয়ারা বল্লে—আমার গুরু এসেছেন, তাই আনন্দে কথাবার্তা বলছিলুম তাঁর সঙ্গে।
ন্যানিফাস বল্লে—সে আবার কে?
—তিনি একজন ভারতীয় যোগী। বারাণসী থেকে এসেছেন—
সবাই একবাক্যে বলে উঠল—আমরা একবার দেখব–
—তিনি কাউকে দেখা দেন না, কারো কাছে কিছু চান না তো তিনি।
ন্যানিফাস বল্লে—আচ্ছা নিয়ারা, তুমি একজন এদেশি ধাপ্পাবাজের পাল্লায় পড়ে গেলে কী বলে? এ যে রকম শুরু হোল দেখচি, কবে আমাদের বন্ধু ডিওন মুণ্ডিতমস্তক বৌদ্ধভিক্ষু না-হয়ে দাঁড়ায়!
সুরাপায়ী, বিলাসী, স্থূলদেহ ডিওন পকেশে পুষ্পমাল্য ধারণ করে একপাশে পর্যঙ্কে শুয়ে ছিলেন, তাঁকে মুণ্ডিত-মস্তক বৌদ্ধভিক্ষুর বেশে কল্পনা করে সর্বপ্রথমে প্রৌঢ়া সুন্দরী নিয়ারা হি-হি করে হেসে গড়িয়ে পড়ল, পরে ডিওনের সব বন্ধুই সেই হাসিতে যোগদান করলে।
এমন সময় দেখা গেল, একজন দীর্ঘদেহ কৌপীনধারী লোক, সর্বাঙ্গে বিভূতি মাখা, হাতে কমণ্ডলু, আয়ত চক্ষুদ্বয় জ্যোতিষ্মন—কোন সময়ে ছাদের ওপর এসে দাঁড়িয়েচেন। সকলে চমকে উঠল—ডিওন বল্লে—কে তুমি?
সন্ন্যাসী বল্লেন—বাবাজিদের জয় হোক।
—কী?…এ উত্তর শুধু ডিওন দিলেন।
—এই মেয়েটি আমায় বড়ো মানে। আমি একে এই পাপজীবন থেকে উদ্ধার করতে চাই। আপনারা এখানে আর আসবেন না।
—কোথায় যাব আমরা? তুমি কোন নবাব এলে জানতে পারি কী?
সন্ন্যাসী রোষকষায়িত নেত্রে বল্লেন—বৃদ্ধ লম্পট! পরকালের দিন সমাগত, ভয় হয় না? এখনও এই সব–
সবাই মিলে হুংকার দিয়ে ঠেলে উঠল—এত বড়ো স্পর্ধা!… কিন্তু আশ্চর্য, কারো সাধ্য নেই যে নিজ নিজ আসন ছেড়ে উত্থিত হয়। ডিওনকে দেখা গেল তাঁর স্থূলদেহ নিয়ে তিনি পর্যঙ্ক থেকে উঠবার চেষ্টায় নানারূপ হাস্যকর অঙ্গভঙ্গি করচেন—এ যেন এক রাত্রির দুঃস্বপ্ন। …সন্নাসী মৃদু হেসে বল্লেন—নিয়ারাকে আমি কন্যার মতো দেখি, মা বলে সম্বোধন করি। ওর পারলৌকিক উন্নতির জন্যে আমি দায়ী। তোমাদের মতো সুরাসক্ত লম্পট ওকে অধ:পতনের পথে নিয়ে চলেচ। তোমাদের সাবধান করে দিয়ে গেলাম। এর পরেও যদি আসো, বিপদে পড়ে যাবে। পরে ন্যানিফাসের দিকে চেয়ে বল্লেন—শোনো, তোমার দিন আসন্ন। এই সুরা ও নারী তোমাকে মৃত্যুর পথে নিয়ে যাবে। পরকালের কথা চিন্তা করো। এখন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে একটি প্রশস্ত রাজপথের পার্শ্ববর্তী পুরাতন কূপে তোমার মৃতদেহ ভাসচে আমি দেখতে পাচ্ছি—
ন্যানিফাসের মুখ হঠাৎ বিবর্ণ, পার হয়ে উঠল। সুরার নেশা ততক্ষণ তার এবং সকলেরই কেটে গিয়েচে।
—আর ডিওন, তোমার বংশে একটি অদ্ভুত পরিবর্তন আসন্ন। কিন্তু সেজন্যে তুমি ভগবানকে ধন্যবাদ দিও—বিদায়!…আমি চলে গেলে তোমরা পূর্ব-অবস্থা প্রাপ্ত হবে— বিদায়!…
সন্ন্যাসী অন্তর্ধান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই নিজ নিজ অবস্থা পুনঃপ্রাপ্ত হলেন। দোরের কাছে নিয়ারা দাঁড়িয়ে, তার মুখে মৃদু হাস্য।
ডিওন বল্লেন—কী?
ন্যানিফাস বল্লে—কী?
অন্য সবাই বল্লে—কী?
নিয়ারা নিরুত্তর। একটি দুজ্ঞেয় রহস্যের মতোই অতিক্ষীণ একটি হাস্যরেখা তার ওষ্ঠপ্রান্তে মিশে রইল।
২.
শরৎ ঋতু শেষ হয়েছে, প্রথম হেমন্তের সুশীতল বাতাস গত গ্রীষ্মদিনগুলির দাবদাহ স্মৃতিতে পর্যবসিত করে তুলেচে। হেলিওডোরাস মালবে আজ মাস দুই ফিরে এসেছে। রাজধানী বিদিশার উপকণ্ঠে একটি বৃহৎ উদ্যানবাটিকা দূর থেকে তার ভালো লাগে। প্রাচীন অশোক, বকুল, বট, নাগকেশর ও সপ্তপর্ণ তরুশ্রেণীর নিবিড় ছায়ায় উদ্যানটি যেন নিভৃত তপোবনের মতো শান্তিপ্রদ ও মনোরম। কত পক্ষীকুলের সমাবেশ ও বিচিত্র কলতানে ছায়াবিতানগুলি যেন মুখর।
কয়েকদিন সেদিকে সে একাই গ্রিক রথ হাঁকিয়ে বেড়াতে যায়। টাঙ্গা-জাতীয় এই গ্রিক যানগুলির চলন তক্ষশিলা এবং প্রায় সর্বত্র সভ্য সভ্য নগর-নগরীতে দেখা যায় আজকাল। স্প্রিং নেই, বড়ো একটা কাঠের বা লোহার খুরোর ওপরে শকটের যতটুকু বসানো,—তাতে বড়ো জোর দুজন লোকের স্থান সংকুলান হতে পারে। একদিন সে কী ভেবে প্রাচীরের একটি নিম্নস্থান উল্লঙ্ঘন করে উদ্যানের মধ্যে প্রবেশ করলে। উদ্যান তো নয়, যেন নিবিড় বন। বহুকালের উদ্যান, বড়ো বড়ো গাছগুলিতে নিভৃত কোণ ও ছায়া রচনা করেচে নানাস্থানে—পাষাণ-বাঁধানো বাপীতটে সুন্দর লতাগৃহ, অশোককুঞ্জ, উৎস, যক্ষমূর্তি ইত্যাদি দ্বারা শোভিত নির্জন উদ্যানের মধ্যে কিছু দূরে প্রাচীন দিনের ভারতীয় স্থাপত্য প্রণালীতে নির্মিত একটি বিশাল অট্টালিকা বৃক্ষশ্রেণীর মধ্যে দিয়ে চোখে পড়ে—কিন্তু সেখানে কেউ বাস করে বলে মনে হল না। হেলিওডোরাস আপন মনে পরিভ্রমণ করতে করতে একটি পাষাণবেদীতে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করলে—তারপর সেখানে থেকে বের হয়ে রথ হাঁকিয়ে চলে এল। সেই থেকে মাঝে মাঝে উদ্যানটিতে যায়—কখনও মধ্যাহ্নে, কখনও সন্ধ্যায়, কখনও একাই জ্যোৎস্নাময়ী রজনীতে।
