—কেন?
—গ্রীষ্মপ্রধান দেশ। এদেশের গ্রিকরা অতিরিক্ত বিলাসী ও আরামপ্রিয় হয়ে পড়েছে। পূর্বপুরুষের রক্তের সে তেজ নেই এদের মধ্যে। শুধু তা নয়, এরা দেশি লোকের সঙ্গে যেভাবে মেশে, অনেকে দেশি খাদ্য খায় ও পরিচ্ছদ ধারণ করে, যেমন সেদিন এক গ্রিক ভদ্রলোকের গায়ে কাশ্মীরি শাল দেখলাম—ছিঃ ছিঃ লজ্জাও করে না!—বেশি কথা কি বলব, অনেকে এদেশি মেয়েদের সঙ্গে
এইসময়ে স্কুলমাস্টারের হঠাৎ মনে পড়ত যে তাঁর শ্রোতা বালক এবং ছাত্র। স্বজাতির অধ:পতনের দুঃখ যা বলে ফেলেছেন তা যথেষ্ট। বলে উঠলেন—তা ছাড়া দেখচো না, গ্রিক রাজধানী তক্ষশিলা বৌদ্ধবিহারে ভরা। যাকগে। কবিতা মুখস্থ বলে যাও—
কখনো-কখনো ভীষণ গ্রিষ্মের দিনে তক্ষশিলার কোনো প্রমোদ-উদ্যানের মধ্যে নিভৃত কুঞ্জে ছায়াসনে তিনি ছাত্রদের নিয়ে বসতেন। অতীত যুগের গ্রিকদের বীরত্ব, আত্মত্যাগ প্রভৃতি জ্বলন্ত ভাষায় বর্ণনা করে যেতেন, ইউরিপিডিস ও সাফোর কবিতা আবৃত্তি করতেন, প্লেটোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদেশাবলি বুঝিয়ে দিতেন। কয়েক বছর তক্ষশিলার থাকার পরে তিনি হঠাৎ কোথায় চলে যান। জনশ্রুতি যে, তিনি এইসময় স্বদেশে ফিরতে ব্যর্থ হয়ে উঠেছিলেন। মৃত্যুর পূর্বে আর একবার তিনি প্রিয় জন্মভূমির পবিত্র মৃত্তিকা স্পর্শ করতে চান।
সেই থেকে হেলিওডোরাস পূর্বপুরুষের গৌরবে গৌরবান্বিত, ভারতীয়দের সে ঘৃণাই করে স্পার্টার যুবকদের আদর্শে শরীর গড়ে তুলেচেভারতীয়দের সঙ্গে গ্রিকরা যে বেশি মেলামেশা করে, এটা সে পছন্দ করে না—এমনকী তার পিতা ডিওনকে পর্যন্ত এজন্য সে ঠিক শ্রদ্ধা করতে পারে না। কারণ দু-তিনটি ভারতীয় নর্তকীর বাড়িতে এই বৃদ্ধ বয়সেও তাঁর যাতায়াত। যাক সে-সব কথা। এদিকে হেলিওডোরাসের উচ্ছঙ্খলতা ও অত্যাচারে তক্ষশিলার অনেকেই অতিষ্ঠ। সে লম্পট নয়, কিন্তু সুরাপায়ী, উদ্ধত—লোকের মান রাখে না, দোকানের জিনিস ধারে নিয়ে গিয়ে দাম দেয় না—দু-তিনটি নরহত্যা পর্যন্ত করেছে সুরার ঝোঁকে।
কেন তা বলি।
মেলিবিয়া নামে একটি রূপসী গ্রিক গায়িকা আজ বছর দুই হল ব্যাকট্রিয়া ও গান্ধার হয়ে এখানে আসে উপার্জনের চেষ্টায়। গান্ধাররাজ জোজিফাসের সভায় খুব নাম কিনে এসেছিল। এখানে সে পদার্পণ করার দিনটি থেকে তক্ষশিলার অনেক যুবক ও প্রৌঢ়ের নজরে পড়ে গেল। প্রণয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতার হিড়িক শুরু হল। বহু গ্রিক যুবক, এমনকী বৃদ্ধের প্রণয় উপেক্ষা করে (এদের দলে হেলিওডোরাসও ছিল) সুন্দরী মেলিবিয়া প্রসন্নদৃষ্টিতে চাইল সুমঙ্গল বলে এক ভারতীয় বণিকের প্রতি, এমনি অদৃষ্টের ফের। প্রকাশ্য দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহবান করে হেলিওডোরাস সুমঙ্গলকে। মেলিবিয়া এতে বাধা দেয়—তারপর একদিন এক সরাইখানায় সামান্য ছলে ঝগড়া বাধিয়ে হেলিওডোরাস সুমঙ্গলকে হত্যা করে। খুব গোলমাল বাধে এ নিয়ে।
রাজদরবারে অভিযোগ উপস্থিত হল হেলিওডোরাসের বিরুদ্ধে। ভারতীয় বণিকসংঘ রাজাকে ধরলে এর সুবিচার করতেই হবে। তাদের কাছে টাকা ধার না-করলে রাজার চলে না, ফলে মহারাজ অ্যান্টি আলকিডাস তাঁর সভাসদ ডিওনকে ডেকে বলে দিলেন, কিছুদিনের জন্য হেলিওডোরাসকে সরিয়ে দেওয়া দরকার তক্ষশিলা থেকে। মালবের রাজা ভাগভদ্রের সভায় যে গ্রিকদূত ছিল, তার মৃত্যু হয়েছিল সম্প্রতি—সেখানেই আপাতত ওকে পাঠানো হোক। বলা হবে। রাজার বিচারে ওর নির্বাসন দণ্ড দেওয়া হল।
সুতরাং গত শীত ঋতুর প্রারম্ভে হেলিওডোরাস মালবের রাজা ভাগভদ্রের রাজসভায় প্রেরিত হয়।
তক্ষশিলায় পুনরায় আসার উদ্দেশ্য ছিল—মেলিবিয়ার সন্ধানে। কিন্তু হায়, সেই কেলেঙ্কারির পরে বেচারি গ্রিক গায়িকাকে এ রাজ্য ছাড়তে হয়েছে। মেলিবিয়া এখন পুরুষপুরের তালুকদার হিরাক্লিয়াসের অতিথি, অন্তত সেই রকম জনপ্রবাদ।
ডিওন বললে—হেলিওডোর, এখানে আবার এসে ঘুরঘুর করছো কেন? বুড়ো বয়সে কী চাকরিটা খোয়াব তোমার জন্যে?
–আজ্ঞে না, আমি এসেছিলাম শরীর সারাতে। ওখানে যে দিশি বদ্যি আছে, তাদের হাতের শেকড়-বাকড়ের ওষুধ খেলে হাতি মারা পড়ে, মানুষ কোন ছার! আর দেশটাতেও বড়ো বিষম জ্বরের
—বাবা, তুমি আমার নয়নের আনন্দ। কিন্তু জুপিটারের শপথ করে বলচি, আমার হাতে একটি পয়সা নেই যা তোমার জন্যে রেখে যেতে পারব। এ হতভাগা রাজ্যে কিছু উন্নতি নেই, এদের ঘুণে ধরেচে। ঋণের বোঝা রাজকোষকে ছাপিয়ে উঠেছে। নতুন দেশে যদি কিছু উপার্জন করতে পারো—আখেরে ভালো হবে।
শরতের অপূর্ব জ্যোৎস্নাময়ী রজনী। ডিওন তাঁর প্রণয়িনীর বাড়িতে আরও কয়েকটি বন্ধুবান্ধব নিয়ে আমোদ-প্রমোদ করতে গেলেন। তক্ষশিলার মধ্যেই এক সংকীর্ণ রাস্তার ধারে বাড়িটি। কার্নিশে পাথরের ছোটো ছোটো থামের মাঝে মাঝে ফোকরকাটা ইটের নীচু পাঁচিল।
একজন বললে—শুনেচ হে, কাঞ্চীনগরের তালুকদারের ছেলে অ্যারিস্টোস সম্প্রতি বৌদ্ধ হয়েছে!
অন্য বন্ধু বললে—তুমি যা শুনেচ ন্যানিফাস, সত্যি হওয়া আশ্চর্য নয়। রাজা মিনান্ডার গ্রিক কুলাঙ্গার, নইলে গ্রিক রক্ত যার গায়ে আছে, সে দেশি ধর্ম গ্রহণ করে কী হিসেবে? ওর শ্বশুরকে আমি জানি, ব্যাকট্রিয়ায় তাঁর অনেক তালুকমুলুক, ভালো বংশের ছেলে—অ্যান্টি গোনাস গোনাটাসের মাসতুতো ভাইয়ের শালার বংশ।
—কে?
—ওই রাজা মিনান্ডারের শ্বশুর। জামাইয়ের এই কুমতি শুনবার পরে বেচারি একেবারে শয্যাগ্রহণ করেচেন।
