বড়ো বড়ো স্প্রিংবিহীন কাঠ ও লোহার তৈরি এক্কার ধরনের গাড়িতে মাঝে মাঝে দু-চারজন ধনী বণিক ও গ্রিক জমিদারগণ যাতায়াত করছেন। সুন্দরী গ্রিক বালিকাও মাঝে মাঝে রথে চড়ে চলেছে—দেবী এথেনির মতো। ব্রোঞ্জের বিরাট জুপিটারমূর্তি প্রস্তরের ছত্রাবরণতলে শোভা পাচ্চে রাজপথের মোড়ে। বণিকগণের আপণশ্রেণীতে কত কি জিনিস—কত দেশ থেকে আহরণ করে আনা।
একটি সুবেশ বালক ভৃত্য একটি দোকানে এসে বল্লে—কলা আছে?
—আছে, দাম বেশি পড়বে।
—কোথাকার কলা?
—এই কাছের গাঁয়ের। বুড়ো রোজ টাটকা দিয়ে যায়।
—আর আঙুর?
—মদ তৈরি করবার জন্যে সামান্য কিছু এনেছিলাম,—নিয়ে যাও।
হঠাৎ রাজপথকে চমকিত করে তুর্য বেজে উঠল। মহারাজ অ্যান্টিআলকিডাসের মহামাত্য ডিওন ভ্রমণে বেরিয়েছেন—রাজপথ কাঁপিয়ে শ্বেতাশ্ববাহিত টাঙ্গায় রাজপুরুষ ডিওন চলে গেলেন—বালক ভৃত্যটি হাঁ করে চেয়ে রইল।
দোকানদার বল্লে—তোমার কর্তা কোথায় চল্লেন?
বালক তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বল্লে—কি জানি বাপু! সে খোঁজে আমার দরকার কি?
—ওঁর ছেলে কি এখনো সেই বিদেশে?
—তিনি কাল এসেছেন মালব থেকে। সেখান থেকে এসেই অসুখ বাধিয়েছেন বলেই ফল নিতে এসেচি এত সকালে। বলব কি–পয়সাকড়ির অবস্থা ভালো না। রাজা মাইনে দেন না ঠিকমতো—লুটেপুটে নিয়ে যা চলে।
দোকানদার অধীরভাবে বলে উঠল—যাও, যাও—আমার দোকানে ওসব— এক্ষুনি কে শুনবে! তোমার কি, বড়োলোকের চাকর—সুন্দর মুখের সব মাপ—
এই কথার মধ্যে কিঞ্চিৎ বক্রোক্তি ছিল। ভৃত্য সে উক্তি গায়ে না-মেখেই চলে গেল।
একটু পরে স্বয়ং ডিওনপুত্র হেলিওডোরাস এসে ফলের দোকানের সামনে দাঁড়াল। সুগঠিতদেহ সৌম্যকান্তি গ্রিক যুবক, রং অনেকটা আধুনিককালের পেশোয়ারি মুসলমানের মতো। দীর্ঘ দেহ, ঈষৎ কুঞ্চিত কেশ, চক্ষু দুটি নীল নয়— কটা। হেলিওডোরাস চাকা ছুড়বার প্রতিযোগিতায় দু-বার সকলকে পরাজিত করে মহারাজ অ্যান্টি আলকিডাসের প্রকাশ্য সভায় পুরস্কার পেয়েছেন। তক্ষশিলার অনেক লোকে তাঁকে চেনে। কপিলা থেকে আনীত বিদেশি সুরা খুব চড়া মূল্যে বিক্রি হয় তক্ষশিলার বাজারে। সাধারণ লোকের সাধ্য নেই তা কেনে—কিন্তু হেলিওডোরাস বন্ধুবান্ধব নিয়ে সরাইখানায় বসে ফুর্তি করবার সময়ে কপিলার সুরা ব্যতীত অন্য কিছু চায় না।
ফলের দোকানের মালিক সসম্ভমে অভিবাদন করে বল্লে—আসুন ছোটোকর্তা, আমার আজ বড়ো সৌভাগ্য—এত সকালে আপনার পায়ের ধুলো পড়ল এ গরীবের দোকানে।
হেলিওডোরাস ঈষৎ গর্বিত সুরে বল্লে–জুজু এখানে এসেছিল?
—হাঁ কর্তা, এইমাত্র চলে গেল।
—আঙুর দিয়ে তাকে?
কথার উত্তর দোকানির কাছ থেকে শুনবার আগেই হেলিওডোরাস চলে গেল। দোকানি অনেকক্ষণ একদৃষ্টে হেলিওডোরাসের অপস্রিয়মাণ সুন্দর চেহারার দিকে চেয়ে রইল।
ডিওনের আর্থিক অবস্থা আজকাল সত্যই ভালো নয়। রাজার দরবারে তিনি সভাসদ বটে, কিন্তু রাজা অ্যান্টি আলকিডাসের নিজেরই আর্থিক অবস্থা যা, তাতে সভাসদদের অর্থসাহায্য করবার অবস্থা নয় তাঁর। গান্ধারের রাজা জোজিফাস ও পুরুষপুরের গ্রিক তালুকদার হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে অনবরত যুদ্ধ লেগেই আছে— রাজকোষের যাবতীয় অর্থ এখন ওদিকেই ওড়ে। আপনি বাঁচলে বাপের নাম, সুতরাং ডিওন এবং অন্যান্য কর্মচারীগণ ঠিকমতো বেতন পান না, বাজারের বণিক ও প্রজাদের নিকট নানা ছলে অর্থশোষণ করেন। এঁদের মধ্যে ডিওন প্রধান সভাসদ, সুতরাং তাঁর অত্যাচারে তক্ষশিলার বিত্তশালী প্রজা ও বণিক মাত্রেই তাঁর ওপর যথেষ্ট বিরক্ত।
রাজা অ্যান্টি আলকিডাস ব্যাকট্রিয়ান গ্রিক—সুতরাং ভারতীয় প্রজা যত বেশি উৎপীড়িত হয়—গ্রিক ব্যবসায়ী বা প্রজা তার অর্ধেকও না। দু-বার ভারতীয় বণিকসংঘ প্রতিবাদ করেছিল সভাসদের এ অত্যাচারের বিরুদ্ধে। সভাসদ তাই কি, বিনা পয়সায় জিনিস দেওয়া হবে না—তিনি যিনিই হোন। ধার নিয়ে উপুড় হাত করবেন না সব! কীসের খাতির? এ ব্যবস্থা টেকেনি। গান্ধার থেকে সার্থবাহ বণিকসম্প্রদায় উষ্ট্রপৃষ্ঠে উৎকৃষ্ট সুরা ও বিদেশি ফল নিয়ে আসত—এরা তার উপর অতিরিক্ত শুল্ক বসালে, বাজারে অত চড়া দামে সে-সব খাবার লোক রইল না। দু-বার বাজারে দোকান লুঠ হল—এইসব নানা উপদ্রব। গ্রিক বণিকগণও যে এ অত্যাচার থেকে একেবারে মুক্ত তা নয়, তবুও তাদের প্রতি অত্যাচার এদের তুলনায় অত্যন্ত কম।
হেলিওডোরাসকে ঠিক এইজন্যে কোনো ভারতীয় প্রজা পছন্দ করত না। সে ছিল উদ্ধৃঙ্খল ও উদ্ধত—’গ্রিক ছাড়া অন্য কেউ মানুষ নয়’ এই তার মত। তার আদর্শ পুরুষ হল লিওনিডাস, যিনি থর্মপলির গিরিসংকটে অমর হয়ে আছেন, থেমেস্টোক্লিস যিনি টেম্পি গিরিবর্ক্স রক্ষা করেছিলেন দশ হাজার সৈন্যের অধিনায়ক হয়ে—দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার, যাঁর বাহুবলে আজ ভারতে গ্রিক রাজ্য সম্ভব হয়েছে।
ব্যাকট্রিয়ান গ্রিকদের জীবনযাত্রা ও আচারব্যবহার অনেক সময় তার চোখে ভালো লাগত না। একজন খাঁটি গ্রিক স্কুলমাস্টার তক্ষশিলার রাজসভায় দিনকতক এসেছিলেন, ছেলে পড়াতেন বড়লোকের বাড়ির, তাঁর নাম পলিফাইলস— রীতিমতো পণ্ডিত। তাঁকে নিয়ে সে-সময় কাড়াকাড়ি পড়ে গেল বড়োলোকদের মধ্যে, কে তাঁকে গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করতে পারে, কারণ এথেন্স থেকে তিনি এসেছিলেন। হেলিওডোরাস তখন বালক, তাকে তিনি বলতেন— তোমাকে দেখে। আমার প্রাচীন যুগের গ্রিক যুবকদের কথা মনে পড়ে। শরীরটা স্পার্টার ছেলেদের মতো শক্ত করো। এদেশে কিছু নেই, নামেই গ্রিক।
