—আরে শচীন যে! তুমি কোথায়? আমি এখানে আছি বছরখানেক, ওয়ার্কশপে কাজ করি।
—বেশ, বেশ। বাসা করে মেয়েছেলে নিয়ে আছ?
—না, দিদি মুঙ্গেরে রয়েছে কিনা, জামাইবাবুর শরীর খারাপ, চেঞ্জে এসেছে। সেখান থেকেই যাতায়াত করি। এসো না একদিন। বেলুন বাজারে, গঙ্গার কাছেই। কবে আসবে?
আমি থাকি সাহেবগঞ্জে। সর্বদা মুঙ্গেরের দিকে যাওয়া ঘটে না—তবু কানাই এর কাছে কথা দিলাম একদিন সুহাসিনী মাসিমার বাসায় যাব মুঙ্গেরে।…সেটা কর্তব্যও তো বটে, দেশের লোক অসুস্থ হয়ে রয়েছেন দূর দেশে—আমরা যখন এদেশ-প্রবাসী—যাওয়া বা দেখাশোনা করা তো উচিতই।
সাহেবগঞ্জে ফিরে এসে স্ত্রীকে কথাটা বলতে সেও খুব উৎসাহ দেখালে। বললে—চল না, মাসিমার সঙ্গে দেখা করে সীতাকুণ্ডে স্নান করে আসা যাবে। কখনও মুঙ্গেরে যাইনি—ভালোই হল, চল এই মকরসংক্রান্তির ছুটিতে
এ কথা ঠিকই যে, এই দীর্ঘ ছাব্বিশ বৎসর পরে সুহাসিনী মাসিমাকে দেখবার সে বাল্য-ও প্রথম-যৌবন-দিনের আগ্রহ ছিল না—তবুও কৌতূহলে এবং মনের পুরোনো অভ্যেসের বসে একদিন মুঙ্গেরে গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করবার সংকল্প করলুম। কিন্তু পুনরায় বাধা পড়ল। পৌঁষ মাসের শেষের দিকে সাহেবগঞ্জে ভীষণ কলেরার প্রাদুর্ভাব হল—আমি ছুটি নিয়ে সপরিবারে দেশে পালালুম। দিন উনিশ কুড়ি পরে যখন ফিরলুম তখন মকরসংক্রান্তি পার হয়ে গিয়েছে, মুঙ্গেরে যাওয়ার কথাও চাপা পড়ে গিয়েছে।
এর মাস-চার পরে আবার কানাই-এর সঙ্গে দেখা জামালপুরে।
বললে—ওহে, তোমরা কই গেলে না? তোমাকে খবর দেব ভেবেছিলুম—কী বিপদ গেল যে! জামাইবাবু মারা গেলেন ও মাসের সতেরোই।
সুহাসিনী মাসিমা বিধবা!
বললুম—ওঁরা এখনও কী—
—না না। দেওর এসে নিয়ে গেল শ্বশুরবাড়ি। মস্ত ডাক্তার দেওর— অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন, গভর্নমেন্ট সার্ভিস করে। জামাইবাবুর চেয়ে অনেক ছোটো।
এইবার চার-পাঁচ বছরের দীর্ঘ ব্যবধান—যখন সুহাসিনী মাসিমার কথা কারও কাছে শুনিনি। তারপর একদিন আমার মাসিমা কাশী থেকে এলেন। বাল্যকালের সে দিনটি থেকে কতকাল চলে গিয়েছে—যে মাসিমা তখন ছিলেন তরুণী, তিনি এখন কাশীবাসিনী। আমারও বয়স উনচল্লিশ।
মাসিমা বললেন—দশাশ্বমেধ ঘাটে রোজ সুহাসিনী দিদির সঙ্গে দেখা হত কিনা। চমৎকার মেয়ে সুহাসিনী দিদি, ওর সঙ্গে মিশে সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যেত। মস্ত বড়ো সাধুর কাছে দীক্ষা নিয়েছে। কী সুন্দর গীতার ব্যাখ্যা করে। ওর মুখে গীতাপাঠ শুনতে শুনতে রাত যে কত হচ্ছে তা ভুলেই যেতুম। আহা, কী মেয়ে সুহাসিনী দিদি!
বহুকাল পরে সুহাসিনী মাসিমার আবার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনলাম।
সুহাসিনী মাসিমা চিরকাল লোকের প্রশংসা কুড়িয়ে গেল—কপাল এক একজনের। আমার ঠোঁটের আগায় এ প্রশ্ন কতবার এল—সুহাসিনী মাসিমা আজকাল দেখতে কেমন?…বহুকাল তাঁর রূপের প্রশংসা কারও মুখে শুনিনি।
কিন্তু আমার মনের সেই বাল্যকালে গড়া মানসী রূপসী সমানই ছিলেন। বাল্যে তিনি ছিলেন শুধু রূপবতী, এখন রূপের সঙ্গে যোগ হল আধ্যাত্মিকতা। সুহাসিনী মাসিমা একেবারে দেবী হয়ে উঠলেন আমার মনে। আর এটাও মনে রাখতে হবে, দেবীদের মধ্যে সবাই তরুণী—বৃদ্ধা দেবী কেউ নেই।
পরের বছরই আমার চাকরির কাজে আমায় কাশী যেতে হল তিন-চার দিনের জন্যে। আমার বয়স চল্লিশ। মাসিমা যে বাড়িটাতে থাকতেন, সেখানে মামারবাড়ির গ্রামের আর একজন বৃদ্ধা থাকতেন। তাঁর নাম তারকের মা—তিনি জাতে কৈবর্ত, তাঁর ছেলে তারকের নৈহাটিতে বড়ো দোকান আছে। আমার ওপর ভার পড়ল, তারকের মায়ের কাছ থেকে মাসিমার একটা হাত-বাক্স নিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া।
বেলা দশটা। মন্দিরাদি দর্শন করার পরে দশাশ্বমেধ ঘাটে স্নান করতে নামছি, সঙ্গে আছে তারকের মা।
তারকের মা স্নানার্থীদের ভিড়ের মধ্যে কাকে সম্বোধন করে বললে— দিদিঠাকরুনের আজ যে সকাল সকাল হয়ে গেল?—যাকে উদ্দেশ্য করে বলা হল তিনি কী উত্তর দিলেন আমি ভালো করে শোনার আগেই তারকের মা আমার দিকে চেয়ে বললে—চিনতে পারলে না শচীন? আমাদের গাঁয়ের কানাই-এর দিদি সুহাসিনী—চেনো না?
বোধ হয় একটু অন্যমনস্ক ছিলাম, কথাটা কানে যেতেই চমকে উঠে দেখি একজন মুণ্ডিতমস্তক, স্থূলকায় বৃদ্ধা, এক ঘটি জল হাতে সিক্ত-বসনে উঠে চলে যাচ্ছেন। ফর্সা রং জ্বলে গেলে যেমন হয় গায়ের রং তেমনই, মুখের চামড়া কুঁচকে গিয়েছে—নিতান্ত নির্বোধ নিরীহ পাড়াগাঁয়ের বুড়িদের মতো মুখের চোখের ভাব।
সেই সুহাসিনী মাসিমা!
আমি কী আশা করেছিলুম এই সুদীর্ঘ ত্রিশ বছর পরেও সুহাসিনী মাসিমাকে রূপসী যুবতি দেখতে পাব? তবে কেন যে ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গেলুম, কেন যে মন হঠাৎ ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল—কে জানে।
বড়ো ক্লান্ত বোধ করলুম—ভীষণ ক্লান্ত ও নিরুৎসাহ। ভাবলুম কাশীর কাজ তো মিটে গিয়েছে, মাসিমার বাক্সটা নিয়ে ওবেলার ট্রেনেই চলে যাব। থেকে মিছিমিছি সময় নষ্ট।
স্বপ্ন-বাসুদেব
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের কথা। আজ থেকে প্রায় বাইশশো বছর আগের তক্ষশিলা।
নগরীর রাজপথ কোলাহলমুখর! নবারুণোদয় নিজ মহিমায় ধীরে ধীরে উচ্চ চূড়ায় ও স্তম্ভে নবপ্রভাতের বাণী ঘোষণা করচে। তক্ষশিলায় সম্প্রতি দেবী মিনার্ভার এক মন্দির তৈরি হচ্ছে, পার্থেননের স্থাপত্যের অনুকরণে—গম্বুজ বা ডোম কোথাও নেই—ছাদ সমতল, অগণিত সুসমঞ্জস বিরাট স্তম্ভশ্রেণী। গ্রিক স্থাপত্য গম্বুজের খিলান গড়তে অভ্যস্ত ছিল না। বহু পরবর্তী কালে সারাসেন সভ্যতার যুগে ইউরোপে এর উৎপত্তি, সারাসেন তথা মুর সভ্যতার দান এটি।
