—একদিন কী হল জানো, দুপুরবেলা সুহাসের ফিট হয়েছে শুনে তো ছুটে গিয়ে দেখি রান্নাঘরের সামনে সানের রোয়াকে সুহাস অজ্ঞান হয়ে পড়ে রয়েছে— আর তার মাথায় জল ঢালা হচ্ছে। মাথায় একরাশ কালো কুচকুচে ভিজে চুল, দেহ এলিয়ে পড়ে আছে। অমন রূপ কখনও দেখিনি মানুষের, কী রূপ ফুটেছে সুহাসের—সত্যি—
সুহাস মাসিমার রূপের ও গুণের প্রশংসায় এই গ্রামের সবাই পঞ্চমুখ। তারা জীবনে যেন এমন মেয়ে আর দেখেনি। ওদের মুখে মুখে সুহাসিনী মাসিমাও আমার মনে অত্যন্ত বেড়েই চললেন—কল্পনায়, চোখের দেখায় নয়।
অল্পবয়সে যখন মনের আকাশ একেবারে শূন্য, তখন লোকের মুখে শুনে শুনে ধীরে ধীরে একটি আদর্শ নারীমূর্তি আমার মনে গড়ে উঠেছিল—বহুকাল পর্যন্ত এই মানসী নারীপ্রতিমার কষ্টিপাথরে বাস্তবজীবনে দৃষ্ট সমস্ত নারীর রূপ ও গুণ যাচাই করে নিতাম, অনেকটা নিজের অজ্ঞাতসারেই বোধ হয়। সে মানসী প্রতিমা ও আদর্শ নারী ছিলেন সুহাসিনী মাসিমা—যাঁকে কখনও চোখে দেখলুম না।
তখন কলেজে পড়ি। কী একটা ছুটিতে মামারবাড়ি গিয়েছি। তখন অনেকটা গম্ভীর হয়ে পড়েছি আগেকার চেয়ে এবং রান্নাঘরের কোণে বসে দিদিমা ও মাসিমাদের মুখে মেয়েলি গল্প শোনার চেয়ে চণ্ডীমণ্ডপে মেজো দাদু ও মামাদের সঙ্গে জার্মান যুদ্ধের আলোচনা ও সে সম্বন্ধে নিজের সদ্য অধীত লজ-এর মডার্ন ইউরোপের ঐতিহাসিক জ্ঞান সগর্বে প্রদর্শন করবার ঝোঁক তখন অনেক বেশি। সকালবেলা, আমি সমবেত দু-পাঁচজন লোকের সামনে বিসমার্কের রাজনীতি ও জীবনী (লজ-এর ‘মডার্ন ইউরোপ’ অনুযায়ী) সোৎসাহে বর্ণনা করছি, এমন সময়ে ও-পাড়ার কানাইমামা (সুহাসিনী মাসিমার ছোটো ভাই) এসে সেখানে দাঁড়াল।
মেজো দাদু জিজ্ঞেস করলেন—কী কানাই, কবে এলে কলকাতা থেকে?
কানাই বলল—আজই এলুম কাকাবাবু। দিদি আজ ওবেলার ট্রেনে আসবে কিনা। দাদাবাবু পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে আসবেন, তাই আমি সকালের গাড়ি তে চলে এলুম স্টেশনে গাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করতে।
শুনে মনে কেমন একটা আনন্দ ও উত্তেজনা অনুভব করলুম। সুহাসিনী মাসিমা আসবেন আজই, দেখব—এতকাল পরে সুহাসিনী মাসিমার সঙ্গে চাক্ষুষ দেখা হবে। আমার মনের সেই মানসী প্রতিমা সুহাসিনী মাসিমা! তারপর আবার নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেলুম নিজের মনের ভাবে। আসেন আসুন, না-আসেন না-আসুন— আমার কী তাতে?
অথচ সন্ধ্যাবেলার দিকে কাঁটালতলাটায় পায়চারি করছিলুম, বোধ হয় কিছু উৎসুক ভাবেই। এই পথ দিয়েই সুহাসিনী মাসিমার গোরুরগাড়ি স্টেশন থেকে আসবে। এই একমাত্র পথ।
সন্ধ্যার কিছু আগে গোরুরগাড়ি স্টেশন থেকে ফিরে এল—কানাই মামার ছোটো ভাই বীরু তাতে বসে।
জিজ্ঞেস করলুম—কোথায় গিয়েছিলিরে বীরু? গাড়ি গিয়েছিল কোথায়? বীরু বললে—স্টেশনে। বড়ো দিদির আসবার কথা ছিল, এল না। বললুম—রাত্রের ট্রেনে আসতে পারেন তো—
—না, তা আসবেন না। অন্ধকার রাত, মেঠো পথ দিয়ে আসা—রাত্রের গাড়িতে কখনও আসবে না। কথাই আছে।
গাড়ি চলে গেল।
জীবনের গত দশ বছরের মধ্যে—তখন আমার বয়স ছিল নয়, এখন উনিশ— এই প্রথমবার সুহাসিনী মাসিকে দেখবার সুযোগ ঘটবার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু উপক্রম হয়েই থেমে গেল, ঘটল না।
সেদিন কেন, তার পর প্রায় এক মাস সেখানে ছিলাম—সুহাসিনী মাসিমা তার। মধ্যেও আসেননি।
কলেজ থেকে বার হয়ে ক্রমে চাকরিতে ঢুকে পড়লুম। বয়স হয়েচে চব্বিশ, ষোলো বছর কেটে গিয়েছে বাল্যের সেই মামারবাড়ির দিনগুলি থেকে। দিদিমা বেঁচে নেই, মামারবাড়ি যাওয়া আগের চেয়ে অনেক কমে গিয়েছে, সুহাসিনী মাসিমার কথা শুনতে পাই কেবল আমার আপন মাসিমাদের মুখে। তাও তত বেশি করে নয় বা তত ঘন ঘন নয়, বাল্যকালে যেমন দিদিমার মুখ থেকে শুনতুম।
কিন্তু তা বলে সুহাসিনী মাসিমা কী আমার মনে ছোটো হয়ে গিয়েছিলেন?
আশ্চর্যের বিষয়, তা মোটেই নয়।
বাল্যের সে মানসী প্রতিমা যেমন তেমনই ছিল, তার রূপের কোথাও একটুকু ম্লান হয়নি। বন্ধুবান্ধবের বিয়েতে নিমন্ত্রিত হয়ে গিয়ে কত নববধূকে সেই মানসী প্রতিমার কষ্টিপাথরে যাচাই করতে গিয়ে তাদের প্রতি অবিচার করেছি।
বয়স যখন ত্রিশ-বত্রিশ, তখন কলকাতায় এসে থাকতে হল কার্য উপলক্ষ্যে। একদিন আমার মামার মুখে কথায় কথায় শুনলাম—সুহাসিনী মাসিমার স্বামী এখন বড়ো ইঞ্জিনিয়ার, অনেক টাকা রোজগার করেন, বাগবাজারে নবীন বোসের লেনে সম্প্রতি বাসা করে আছেন। এমনকী মামা বললেন—যাবি একদিন? সুহাস দিদির সঙ্গে আমারও অনেকদিন দেখা হয়নি। তুই কখনও দেখেছিস কী? চল কাল যাওয়া যাক, ঠিকানাটা আমার ডায়েরিতে লেখা আছে।
পরদিন আমার কী একটা গুরুতর কাজ ছিল, তাতেই যাওয়া হল না। মামাও আর সে সম্বন্ধে কোনো কথা উত্থাপন করলেন না। আমি ইচ্ছে করলে একাই যেতে পারতাম—মামা ঠিকানাটা আমায় বলেছিলেন তার পর, কিন্তু তারা আমায় কেউ চেনে না, এ অবস্থায় যেচে সেখানে যেতে বাধত।
আরও বছর দুই-তিন কেটে গেল। আমার বয়স চৌত্রিশ। সংসারী মানুষ, ছেলেপুলে হয়ে পড়েছে অনেকগুলি। পশ্চিমের কর্মস্থান থেকে দেশে ঘন ঘন আসা ঘটে না। এ সময় একবার মামারবাড়ির গ্রামের কানাই মামার সঙ্গে জামালপুর স্টেশনে দেখা। কানাই আমার বাল্যবন্ধু এবং সুহাসিনী মাসিমার ছোটো ভাই।
—কী হে, কানাই মামা যে! এখানে কোথায়?
