—বেশ, তা এখন যাও। বয়েসের হিসেব কসতি কে বলচে তোমারে?
—হ্যাঁরে, সিঁদুরচরণ তোরে ফেলে এমনিই পালাল, না পয়সাকড়ি কিছু দিয়ে গিয়েচে? চলা-চলতির একটা ব্যবস্থা চাই তো?
—সেজন্যি তোমার দোরে গিয়ে কেঁদে পড়েলাম মুই, জিজ্ঞেস করি? ছিচরণ বেগতিক দেখে আস্তে আস্তে চলে গেল। কাতু কাঁদতে বসল। তার বয়েস হয়েছে এ কথা সত্যি, প্রায় পঁয়তাল্লিশের কাছাকাছি, কী তার চেয়েও বেশি। ঘরসংসার বলে জিনিসের মুখ এই ক-বছর দেখেছে, সিঁদুরচরণের কাছে থেকে। আবার কোথায় যাবে এই বয়সে? একটা পেট চলে যাবে, ভিক্ষে করা কেউ কেড়ে নেবে না। দু-দিনের গেরস্থালি ভেঙে যদি যায়—আর কোথাও গেরস্থালি বাঁধবে না, সব ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়বে।
শিবির মা এসে দোরে দাঁড়াল। কাতু জানে, ও কেন আসে। আসে একটা নিয়ে অবিশ্যি। বললে—একটু হলুদবাটা দেবা?
–নিয়ে যাও।
—দু-সের হলুদ এনেছিলাম ছিচরণ সর্দারের বাড়ি থেকে। তা ফুরিয়ে গিয়েছে। ওর ঘরে কোনো জিনিসের অভাব নেই। হলুদ বলো, ঝাল বলো, পেঁজ বলো, সরষে বলো—সব মজুদ। গুড় আমাদের দেয় বছরে একখানা করে। ওর ঘরে চার-পাঁচ মণ গুড় হয় ফি-বছর।
কাতু বললে—তা এখন হলুদ-বাটনা নেবা?
শিবির মা বললে—হলুদ-বাটনা দেও একটু। মাছ রাঁধব।
—তবে নিয়ে যাও।
—তোমার শরিল খারাপ হলি দেখাশোনা করে কে তাই ভাবছি।
—সে ভাবনা তোমায় ভাবতি কেডা গলা ধরে সেধেচে শুনি? গা-জ্বালা কথা শুনলি হয়ে আসে! ঠিক সেইসময় উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কে ডাক দিলেও কাতু!
কাতু চমকে উঠেই পরক্ষণে দাওয়া থেকে ছুটে নেমে এসে বললে—তুমি! ওমা, আমি কনে যাব!
শিবির মা অন্য দিক দিয়ে পালানোর পথ খুঁজে পায় না শেষে।
এই হল সিঁদুরচরণের বিখ্যাত ভ্রমণের ইতিহাস। এর পর থেকে মালিপোতা গ্রামের মধ্যে বিখ্যাত ভ্রমণকারী বলে সে গণ্য হয়ে রইল। দশবার ধরে এ গল্প করেও তার ভ্রমণকাহিনি আর ফুরোয় না। লোকে আঙুল দিয়ে তাকে দেখিয়ে বলে–ওই লোকটা বাহাদুরপুর গিয়েল! জোয়ান বয়েসে ও বড্ড বেড়িয়েছে দেশ বিদেশে!
অবিশ্যি সিঁদুরচরণকে দেখতে নিতান্ত সাধারণ লোকের মতোই। তার মধ্যে যে অত বড়ো গুণ লুকিয়ে আছে তা তাকে দেখে বোঝবার উপায় ছিল না। মানুষের কীর্তিই মানুষকে অমর করে।
সিঁদুরচরণের খ্যাতি আমার কানেও গিয়েছিল। ঝুমরির বাগানের মধ্যে দিয়ে সিঁদুরচরণ হাট থেকে সেদিন ফিরছে, আমি বল্লাম—সিঁদুরচরণ নাকি বাহাদুরপুর গিয়েছিলে?
সিঁদুরচরণ বিনম্র হাস্যের সঙ্গে বললে—তা গিয়েলাম বাবু। অনেকদিন আগে।
-বটে! আচ্ছা, সে কতদূর?
—আপনি কেষ্টলগর চেনো?
—না-চিনলেও নাম শোনা আছে!
—কোন দিক জানো?
—তা কী করে জানব, আমি কী সেখানে গিয়েছি?
বাহাদুরপুর কেষ্টলগরের দু-ইস্টিশনের পরে।
কথা শেষ করেই সিঁদুরচরণ আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল, বোধ হয় এই দেখবার জন্য যে, তার কথা শুনে আমার মুখের চেহারা কীরকম হয়।
সুহাসিনী মাসিমা
সুহাসিনী মাসিমাকে আমি দেখিনি। কিন্তু খুব ছোটো বয়সে যখনই মামারবাড়ি যেতুম, তখন সকলের মুখে মুখে থাকত সুহাসিনী মাসিমার নাম।
—সুহাস কী চমৎকার বোনে! এই বয়েসে কী সুন্দর বুনুনির হাত!
—সুহাসিনী বললে, এসো দিদি বসো। বেশ মেয়ে সুহাসিনী।
—সেবার সুহাসিনীকে নেমন্তন্ন করে খাওয়ালুম পূর্ণিমার দিন।
—সুহাসিনী ওসব অন্যায্য দেখতে পারে না, তাই জন্যে তো মায়ের সঙ্গে বনে না।
সুহাসিনী গ্রামের সকলের যেন চোখের মণি। সুহাসিনী মাসিমা সম্বন্ধে কথা বলবার সময় সবারই অর্থাৎ আমার বুড়ি দিদিমার, গনু দিদিমার, মাসিমাদের, মায়ের, মামাদের গলার সুর বদলে যেত, চোখে কীরকম একটা আলাদা ভাব দেখা যেত। আর একটা কথা, রূপের কথা উঠলে সকলেই বলত আগে সুহাসিনী মাসিমার কথা, অমন রূপ কারও হয় না, কেউ কখনও দেখেনি।
শুনে শুনে আমার মনে অত্যন্ত কৌতূহল হল যে, সুহাসিনী মাসিমাকে একবার দেখব। দেখতেই হবে।
দিদিমাকে একদিন বললুম, সুহাসিনী মাসিমা এখানে কোথায় থাকেন?
—কেন রে?
—আমি একদিন দেখতে যাব।
—সে তোর ওই কানাই মামার বোন ওপাড়ার। মুখুজ্যেদের দোতলা বাড়ি পুকুরধারে দেখিসনি? তা সুহাস তো এখন এখানে নেই। শ্বশুরবাড়ি গিয়েছে।
—বিয়ে হয়ে গিয়েছে বুঝি?
–তা হবে না? উনিশ-কুড়ি বছর বয়েস হল, বিয়ে কোন কালে হয়েছে! সুহাসিনী মাসিমার বিয়ে হওয়ার কথাটা যেন খুব ভালো লাগল না। কেন ভালো লাগল না তা কী করে বলব? আমার বয়স ন-বছর আর সুহাসিনী মাসিমার বয়স উনিশ-কুড়ি; বিয়ে হলেই বা আমার কি, না-হলেই বা আমার কী।
মামারবাড়িতে প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের ছুটিতে যাই, কিন্তু কোনও বার সুহাসিনী মাসিমার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। হয় তিনি বৈশাখের মাঝামাঝি চলে গিয়েছেন, নয়তো তিনি আসবেন শ্রাবণ মাসে শ্বশুরবাড়ি থেকে।
—ফাল্গুন মাসে এসেছিল সুহাস, বোশেখ মাসে চলে গেল। আজকাল থাকে ভালো জায়গায়। যেমন রং তেমনিই রূপ, যেন একেবারে ফেটে পড়ছে।
অন্য লোকের প্রশ্নের উত্তরে দিদিমা কিংবা আমার মাসিমারা এ ধরনের কথা বলতেন, শুনতে পেতাম। আমি কোনও প্রশ্ন এ সম্বন্ধে বড়ো একটা করতুম না, অথচ ইচ্ছে হত সুহাস মাসিমার সম্বন্ধে আরও অনেক কিছু জানবার, আরও অনেক কথা শোনবার। কিন্তু কেমন যেন লজ্জায় গলায় কথা আটকে যেত, জিগ্যেস করতে পারতুম না।
-না, তা কী করে থাকবে, সুহাসিনী না-হলে শ্বশুরবাড়ির একদিন চলে না— কাজেই চলে যেতেই হল, নইলে জষ্টি মাসে আম-কাঁটাল খেয়ে যাবার তো ইচ্ছে ছিল। শাশুড়ি বলে-বউমা এখানে না-থাকলে যেন হাত-পা আসে না—বউমার মুখ সকালে উঠে না-দেখলে কাজে মন বসাতে পারিনে।—তাই ছেলে পাঠিয়ে নিয়ে গেল।
