—মরতি যাব কেন বিদেশে পড়ে? মোদের গাঁয়ে চাকরির অভাবড়া কী?
খেয়েদেয়ে হাতে দু-পয়সা জমেছে যখন, তখন পরের চাকরি করতে যাবার দরকার নেই। রোজ রোজ মজুরি চলে। আজকাল একদিনও সে বসে থাকে না। ভালো একখানা রঙিন গামছা কিনে ফেললে তেরো পয়সা দিয়ে বাহাদুরপুরের হাটে একদিন।
রঙিন গামছাখানাই হল কাল—এখানা কিনে পর্যন্ত তার কেবলই মনে হতে লাগল কাতু যদি তাকে এ গামছা-কাঁধে না-দেখল তবে আর গামছা কেনার ফলটা কী? সবুজ গামছাখানা তো সেদিন কিনেছিল সে কাতুর জন্যে।
একদিন কাজকর্ম সেরে বিকেলে সে মাঠের দিকে বেড়াতে গিয়েছে। একটা বড়ো ঘোড়া-নিমগাছ ছায়া ফেলেচে অনেকখানি ফাঁকা মাঠে। সেখানে বসে চুপি চুপি কোমর থেকে গেঁজে খুলে পয়সাকড়ি উপুড় করে সামনে ঢেলে গুনে দেখলে, উনিশ টাকা তেরো আনা জমেচে মজুরি করে।
সামনে একটা খালে তেরো-চোদ্দো বছরের সুন্দরী মেয়ে শামুকগুগলি তুলচে। ও বললে—কী তোলচ, ও খুকি?
মেয়েটা বিস্ময়ের সুরে বললে—কী?
—তোলচ কী?
—গুগলি।
—কী হবে?
মেয়েটি সলজ্জহাস্যে বললে—খাব।
—কী জাত তোমরা?
—বাউরি!
—বাড়ি কনে?
মেয়েটি আবার ওর দিকে যেন খানিকটা আশ্চর্য হয়ে চেয়ে আছে—তারপর আঙুল দিয়ে দূরের দিকে দেখিয়ে বললেন–টবরপুর।
আর কোনো কথা হয় না। মেয়েটা আপনমনে গুগলি তুলতে থাকে। সিঁদুরচরণ বড় অন্যমনস্ক হয়ে যায়। কাতুর কথা বড়ো মনে হয়, আর থাকা যায় না। এ কোন মুলুক, কতদূর, বিদেশবিভূঁই, সেখানে বাউরি বলে জাত বাস করে। কেউ বাপ-পিতেমোর জন্মে শুনেচে বাউরি বলে কোনো জাতের কথা, যারা খালে বিলে গুগলি তুলে খায়?
ওর মনটা হু-হু করে ওঠে নতুন করে। বুকের মধ্যে কী যেন একটা মোচড় খায়। যদি এই বিদেশে মারা যায়?
কাতুর সঙ্গে তাহলে দেখাই হবে না।
কাতু সজনেতলায় গোরু বেঁধে বিচুলি কেটে দিচ্চে, সন্দের পিদিম ঘরে ঘরে সবে জ্বালা শুরু হয়েছে, এমন সময় রাস্তা কাঁপিয়ে রব উঠল—বলো হরি হরিবোল! ব্যাপারটা নতুন নয়—এই পথ দিয়েই দূর দেশের সমস্ত মড়া পোড়াতে নিয়ে যায় কালীগঞ্জের বা চাঁদুড়ের গঙ্গাতীরে।
কাতুদের পাড়ার কে একজন জিজ্ঞেস করলে—কনেকার মড়া?
–সনেকপুর।
—কী জাত হ্যাঁগা?
—সনেকপুরে বিপিন ঘোষের নাম শুনেচ? তেনার ছেলে। কাতু বিপিন ঘোষের নাম শোনেনি, কিন্তু বড়ো কষ্ট হল শুনে। কারো জোয়ান ছেলে মারা গেল—বাপ মায়ের কী কষ্ট! এ লোক যে কোথায় গেল আজ মাসখানেকের ওপর হবে তা কেউ জানে না। খবর-পত্তর কিছুই নেই। শিবির মা গাই দুইতে এসে দেখলে ও চালাঘরের ভেঁচতলায় সে কাঁদছে। শিবির মা অবাক হয়ে বললে—কানচিস কেন রে?
—মনটা বড্ড কেমন করছে।
—দূর! বাছুরটা ধর, ইদিক আয় দিনি!
—একটা মড়া নিয়ে গেল দেখলি? বিপিন ঘোষের ছেলে!
—নিয়ে গেল তা তোর কী? মর মাগি! বাছুর ধর, এখুনি পিইয়ে যাবে! শিবির মা পাড়ায় গিয়ে রটিয়ে দিলে সিঁদুরচরণ কাতুকে ফেলে পালিয়েছে। আর আসবে না, এতদিনে বোঝা গেল। অনেকে সহানুভূতি দেখালে। কেউ কেউ বললে—বিয়ে করা সোয়ামি নয় তো! গিয়েছে তা কী হবে। গোরুটা রয়েছে, অমন ভালো বকনা বাছুরটা হয়েছে, ওরই রইল।
আরও দিন-পনেরো কাটল…
কাতুর চোখের জল শুকোয় না। রোজ সন্ধেবেলা মন হু-হু করে। এমন বকনাবাছুর হল গোরটার, বার দোয়া শেষ করে আজ সেই গোরু দেড় সের দুধ দিচ্চে দু-বেলায়ও এসে দেখুক। নইলে ঘরে আগুন ধরিয়ে সে চলে যাবে একদিকে, যেদিকে দু-চোখ যায়।
পাড়ার ছিচরণ সর্দার আজকাল ও বাড়ি বড়ো যাতায়াত শুরু করেছে। ঠিক যে সময়টিতে কেউ থাকে না, ভর-সন্ধেবেলাটি, বাঁশবনে রোদ মিলিয়ে গিয়েছে— ছিচরণ এসে বলবে—ও কাতু!
—কী?
—ঘরে আছিস?
—কেনে?
—একটু তামুক খাওয়া।
—তামুক নেই গো।
—পান সাজ একটা।
—পান কনে পাব? মানুষ ঘরে না-থাকলি ও-সব থাকে? তুমি এখন যাও।
ছিচরণ সর্দার দমবার পাত্র নয়। তার স্ত্রী-বিয়োগ হয়েছে আজ দু-বছর। অবস্থা ভালো, এক আউড়ি ধান ঘরে তুলেচে গত ভাদ্র মাসে। এবার চড়া পাটের বাজারে ত্রিশ মণ পাট বিক্রি করেছে। লোকে খাতির করে চলে ওকে। শিবির মা রোজ গাই দুইতে এসে ছিচরণের ঐশ্বর্যের ফিরিস্তি কাতুকে শুনিয়ে যায় অকারণে। ছিচরণ নিজে দু-একদিন অন্তর আসেঃ; বসতে না-বললেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই গল্প জমাবার চেষ্টা করে। কাতুর ভালো লাগে না, এসব। আর কিছুদিন সে দেখবে—তারপর গোরু-বাছুর বিক্রি করে দিয়ে সে বেরিয়ে পড়বে একদিকে।
সেদিন ছিচরণ আবার এসে হাজির। ডাক দিলেও কাতু!
—কী?
–বাবাঃ, তা একটু ভালো করে কথা বললি কী তোর জাত যাবে?
—তুমি রোজ রোজ ভর-সন্দেবেলা এখানে আসো কেন?
—তার দোষটা কী?
—না, তুমি এসো না। লোকে কী মনে করবে।
—একটা কথা বলি তোর কাছে। আমার সংসারডা তো গিয়েছে তুই জানিস। একা থাকতি বড্ড কষ্ট হয়।
—তা কী করব আমি?
ছিচরণের আর বেশি কথা বলতে সাহস হল না, আমতা আমতা করে বললে–না, না—তাই বলছি।
কাতু বললে—এখন তুমি এসো গিয়ে।
ছিচরণ তবুও যায় না। বলে—ওরে দাঁড়া। যাব, যাব, থাকতি আসিনি। এই দু বিশ ধান কর্জ দেলাম পাঁচরে। বলি হয়েছে দেড় পৌঁটি ধান, তা লোকের উপকারে লাগে তো লাগুক। ধান ঝেড়ে দিয়ে-থুয়ে এই আসছি। বড্ড কষ্ট হয়েছে আজ। কাতু ঝাঁঝালো সুরে বললে—কষ্ট জুড়োবার আর কী জায়গা নেই গাঁয়ে?
–তোর সঙ্গে দুটো কথা বললি আমার মনডা জুড়োয়, সত্যি বলচি কাতু। তোরে দেখে আসচি ছেলেবেলা থেকে। আমি যখন গোরু চরাই তখন তুই এতটুকু। তোর বয়েস আমার চেয়ে সাত-আট বছরের কম।
