—আপনি কতদূর যাবা?
—বেড়াতে বেরিইচি, যতদূর যাওয়া যায় ততদূর যাব।
ওদের মধ্যে একজন বললে—তবুও কদ্দূর যাওয়া হবে? আমার সঙ্গে বাহাদুরপুর চলো, আমি সেখানে যাব।
—সে কনে?
—কেষ্টলগর ছাড়িয়ে।
–তবে পয়সা নিয়ে মোর টিকিটখানা তোমার সঙ্গে করে নিয়ে এসো ভাই।
—দেও টাকা।
—কত নাগবে?
—এগারো আনা।
আধঘণ্টা পরে লোকটা টিকিট কেটে এনে তার হাতে দিল। সিঁদুরচরণ পুঁটুলির মধ্যে থেকে কাতুর দেওয়া ধুপি-পিঠে খেতে লাগল এবং তার সঙ্গীকে দিলে। ধুপি-পিঠে আর কিছুই নয়, শুধু চালের গুঁড়োর পিঠে, জলে সিদ্ধ। গুড় দিয়ে ভিন্ন সে কঠিন হঁটের মতো জিনিস গলা দিয়ে নামে না—কিন্তু গুড় সে সঙ্গে করে আনেনি কাপড়চোপড়ে লেগে যাবে বলে। ওর সঙ্গী বললে—একটু রসগোল্লার রস কিনে আনব? এ বড্ড শক্ত।
—হ্যাঁগা উত্তরের গাড়ি কখন আসবে?
—এই এল। তামুক খেয়ে ল্যাও তাড়াতাড়ি। একটু পরে আরাম করে বসে ওরা তামাক খেতে লাগলে। সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে উত্তরের অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের ট্রেন এসে হাজির। চা, পান, পাঁউরুটির ফিরিওয়ালাদের চিৎকারে প্ল্যাটফর্ম মুখরিত হয়ে উঠল। যাত্রীরা ইতস্তত ছুটাছুটি করতে লাগল গাড়িতে ওঠবার চেষ্টায়। হতভম্ব ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় সিঁদুরচরণের হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে তার নতুন সঙ্গী তাকে একটা কামরায় ওঠালে।
গাড়ী রানাঘাট ছেড়ে দিলে। সিঁদুরচরণ এক কল্কে তামাক সেজে হাঁপ ছেড়ে বললে—বাবাঃ-এর নাম গাড়ি চড়া? কী কাণ্ড।
সিঁদুরচরণের মনে হল কাতুকে কতদূরে ফেলে সে অজানা বিদেশ-বিভুইয়ের দিকে চলেচে। না-এলেই যেন ছিল ভালো! কে জানে বাড়ির বার হলেই এসব হাঙ্গামা ঘটবে? বিদেশের লোক কীরকম তারই বা ঠিক কী? তার টাকা ক-টা কেড়ে নিতেও পারে!
তার সঙ্গী তাকে বলে বলে দিচ্চে—এই উলো, এই বাদকুল্লো, এই কেষ্টলগর।
—কেষ্টলগর? কই দেখি দিকি! নাম শোনা আছে বহুৎ দিন যে!
সিঁদুরচরণ বিশেষ কিছুই দেখতে পেলে না। গোটাকতক টিনের গুদোম, খানকতক ঘোড়ার গাড়ি, দু-চারটি কোঠাবাড়ি। তাই দেখেই সে মহা খুশি। মস্ত জায়গা কেষ্টনগর। দেশে ফিরে গল্প করার মতো কিছু পাওয়া গেল বটে। কাতুকে নানা ছাঁদে গল্প শোনাতে হবে বাড়ি ফিরে।
আরও একটা স্টেশন গেল। পরের স্টেশনেই বোধ হয়—তার সঙ্গী বললে— নামো, নামো, বাহাদুরপুর।
সিঁদুরচরণ বোঁচকা নিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে পড়ল।
তখন সন্ধ্যা হয়-হয়ঃ; সে চেয়ে দেখে—ধু-ধু মাঠের মধ্যে ছোট্ট স্টেশন—চারিধারে কূলকিনারা নেই এমন বড়ো মাঠ। দূরে দূরে দু-চারটে তালগাছ, বাঁশবন। সিঁদুরচরণের বুকের মধ্যটা হু-হু করে উঠল।
কোথায় কাতু, কোথায় তাদের মালিপোতা। সব ফেলে সে আজ এ কোথায় কতদূরে এসে পড়েছে!
মনে মনে বললে—এ্যানধারা বিদেশেও মানুষ আসে! ভগবান, এ তুমি কোথায় নিয়ে ফেললে মোরে।
ওর সঙ্গী বললে—চলো।
—ও বলে—কনে যাব?
—মোদের গাঁয়ে চলো। এখেন থেকে দু-কোশ পথ।
—সেখানে যাব?
—যাবা না তো এখানে থাকবা কোথায়? খেতে-দেতে হবে তো?
—কী নাম তোমাদের গাঁর?
—গোয়ালবাথান। নাগরপাড়া।
অগত্যা সিঁদুরচরণ চলল নাগরপাড়া, তার নতুন সঙ্গীর বাড়ি। ক্রোশ দুই হাঁটবার পরে এক গাঁয়ে ঢুকবার মুখেই ছোট্ট চালাঘর। সেখানে গিয়ে তার বন্ধু বললে— এই মোদের বাড়ি! ভাত-পানি খাও, হাত-মুখ ধোও।
সিঁদুরচরণ বললে—ভাত-পানি খাব কী, মুই কনে এসে পড়েছি তাই শুধু ভাবতি লেগেচি।
–কদ্দুর আসবা আবার!
—কোথায় ছেলাম আর কনে আলাম! উঃ, এ পিরথিমির কী সীমেমুড়ো নেই? হ্যাঁগা, আর কদুর আছে ইদিকি?
—আরে তুমি কী পাগল নাকি? কী বলে আর কী করে! ল্যাও ভাত-পানি খাও।
ভাত খেয়ে সিঁদুরচরণ গ্রামের মাঠের দিকে বেড়াতে গেল।
বড়ো বড়ো মাঠ, দূরে তালগাছ। এতবড়ো মাঠ তাদের দেশে সে কখনো দেখেনি, আর চারিদিকেই আকের খেত। উ-ই কী-একটা গ্রাম দেখা যায়। ওর পরও পিথিম আছে ওদিকে? বাব্বা!
একজন লোককে বললে—হ্যাঁগা, ইদিকে এত আকের চাষ কেন?
—কেন, বেলডাঙায় চিনির কল আছে। আক সেখানে মণ দরে বিক্রি হয় গো
—সব আক?
—এ কী আক তুমি দেখচ, বেলডাঙার ওদিক ষাট-সত্তর একশো বিঘের এক এক বন্দ, সুদ্দু আক।
ওর বন্ধুর বাড়িতে দিন-দুই থাকার পরে আকের জমির মজুর দরকার হয়ে পড়ল। ওদের পরামর্শে সিঁদুরচরণও আকের ক্ষেতে আক কাটবার কাজে লেগে গেল। আট আনা রোজ। সিঁদুরচরণদের দেশে মজুরের রেট সওয়া পাঁচ আনা। সে দেখলে মজুরির রেট বেশ ভালোই। দু-দিনে একটা টাকা রোজগার, হবেই-বা না কেন? কোন দেশ থেকে কোন দেশে এসে পড়েছে—এখানে সবই সম্ভব।
নাগরপাড়ার ওপারে বোরগাছি, তার পাশে ধুবলি। এই দুই গ্রাম থেকে অনেক মজুর আসত আকের খেতে কাজ করতে। ওদের মধ্যে একজনের সঙ্গে সিঁদুরচরণের খুব ভাব হয়ে গেল। সে বললে—আমাদের গেরামে যাবা? সেখানে ঘোষ মশায়দের বাড়িতে একজন কিষাণ দরকার। দশ টাকা মাইনে, খাওয়া-পরা।
সিঁদুরচরণের কাছে এ প্রস্তাব লোভনীয় বলে মনে হল। তাদের দেশে কৃষাণদের মাইনে মাসে পাঁচ টাকার বেশি নয়, খাওয়া-পরার কথাই ওঠে না সেখানে। এবার পাটের দাম বেশি হওয়াতে কৃষাণদের রেট এক টাকা বেড়েচে মাসে—তাও কতদিন এ চড়া রেট টিকবে তার ঠিক নেই। হাতে কিছু টাকা করে নেওয়া যায় এদেশে থাকলে। কিন্তু এতদূর বিদেশে সে থাকবে কতদিন?
সে জবাব দিলে—না ভাই, আমার যাওয়া হবে না।
—চাকরি করবা না?
