এখন যদি এদের জিজ্ঞাসা করা যায়—তোরা কোন দেশ থেকে এসেছিলিরে? তোদের আপনজন কোথায় আছে?
ওরা বলবে—তা কী জানি বাবু!
—পশ্চিম থেকে এসেছিলি, না?
—শুনেচি বাপ-ঠাকুরদার কাছে। ওদিকের কোথা থেকে আমাদের পাঁচ-ছ’ পুরুষের আগে এসে বাস করা হয়। সে সত্য যুগের কথা।
সিঁদুরচরণ এ-হেন বুনো মালিকে নিয়ে দিব্যি ঘর করতে থাকে। তার নাম কাতু —হয়তো ‘কাত্যায়নী’-র অপভ্রংশ হবে নামটা। কিন্তু ওর অপভ্রংশ নামটাই অন্নপ্রাশনের দিন থেকে পাওয়া—ভালো নাম তাকে কেউ দেয়নি।
সিঁদুরচরণ পরের গোরু চরিয়ে আর পরের লাঙল চষে জীবনের চল্লিশটি বছর কাটিয়ে দেওয়ার পরে বিঘেতিনেক জমি ওটবন্দি বন্দোবস্ত নিলে। তার জমিতে পরের বছর দশ মণ পাট হল, সেবার বাইশ টাকা পাটের মণ। পাট বিক্রি করে সেবার এত পেলে সিঁদুরচরণ, অত টাকা একসঙ্গে তার তিন পুরুষে কখনো দেখেনি। দশ টাকার নোট বাইশখানা।
কাতু বললে—হ্যাঁ গো, দশ হাত ফুলন শাড়ির দাম কত?
—কেন, নিবি?
—দাও গিয়ে এবার। অনেকদিন যে ভাবচি। বড় শখ।
—এই বয়সে ফুলন শাড়ি পরলি লোকে ঠাট্টা করবে না? কথাটা কিঞ্চিৎ রূঢ় হয়ে পড়ল, মনে হল সিঁদুরচরণের। অল্পবয়সে ওকে দেবার লোক কে ছিল? আজ বেশি বয়সে সুবিধে যখন হলই তখন অল্পবয়সের সাধটা পূর্ণ করতে দোষ কী? তারপর ঘোষেদের দোকান থেকে একখানা ফুলন শাড়ি শুধু নয়—তার সঙ্গে এল একখানা সবুজ রঙের গামছা।
কাতু খুশিতে আটখানা। বললে—শাড়িখানা কী চমৎকার—না?
—খুব ভালো। তোর পছন্দ হয়েছে?
—তা পছন্দ হবে না? যাকে বলে ফুলন শাড়ি!
—আর গামছাখানা কেমন?
—অমন গামছাখানা কখনো দেখিইনি। ও কিন্তু মুই ব্যাভার করতি পারব না প্রাণ ধোঁরে। তাহলি খারাপ হয়ে যাবে।
—খারাপ হয় আবার কিনে দেব। আমার হাতে এখন কম ট্যাকা না!
সেদিন কামার-দোকানে বসে তিনকড়ি বুনোর মুখে কালীগঞ্জে গঙ্গাস্নান করতে যাবার বৃত্তান্ত শুনল সিঁদুরচরণ। বাড়ি এসে কাতুকে বললে—কাতু, তুই থাক, আমি দু-দিন দেশ বেড়িয়ে আসি—
—কোথায় যাবা?
—একদিকে বেড়িয়ে আসি—
—আমারে নিয়ে যাবা না?
—তুই যাস তো চল—ভালোই তো—
দুজনে জিনিসপত্র একটা বোঁচকাতে বেঁধে তৈরি হল। কিন্তু যাবার দিন কাতুর মত বদলে গেল হঠাৎ। সে বললে—তুমি যাও, আমি যাব না। গোরুটার বাছুর হবে এই মাসের মধ্যে। যদি আসতে দেরি হয়, বাছুরটা বাঁচবে না।
-তুই যাবিনে?
—আমার গেলি চলবে কেমন করে? বাছুরটা মরে গেলি সারাবছরটা আর দুধ খেতি হবে না। তুমি যাও, আমি যাব না।
সুতরাং সিঁদুরচরণ একাই রওনা হল বোঁচকা নিয়ে। রেলগাড়িতে সামান্যই চড়েচে সে, একবার কেবল বেনাপোেল গিয়েছিল গোরুর হাট দেখতে। সে জীবনে একবার মাত্র রেলগাড়ি চড়া। পরের চাকরি করতে সারাজীবন কেটেছে।
স্টেশনে গিয়ে রেলে চড়ে যেতে হবে। সিঁদুরচরণ কাপড়ের খুঁটে শক্ত করে গেরো বেঁধে দু-খানা দশ টাকার নোট নিয়েছে। কেউটেপাড়ার কাছে পাঁচু বুনোর দো-চালা ঘর রাস্তার ধারে। ওকে দেখে পাঁচু জিজ্ঞেস করলেও সিঁদুরচরণ, কনে চলেচ এত সকালে?
-একটু ইস্টিশানে যাব।
—কোথায় যাবা?
—বেড়াতি যাবা রানাঘাটের দিকি।
—তামাক খাও বসে। সিঁদুরচরণ তামাক খেতে বসল। কাছেই একটা বাঁশনি বাঁশের ঝাড়–সিঁদুরচরণ সেদিকে চেয়ে ভাবলে—এই বাঁশনি বাঁশের ঝাড়টা এদেশে, আবার অন্য দেশেও গিয়ে কী এমনি দেখা যাবে? সে আবার না-জানি কীরকম বাঁশনি বাঁশ! এই রকম কেঁচো, এইরকম কচুর ফুল কী অন্য জায়গাতেও আছে? দেখতে হবে বেড়িয়ে। সত্যি, বড়ো মজা দেশ-বিদেশে বেড়ানো।
সিঁদুরচরণ স্টেশনে পৌঁছবার কিছু পরে টিকিটের ঘণ্টা পড়ল ঢং ঢং করে। একজন ওকে বললে—যাও গিয়ে টিকিট করো। গাড়ি আসছে।
টিকিটের জানলায় গিয়ে ও বললেও বাবু, একখানা টিকিস দেন মোরে–টিকিটবাবু বললে—কোথাকার টিকিট?
—দেন বাবু, রানাঘাটেরই দেন আপাতোক একখানা।
গাড়িতে উঠে সিঁদুরচরণের ভীষণ আমোদ হল। সে আমোদ রূপান্তরিত হল বার বার ওর ধূমপান করবার ইচ্ছায়। ঘন ঘন বিড়ি খায়, এই ধরায়, এই খায়। কয়েকটি বিড়ি খেতে খেতেই রানাঘাটে গাড়ি এসে পড়াতে ও আশ্চর্য হয়ে পড়ল। ষোলো মাইল রাস্তা যে এত অল্পসময়ে এসে পড়বে, তা ও ভাবেইনি!
রানাঘাটে নেমে এখন কোথায় যাওয়া যায়? এমন অনেক দূরে যেতে হবে, যেখানে কখনো সে যায়নি।
স্টেশনের এপারে একটা উঁচুমতো রোয়াক-বাঁধানো জায়গা খুব লম্বা। তার দু ধারে রেল লাইন পাতা। সেই লম্বা রোয়াকের ওপর লম্বা একটা টিনের চালা। অত বড়ো টিনের চালার তলায় বা রোয়াকটার অন্যদিকে লোকে পান বিড়ি, চা, খাবার ইত্যাদি বিক্রি করছে—লোকজনে কিনচে। যেন একটা মেলা বসে গিয়েছে। মড়িঘাটায় গঙ্গাস্নানের যোগের সময় এরকম মেলা সে দেখেচে।
একদল উত্তরে লোক তার সঙ্গে একই ট্রেন থেকে নেমে বিড়ি টেনে আড্ডা জমিয়েচে টিনের চালার নীচে। ও সেখানে গিয়ে বললে—কনে যাবা?
তারা বললে—মুকসুদাবাদ; বেলডাঙা।
—সে কনে?
—উত্তুরে।
—কোথায় গিয়েলে?
—পাট কাচতে গেছলাম ওই কানসোনা, তালহাটি, মেহেরপুর।
মেহেরপুর গ্রাম সিঁদুরচরণের বাড়ির কাছে। লোকগুলো সেখান থেকে আসছে শুনে সিঁদুরচরণের মনে হল এই দূর বিদেশ-বিভুয়ে এরাই তার পরমআত্মীয়। সে বললে—মেহেরপুরের নসিবদ্দি সেখরে চেনো?
—তেনার বাড়িতেই তো ছিলাম আমরা। বছর বছর তেনার পাট কাচি। পত্তর দিয়ে আমাদের তিনি নিয়ে আসে।
—মুইও তারে খুব চিনি।
