কোনো কোনো দিন সন্ধ্যার দিকে তিনি বাড়ি আসেন। হাতে একটা ছোট্ট পুঁটুলি, তাতে প্রসাদী লুচি ও মিষ্টি, ফলমূল, একটু বা ক্ষীরের ছাঁচ থাকে। তাঁর নাতি করুণার বয়স এই সাত বছর। না-খেতে পেয়ে সে সর্বদা খাইখাই করছে, যা হয় পেলেই খুশি, তা কাঁচা আমড়া হোক, পাকা নোনা হোক, চালভাজা হোক, তালের কল হোক, আধপাকা শক্ত বেল হোক। খাওয়া পেলেই হল, স্বাদের অনুভূতি তার নেই। ঝাল, টক, মিষ্টি, তেতো তার কাছে সব সমান।
—ও করুণা, এই দেখ—কী এনেছি—
—কী ঠাকুরদাদা?
‘দাদু-টাদু’ বলার নিয়ম নেই এইসব অজ পাড়াগাঁয়ে, ওসব শৌখিন শহুরে বুলি করুণা শেখেনি। সে ছুটে যায় উৎসুক লোভীর ব্যর্থতা নিয়ে। ঠাকুরদাদা পুটুলি খুলে দু-খানা আখের টিকলি, একটা বাতাসা ওর হাতে দেন। ও তাতে মহাখুশি। ঠাকুরদাদা যে জিনিস দেন, তার চেয়ে যে জিনিস দেন না অনেক ভালো ও অনেক বেশি। পুঁটুলির সে-অংশে থাকে বৈকালি ভোগের লুচি, কচুরি, মালপোয়া ও তালের বড়া। যখনকার যে ফল সেটা ঠাকুরকে নিবেদন করার প্রথা এ ঠাকুরবাড়িতে বহুকাল থেকে প্রচলিত। এখন ভাদ্র মাস, কাজেই তালের বড়া রোজ বিকেলে নিবেদিত হয়।
করুণা এক-আধবার পুঁটুলির অন্য অংশে চাইলে। কিন্তু তাতে তার লোভ হয় না, ওরকম দেখতে খুব ছেলেবেলা থেকে সে অভ্যস্ত। সে জানে ও অংশে তার কোনো অধিকার নেই।
ঠাকুরদাদার দিকে ও বোকার মতো চেয়ে থাকে। উপেন ভটচাজ গলায় কাশির আওয়াজ করে পুত্রবধূকে তাঁর আগমনবার্তা ঘোষণা করতে করতে বাড়ি ঢোকেন এবং সটাং দোতলায় নিজের ঘরটিতে চলে যান।
রোজ তাঁর ঘরটিতে নিজে চাবি দিয়ে বেরিয়ে যান এবং এসে আবার খোলেন। পুত্রবধূকে বিশ্বাস করার পাত্র নন তিনি। কোনো মেয়েমানুষকেই বিশ্বাস নেই।
-ও বউমা–বউমা, ওপরে এসো—
—কে? বাবা?
—একবার ওপরে এসো।
পুত্রবধূ ওপরে গিয়ে দেখে শ্বশুর পুটুলি খুলে কীসব খাবার জিনিস এস্তভাবে হাঁড়ির মধ্যে পুরছেন। পুত্রবধূকে দেখে তাড়াতাড়ি তিনি হাঁড়িটার দিকে পেছন ফিরে বসে বললেন—বউমা? ইয়ে করো তো—আমার ঘরে একটা আলো জ্বেলে দিয়ে যাও।
—আপনি রাতে কী খাবেন? ভাত রাঁধব?।
—না। তুমি শুধু খাবার জল একঘটি দিয়ে যেও এর পরে।
এ সংসারে বৃদ্ধ শ্বশুরের জন্য পুত্রবধূর রাঁধবার নিয়ম নেই। যার যার, তার তার। ছেলে যখন আসে, বাপের খোঁজ নেয় না। ওরা নিজে রাঁধে, নিজেরা খায়। উপেন ভটচাজ এসে নিজের ঘরের তালা খুলে বড়ো জোর একটু জল কোনোদিন বা একটু নুন চান পুত্রবধূর কাছে। এর বেশি তাঁর কিছু চাইবার থাকে না, কেউ তাঁকে দেয়ও না। আজ পুত্রবধূর তাঁর জন্যে রান্না করার প্রস্তাবে তিনি খানিকটা বিস্মিত না-হয়ে পারেননি মনে মনে। বোধ হয় সেইজন্যে পুত্রবধূর প্রতি তাঁর মনোভাব হঠাৎ বড়ো দরাজ হয়ে গেল। তার ফলে যখন আবার সে জলের ঘটি নিয়ে ঢুকল, তখন তিনি হাঁড়িটা সামনে নিয়ে বললেন—দাঁড়াও বউমা, করুণাকে দিইছি—আর তুমি এই দু-খানা লুচি আর এই একটু মিষ্টি নিয়ে যাও। জল খেও।
পুত্রবধূ দুই হাত পেতে শ্বশুরের দেওয়া আধখানা ক্ষীরের ছাঁচ, খানচারেক লুচি, আধখানা ছানার মালপুয়া ও দুটি তালের বড়া নিয়ে একটু অবাক হয়েই দাঁড়িয়ে রইল।
শ্বশুর হঠাৎ কেন এত সদয় হয়ে উঠলেন তার ওপরে? না-খেয়ে থাকলেও তো কখনো পোছেন না সে খাচ্ছে, না-উপোস করছে?
সে বললে—আমি যাই বাবা?
—হ্যাঁ যাও। পান আছে?
—না তো বাবা। এ হাটে আমার হাতে পয়সা ছিল না। করুণার পাঠশালার মাইনে চার আনা বাকি। তাগাদা করছে মাস্টার। তাও দিতে পারছিনে।
পুত্রবধূর নাম তারা। গরিব ঘরের মেয়ে না-হলে আর এমন সংসারে বিয়ে হবে কেন? নীচে নেমে এসে সে ছেলেকে ডেকে দু-খানা লুচি আর মিষ্টিগুলো সব খেতে দিলে। নিজের জন্যে রাখলে দু-খানা লুচি আর দুটো তালের বড়া। ছেলেকে তালের বড়া খেতে দিলে ওর পেট কামড়াবে রাতে।
সত্যি, তার হাতে পয়সা না-থাকায় কোনোদিনই রাতে সে কিছু খায় না। করুণার জন্যে দু-বেলার চাল নেওয়া হয় ওবেলা, জল দেওয়া ভাত সন্ধের পিদিম জ্বালিয়েই করুণাকে খেতে দেয়। তার পর মায়ে-পোয়ে শুয়ে পড়ে।
নিত্য নক্ষত্র ওঠে আকাশে, নিত্য চাঁদের জ্যোৎস্নায় প্লাবিত হয়ে যায় ওদের মস্ত বড়ো ছাদটা। ও ছেলেকে নিয়ে অত বড়ো বাড়ির মধ্যে একখানা ঘরে শুয়ে থাকে, ইঁদুর খুটখাট করে, কলাবাদুড় পুরোনো বাড়ির কোণে কোণে চটাপট শব্দে ওড়ে, ছাদের ধারের বেলগাছটাতে বেলের ডাল বাতাসে দোলে—কোনো কোনো দিন ওর ছেলের ঘুম ভেঙে যায়, ভয়ে মাকে ঠেলা দিয়ে ঘুম ভাঙিয়ে বলে—ও কী খুটখুট করছে মা?
—কিছু না, তুই ঘুমো। ও ইদুর।
—বাইরে ছাদে? ওই শোনো–
—ও কিছু না, তুই ঘুমো।
—শাঁকচুন্নি আছে মা বেলগাছে?
—না, সে-সব কিছু না।
—শোনো মা, রেতার দাদা গল্প করছিল, তাদের বাঁশঝাড়ে শাঁকচুন্নি আছে— রেতা নিজেও দেখেছে একদিন, বুঝলে মা?
—তুই ঘুমো। ওসব বাজে গল্প। আচ্ছা থোকন, আমি একা একা রাত আটটার সময় পুকুরে কাপড় কেচে আসি, আমি কিছু তো দেখিনে?
উপেন ভটচাজের পুত্রবধূর সাহস খুব, এ কথা গাঁয়েও সকলে বলাবলি করে। অত বড়ো প্রাচীন অট্টালিকার বহু ঘরদোরের মধ্যে ছোট্ট একটি ছেলে সম্বল করে বাস করে—ওই ভূতের বাড়িতে। বাবা! শ্বশুর তো কালভদ্রে বাড়ি ফেরে, সোয়ামিও প্রায় তাই। শনিবারে যদি-বা এল, রবিবার বিকেলেই চলে গেল। ধন্যি সাহস বটে মেয়েছেলের।
