মুগ্ধ নন্দ উত্তর দিলেন, ভন্তে, এদের সঙ্গে কোনো সাদৃশ্যই নেই, তুলনা করা সম্ভবনয়।
—তবুও?
—ভন্তে, এদের তুলনায় শাক্যানী জনপদকল্যাণী নাসিকাকর্ণহীনা মর্কটীর ন্যায়।
—বেশ, শোনো নন্দ, যদি তুমি মনোযোগসহকারে ব্রহ্মচর্য পালন করো, তবে আমি এই সমস্ত অপ্সরী তোমাকে লাভ করিয়ে দেব—প্রতিশ্রুতি দিলাম। এখন চলো, জেতবনবিহারে ফিরে নিষ্ঠার সঙ্গে বিনয় ও ব্রহ্মচর্য অভ্যাস করবে। কেমন তো, রাজি?
নন্দ কেমন যেন হয়ে গিয়েছেন। অদূরে ওই কী কুলাচল পর্বত? এই কী স্বর্গ? আশ্চর্য দেশ! ওখানে কী হেমন্ত ও শিশির ঋতুর চার অষ্টকাতে ভগবান শত্ৰু এই অপরূপরূপসী দেবকন্যাদের সঙ্গে বিহার করেন? মরি মরি, এই পিঙ্গলবর্ণনীবীশোভিতা, চঞ্চলচরণা হাস্যময়ী দেবীগণের অপাঙ্গে যেন শাণিত তির। এদের চরণকমল নূপুরের রিনিঝিনিতে শব্দায়মান, কটিতটস্থ দু-কুরাজি কাঞ্চীকলাপে বিলাসান্বিত, এঁদের ক্ষীণ কটিদেশ কুচযুগের ভারে যেন পরিশ্রান্ত, কমলকোরকের সহিত স্পর্ধাধারী সকটাক্ষ নয়ন যেন সকল পুরুষার্থের সাধক।
বেচারি নন্দ! তাঁর মাথাটি ঘুরে গেল। তিনি সব বিস্মৃত হলেন। ভুললেন কপিলাবস্তুর রাজপ্রাসাদ, ভুললেন কল্যাণী জনপদলক্ষ্মী ভদ্রার ব্যাকুল নয়ন দুটি। বললেন, ভন্তে, যদি এঁদের লাভ করতে পারি এমন প্রতিশ্রুতি দেন, তবে আমিও কথা দিলাম, আজ থেকে অতিনিষ্ঠা ও মনোযোগের সঙ্গে বিনয় প্রতিপালন করব।
ভিক্ষুগণ ক্রমে শুনলেন যে ভগবান তথাগতের কনিষ্ঠ ভ্রাতা নন্দ একপাল দেবকন্যা লাভের আশায় পুনরায় ব্রহ্মচর্য পালনে মনোযোগী হয়েছেন।
এবার অধ্যবসায় আগেকার চেয়ে অনেক বেশি।
দু-চারজন সমবয়সি ভিক্ষু ঠাট্টা করে বলতে লাগলেন, বাহবা নন্দ, ভালো মজুরি বটে! একেবারে একটি দল দেবকন্যা লাভ!
কেউ কেউ বললেন, আরে বাবা, নন্দ বোকা নয়। দাদার কাছ থেকে পুরস্কারটি আগে আদায় করবার প্রতিশ্রুতি পেয়ে তবে ব্রহ্মচর্য আরম্ভ করেছে। পাকা ঘুঘু নন্দ।
আয়ুষ্মন নন্দ কারও কোনো ঠাট্টা-বিদ্রূপ কর্ণপাত না-করে একাগ্র মনে প্রচণ্ড উৎসাহ ও অদম্য অধ্যবসায়ের সঙ্গে সাধনা করতে লাগলেন। তাঁর কঠোর আত্মসংযম ও বিনয় প্রতিপালনের দৃঢ়তা প্রৌঢ় ভিক্ষুগণকে পর্যন্ত তাক লাগিয়ে দিল।
পাঁচ বৎসর এইভাবে দিনরাত্রি কোথা দিয়ে কেটে গেল, নন্দ তার কোনো খবরইরাখেন না। অদূরবর্তী নির্বিন্ধ্যা নদীর বারিপতনে যেন সত্যতত্বের আভাস ভেসে আসে।সকল প্রকার গার্হস্থ্য সুখের চিন্তা তিনি ক্রমে পরিত্যাগ করলেন। ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ-যশ, মুক্তি, বিলোপ ও নির্মললোক প্রভৃতির সমুদয় আশা আকাঙক্ষা ও ঋতুসমূহের পুষ্পস্তবক ফল ও নবীন কিশলয়রাজি বারংবার তাঁর উগ্র তপস্যার সম্মুখে নতমস্তকে অভিবাদন জানিয়ে গেল।
একদিন রজনীর শেষযামে ঊষার অরুণচ্ছটা দিগবলয়ে উঁকি দেবার উপক্রম করেছে, এমন সময় হঠাৎ জেতবন দিব্যজোতিতে পূর্ণ হয়ে গেল। এক দীপ্তিমান দেবতা ধ্যানাসনে উপবিষ্ট ভগবান তথাগতের সম্মুখে আবির্ভূত হলেন এবং তাঁকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করে বিনীতভাবে জানালেন, ভগবান, অদ্য ভগবানের মাতৃসাপুত্র আয়ুষ্মন নন্দ ক্ষীণাঙ্গ হয়ে চেতোবিমুক্তি লাভ করলেন। তাঁর জয় হোক।
ভগবান জিন ঘাড় নেড়ে জানালেন, হ্যাঁ, এ আমি অবগত হয়েছি।
—আমার প্রণাম গ্রহণ করুন।
দেবদূতের অন্তর্ধানের অল্প পরেই বনে বনে বিহঙ্গকুল কলরব করে উঠল। ভিক্ষুগণ শয্যা-ত্যাগ করলেন। সূর্যোদয়ের চিহ্ন প্রকাশ পেল পূর্ব আকাশে। ভিক্ষু উপালী প্রতিদিনের মতো নির্বিন্ধ্যা নদীর শীতলজলে অবগাহন স্নান করতে চললেন। ভিক্ষু তিষ্য ভগবান জিনের জন্য দন্তকাষ্ঠ রেখে গেলেন।
এমন সময় অহৎ-জীবনের প্রথম নবীন প্রভাতে আয়ুষ্মন নন্দ ধীর পদবিক্ষেপে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সমীপে উপস্থিত হলেন। নিম্নস্তরে নতমস্তকে নিবেদন করলেন, ভন্তে, আমাকে যে জন্য উপসম্পদা দান করেছিলেন, তা আজ সফল হয়েছে। আমায় আশীর্বাদ করুন।
ভগবান বুদ্ধ বললেন, আমি জানি, নন্দ। তোমার জন্মগ্রহণ অদ্য সার্থক। আমার আশীর্বাদ গ্রহণ করো।
নন্দ বললেন, ভন্তে, আর একটি কথা—
—বলো।
—পূর্বে আমাকে আপনি একটি প্রতিশ্রুতি দান করেছিলেন—
–করেছিলাম।
—ভন্তে, আমার আর তাতে কোনো আবশ্যক নেই।
—অপ্সরাদের তুমি হরণ করতে চাও না?
—ভন্তে, ক্ষমা করবেন। আপনিই আমায় সাংসারিক আসক্তি থেকে মুক্তি দিয়েছেন।
—তোমার ভ্ৰম, নন্দ। মুক্তি কেউ কাউকে দিতে পারে না। তুমি নিজেই নিজেকে মুক্ত করেছ। আমি শুধু উপায় বলে দিয়েছি মাত্র। আর একটি কথা—
—ভন্তে, বলুন।
—আমি স্বর্গে তোমাকে নিয়ে যাইনি। এখানে এই বৃক্ষতলে বসেই ওই দৃশ্য তোমাকে দেখিয়েছি। যখন দেখলাম, তোমার তরুণ চিত্তবৃত্তি নারীতে আসক্ত, তখন সেই পথেইযাতে তুমি প্রজ্ঞা-বিমুক্তি লাভ করো, তার জন্যে ওই একটি অলীক কল্পনার আশ্রয় আমায় নিতে হয়। ওই সব অপ্সরা কোথাও ছিল না, স্বপ্নে দৃষ্ট গন্ধর্বনারীর মতোই ওই স্বর্গওঅলীক।
সংসার
উপেন ভটচাজের পুত্রবধূ বেশ সুন্দরী। একটিমাত্র ছোটো ছেলে নিয়ে অত বড়ো পুরোনো সেকেলে ভাঙা বাড়ির মধ্যে একাই থাকে। স্বামীর পরিচয়ে বউটি এ গ্রামে পরিচিতা নয়, অমুকের পুত্রবধূ এই তার একমাত্র পরিচয়। কারণ এই যে স্বামী ভবতারণ ভটচাজ ভবঘুরে লোক। গাঁজা খেয়ে মদ খেয়ে বাপের যথাসর্বস্ব উড়িয়ে দিয়েছে, এখন কোথায় যেন সামান্য মাইনেতে চাকরি করে, শনিবারে শনিবারে বাড়ি আসে, কোনো শনিবারে আসেই না। শ্বশুর উপেন ভটচাজ গ্রামের জমিদার মজুমদারদের ঠাকুরবাড়িতে নিত্যপূজা করেন। সেখানেই থাকেন, সেখানেই খান। বড়ো-একটা বাড়ি আসেন না তিনিও। ভালো খেতে পান বলে ঠাকুরবাড়িতেই পড়ে থাকেন, নইলে সকালের বাল্যভোগের লুচি ও হালুয়া, পায়েস, দই ও বৈকালির ফলমূল বারোভূতে লুটে খায়।
