অনেক সময় সারারাত্রি এমন ভাবে কাটে। নন্দ আকুলস্বরে স্ত্রীর ছবির দিকে চেয়ে কত প্রেম-সম্বোধন করেন, অনুচ্চস্বরে গান গেয়ে শোনান।
নন্দের কুটিরের কাছাকাছি যেসব ভিক্ষুরা থাকেন, তাঁরা ক্ৰমে ব্যাপারটা জানতে পারলেন।
দু-একজন বয়োবৃদ্ধ ভিক্ষু নন্দকে অনেক প্রবোধ দিলেন, অনেক সদ্ধর্মের উপদেশ দিলেন। দিলে কী হবে, মন মানে না, তিন-চার মাস ধরে ব্যাপারটা সমানে চলতে লাগল। প্রথমে কেউ বুদ্ধদেবের কানে কথাটা তুলতে সাহস করেননি। মঠে বাস করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে এ রকম ব্যবহার সদ্ধর্মের বিরোধী, বিনয়-আচরণের বিরোধী, সাধন-তপস্যার বিরোধী। সর্বাপেক্ষা লজ্জা ও সংকোচের ব্যাপার এই যে, ইনি ভগবান জিন তথাগতের মাতৃসারপুত্র।
কয়েকজন ভিক্ষুতে মিলে যুক্তি ও পরামর্শ করে একদিন একজন বিজ্ঞ ভিক্ষু পদ্মপাদ বুদ্ধদেবের নিকট গিয়ে ধীরে ধীরে নন্দের কাণ্ডকীর্তি সব নিবেদন করলেন।
ভগবান বুদ্ধদেব মনোযোগের সঙ্গে সবটুকু শুনে বললেন, আবুস, আয়ুষ্মন নন্দকে গিয়ে বলুন যে আমি তাকে ডেকেছি।
—ভন্তে, আপনার যা আজ্ঞা।
নন্দ কিছুক্ষণ পরে এসে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করে কিছুদূরে বিনীত ভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তথাগত বললেন, নন্দ শুনলাম, তুমি পুনরায় ব্রহ্মচর্যে অমনোযোগী হয়েছ, বিনয়গুলি রীতিমতো প্রতিপালন করো না?
—ভন্তে, এ কথা সত্য।
—তুমি পাথরের গায়ে তোমার পত্নীর চিত্র অঙ্কন করে তারই দিকে তাকিয়ে রাত্রিবেলা হাসো কাঁদো?
—ভন্তে, হ্যাঁ।
—কেন এমন আশ্রমবিরুদ্ধ আচরণ করো?
—ভন্তে, এ কথা আমি পূর্বেই আপনাকে নিবেদন করেছি। আপনার ভ্রাতৃবধূ শাক্যানী জনপদকল্যাণীর কথা বিস্মৃত হতে পারছি না, তিনি আমার সমস্ত মন বুদ্ধি অধিকার করে আছেন বলেই আমি ব্রহ্মচর্যে স্থিতিলাভ করতে পারছিনে। আপনি আদেশ করুন, আমি গৃহস্থাশ্রমে ফিরে যাই। আমার কিছুই হচ্ছে না—দু দিকই গেল।
ভগবান জিন স্নেহ ও অনুকম্পার দৃষ্টিতে এই তরুণবয়স্ক কনিষ্ঠ ভ্রাতার দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইলেন। তারপর তাঁকে ইঙ্গিত করলেন নিকটে এসে উপবেশন করতে।
ধীরে ধীরে বললেন, নন্দ, একটা পুরোনো কথা বলি শোনো। যখন উরুবিন্দ্ব গ্রামের অরণ্যে আমি অভিসম্ভোধি লাভ করলাম, তখন আমি ভাবলাম এ ধর্ম সাধারণের কাছে প্রচার করব কিনা। ভোগাসক্ত বিচারশক্তিহীন ভাবপ্রবণ মানবসমূহের পক্ষে ধর্মের এ আদর্শ উপলব্ধি করা অত্যন্ত কঠিন হবে। আমি নিশ্চেষ্ট হয়ে সেই বনে কিছুকাল অবস্থান করি। একদিন সাহস্পতি ব্রহ্মা আমাকে এসে অনুরোধ করেন মানবসমাজের কল্যাণের জন্য এই ধর্ম প্রচার করতে। তাঁরই কথায় আমি পূর্বসিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করি। তারপর মনে ভাবলাম, সর্বাগ্রে কার কাছে এ ধর্ম প্রচার করব? কে বুঝবে?
অনেক চিন্তার পরে আমার দুই পূর্বতন গুরু আবাদ কালাম ও রুদ্রক রামপুত্রের কথা মনে পড়ল। তখনই ধ্যানে বসে দেখলাম, ওই দুই মহাত্মা মাত্র দশ দিন পূর্বে দেহত্যাগ করেছেন। তাহলে উপায়? মানুষ নেই, সবাই তোমার মতো নির্বোধ। তখন আমার পাঁচজন সাধন-সঙ্গীর কথা মনে পড়ল। তাঁরা ছিলেন ঋষিপত্তন মৃগদাবে সাধনারত। এঁদের গিয়ে উপসম্পদা দান করে ধর্মপ্রচারে নিযুক্ত করলাম। শীঘ্রই তাঁরা সত্যতত্বের ধ্যানে সম্পূর্ণ অধিকারী হলেন এবং জনসমাজে সদ্ধর্ম প্রচারের প্রকৃত যোগ্যতা লাভ করলেন। আমিও এই পঁয়ত্রিশ বছর সত্যের প্রচারে নিজেকে নিযুক্ত রেখেছি। আমার নিজের উপলব্ধি এই যে, শিষ্য নিজের সংযম পবিত্রতা ও তপস্যার দ্বারাই মুক্তিলাভ করে, এ জন্যে চাই তার নিজের দৃঢ় ইচ্ছা ও অধ্যবসায়। আমি তোমাকে শুধু পথ দেখিয়ে দিতে পারি। বাকিটুকু করতে হবে তোমার নিজের উদ্যমে ও সত্যসংকল্পে। এখন কী তোমার অভিরুচি? জীবনের দুঃখের লবণ-জলধি পার হতে চাও, না পথভ্রান্ত নাবিকের মতো ঘুরে বেড়াবে জন্ম-জন্মান্তর ধরে?
নন্দ মাথা নীচু করে বললেন, ভন্তে, আমি অত্যন্ত দুর্বলচেতা। আমি বিনয় প্রতিপালন করতে পারছি না। আমাকে আদেশ করুন, আমি গৃহে ফিরে যাই। আমি আপনার স্নেহের ও কৃপার অযোগ্য।
ভগবান বুদ্ধদেব তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে স্নেহভাজন কনিষ্ঠ ভ্রাতার হস্তধারণ করে বললেন, চলো, এসো আমার সঙ্গে।
অবাক হয়ে গেলেন নন্দ। দাদা তাঁকে নিয়ে নক্ষত্রবেগে উড়ে চলেছেন নীল শূন্যপথ বেয়ে। পদতলে গোটা পৃথিবী লুপ্ত হয়ে গেল। উভয়ে এক অপূর্ব সুন্দর মহাদেশে উপস্থিত হলেন। দিকে দিকে সে দেশের সৌন্দর্যের মোহন লীলা; বিদ্যুতের, জ্যোৎস্নার, রমণীয় পুষ্পরাজির ও সংগীতের সমাবেশে যেন গোটা মহাদেশ স্বপ্নময়। বিদ্রুমবেদী ও হস্থলী স্থানে স্থানে যেন উপবন-মধ্যে বিরাজমান।
এমন সময়ে চারুহাসিনী লজ্জাবতী ঈষত্ৰাস্যময়ী বহু দিব্যনারীকে পরস্পর হাত-ধরাধরি করে অদূরে আবির্ভূতা হতে দেখে নন্দ মুগ্ধ দৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে রইলেন। রূপের জ্যোতিতে ভরিয়ে তুলেছে ওরা দশ দিক।
তারপর জ্যেষ্ঠের দিকে চেয়ে ভয়ে ও বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ভন্তে, এ কোন দেশ? এই দেবীরাই বা কারা?
বুদ্ধদেব বললেন, এ দেশ ত্রয়স্ত্রিংশ স্বর্গ। এরা এ দেশের অপ্সরী। কামজয়ী পুরুষ ভিন্ন এরা অন্য কারও দৃষ্টিগোচর হয় না। আচ্ছা নন্দ, বলো দেখি এরা শাক্যানী জনপদকল্যাণী অপেক্ষা অধিক সুন্দরী, না শাক্যানী জনপদকল্যাণী এদের অপেক্ষা সুন্দরী?
