নন্দ শাক্যকুলজাত ক্ষাত্র বীর। আজ্ঞানুবর্তিকা তো কুলের ধর্ম।
বীরের মতোই তিনি জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার আদেশে তরুণী পত্নী প্রেমময়ী ভদ্রাকে মন থেকে মুছে ফেলে মাথা নীচু করে ঈষৎ হেসে বললেন, আপনি যা বলেন।
—প্রব্রজ্যা গ্রহণ করবে?
—আপনি যা বলেন।
—আজই মস্তক মুণ্ডন করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করো। আর একটি কাজ করতে হবে। বড়ো কঠিন কাজ।
—আদেশ করুন।
—ভিক্ষাপাত্র হাতে ভিক্ষা করতে যেতে হবে তোমার জননী ও পত্নীর কাছে। আজই।
—আপনি যা বলেন।
এক বৎসর অতীত হয়েছে।
পুনরায় ফাল্গুন মাস। কিংশুক ও চম্পক ফুলের মেলা বসেছে বনে বনে, শৈলসানুতে, অধিত্যকার গর্ভদেশে। প্রকাণ্ড একটি ভেরীর মতো শিমুল বৃক্ষের কাণ্ড বেঁকে দাঁড়িয়ে আছে আকাশের নীচে। মাথায় তার ফুটন্ত ফুলের শোভা।
শ্রাবস্তিপুরের জেতবনবিহারে ভগবান তথাগত একটি নাগকেশর বৃক্ষের ছায়ায় বসে শত্রুর পিণ্ড ভোজন করছেন, পার্শ্বে একটি স্থালীতে শালিধানের সিদ্ধান্ন— পুষ্পভদ্রক-বিহারের ভিক্ষুণী উর্মিমাতার প্রেরিত, ভগবান তথাগতের সেবার জন্য।
এমন সময়ে জনৈক ভিক্ষু এসে কাছে দাঁড়াতেই বুদ্ধদেব বললেন, আবুস, কিছু বলবে?
—ভন্তে, নিবেদন আছে।
–বলো।
—ভন্তে, আজ আপনার কনিষ্ঠ ভ্রাতা ভিক্ষু নন্দ আর একজন ভিক্ষুর কাছে বলছিলেন, তিনি গৃহস্থাশ্রমে প্রত্যাবর্তনে ইচ্ছুক। ব্রহ্মচর্যপালন আর তাঁর দ্বারা নাকি সম্ভব হচ্ছে না।
—কার কাছে বলছিল?
—ভিক্ষু ভেণ ও ভিক্ষু উন্মুকের কাছে।
—আবুস, তুমি আমার নাম করে আয়ুষ্মন নন্দকে বলো, আমি তাকে ডেকেছি। আর সামান্য লবণ পাঠিয়ে দিয়ে ওর হাতে।
—ভন্তে, আপনার যা আজ্ঞা।
আয়ুষ্মন নন্দ জ্যেষ্ঠের ডাক শুনে প্রমাদ গণলেন। সমবয়সি ভিক্ষু উন্মুকের কাছে আজই সকালে দু-একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেছিলেন বটে মনের দুঃখে, কিন্তু–
ভগবান জিন কনিষ্ঠের মুখের দিকে স্নেহভরে চেয়ে বললেন, নন্দ, তুমি কারও
কাছে কিছু বলছিলে আজ?
—ভন্তে, বলেছি।
-বলেছ যে ব্রহ্মচর্য পালন করা আর তোমার দ্বারা সম্ভব নয়, তুমি গৃহস্থাশ্রমে প্রত্যাবর্তনে উৎসুক?
—ভন্তে, এ কথা সত্য।
—কারণ কি আমাকে বলবে?
রাজকুমার নন্দ মাথা হেঁট করে নীরব রইলেন। কোনও কথা বললেন না। ভগবান জিন বললেন, লবণ এনেছ?
—ভন্তে, এনেছি।
—স্থালীতে নিক্ষেপ করো।
—যথা আজ্ঞা। এখন বলো, ব্রহ্মচর্য পালন কেন তোমার দ্বারা অসম্ভব? গৃহত্যাগ করে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছ, এখন আবার গৃহে ফিরতে চাও কী জন্যে খুলে বলো।
আয়ুষ্মন নন্দ অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে চোখ মাটির দিকে রেখে বলতে আরম্ভ করলেন, ভন্তে, আমার প্রগলভতার জন্যে ক্ষমা করবেন। আমার সংসার ভোগ করার স্পৃহা গেল না। আর একটি কথা, যখন সেদিন ফলপূর্ণ করক-হস্তে আপনার সমীপে ন্যগ্রোধারামে যাই, তখন আপনার ভ্রাতৃবধূ জনপদকল্যাণী গৃহদ্বারে দাঁড়িয়ে সপ্রেম দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে বার বার ব্যাকুল স্বরে বলেছিল, ফিরে এসো তাড়াতাড়ি প্রিয়, বিলম্ব করো না যেন। তার সেই আলুলায়িতকুন্তলা মূর্তিতে আজও যেন সে সেই দ্বারে দাঁড়িয়ে আমায় ডাকছে। আমি তার সে মূর্তি ভুলতে পারছি না, দেব। আমায় গৃহস্থাশ্রমে ফিরে যেতে অনুমতি দিন।
বুদ্ধদেব প্রসন্ন হাস্যে বললেন, সাধু আয়ুষ্মন নন্দ, সাধু! তুমি সত্যবাদী, অকপট। এই জন্যেই তোমাকে গৃহের বাহিরে এনেছিলাম। তুমি কুলপুত্র, সত্যজ্ঞানের জন্যে গৃহত্যাগ করে এসে আবার গৃহে ফিরে গেলে অত্যন্ত নিন্দার কথা হবে সেটা। বংশ পতিত হবে। তপস্যা করো, নতুবা জ্ঞান লাভ হবে না। কর্মই কর্মকে জানিয়ে দেবে, ক্রমে আনন্দ ও বল পাবে মনে। আপাতমধুর অনিত্যবস্তুর প্রলোভনে শ্রেয় ত্যাগ করা কি বুদ্ধিমানের কাজ? যাও, খুব মনোযোগের সঙ্গে চেষ্টা করো।
রাজপুত্র আয়ুষ্মন নন্দ নিজের কুটিরে ফিরলেন। আবার কিছুদিন ধরে একমনে অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলন চালান অধ্যবসায়ের সঙ্গে। বিনয়গুলি যথাযথ প্রতিপালন করবার চেষ্টায় সারাদিন বেশ কেটে যায়; কিন্তু সন্ধ্যার অন্ধকারে পদচিহ্নহীন প্রান্তরের দিকে চেয়ে মন কেমন করে ওঠে।
মনে হয় কতদূরে সে দাঁড়িয়ে আছে ব্যাকুল প্রতীক্ষায় সেই গৃহদ্বারটিতে। এখনও সে আশা ছাড়েনি তার। ভদ্রার সঙ্গে আর দেখা হয়নি। যেদিন ভিক্ষা করতে গিয়েছিলেন, সেদিন রাজাপ্রাসাদে মহাপ্রজাপতি মাতা গৌতমী তাঁকে ভিক্ষা দিয়েছিলেন; কিন্তু ভদ্রা মূৰ্ছিতা ও জ্ঞানহীনা ছিল প্রাসাদকক্ষে, ভিক্ষুর কায়বেশে তাঁর আগমন শ্রবণ করে। আয়ুস্মান নন্দের সঙ্গে ছিলেন ভিক্ষু স্থবির উপালী।
নন্দের ইচ্ছা ছিল পত্নীর মূৰ্ছাভঙ্গের জন্যে অপেক্ষা করেন।
জানবৃদ্ধ স্থবির উপালী অপেক্ষা করতে দেননি নন্দকে। বলেছিলেন, চলো চলো, আয়ুষ্মন। জননীর নিকট ভিক্ষা করলেই বিনয় প্রতিপালিত হল, যাই চলো।
নন্দ রাজপ্রাসাদে চিত্রশিক্ষকের নিকট চিত্রকর্ম শিখেছিলেন, ভালো চিত্র অঙ্কন করতে পারতেন।
কিছুকাল পরে তিনি এক উপায় বার করলেন।
ভদ্রাকে না-দেখে আর সত্যি থাকা যায় না। এক এক নির্জন সন্ধ্যায় মনে হয়, প্রাণ যেন আর দেহের পিঞ্জরে আবদ্ধ থাকতে চাইছে না। ছুটে বেরিয়ে যেতে চাইছে বিনয় প্রতিপালনের শৃঙ্খল থেকে, অষ্টাঙ্গিক মার্গের পাশবন্ধন থেকে, সেই বহুদূরে প্রাসাদ-অলিন্দে, যেখানে এই বসন্তে নাগকেশরবৃক্ষে কুঁড়ি নেমেছে, বকুল ফুল ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ছে শিলাবেদিকায়, অতিমুক্তলতায় কচি রাঙা পত্রের উদগম হচ্ছে ভদ্রা বাতায়ন-বলভিতে পুষ্পমাল্য রেখে একদৃষ্টে তাঁর আগমনপথের দিকে চেয়ে আছে। সেখানেই শান্তি, সেখানেই সুখ। নন্দ এক প্রস্তরফলকে ভদ্রার এক প্রতিমূর্তি আঁকলেন। সেই প্রতিমূর্তির সঙ্গে নির্জনে কথা বলেন, কত হাস্যপরিহাস করেন, কখনও অশ্রুপাত করেন।
