-বেশ, যাও।
ক-দিনই এই ব্যাপারটি লক্ষ করেন প্রশান্তবুদ্ধি, দূরদর্শী মহাপুরুষ, কিছু বলেন। কনিষ্ঠের গমনপথের দিকে স্নেহ ও অনুকম্পার দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখেন।
আজ এত সকালে এখনই যেতে হবে বধূকে ছেড়ে, মন সরছিল না রাজকুমারের। কিন্তু উপায় নেই, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার আদেশ লঙঘন করার সাধ্য নেই, যেতে হবেই।
ভদ্রা বললে, কখন আসবে?
—বেলা দু-দণ্ডের মধ্যে।
–ভগবান জিনকে আমার প্রণাম জানিও। আমি অপেক্ষা করব তোমার জন্যে।
—একসঙ্গে অভ্যঞ্জন করব ফিরে এসে। স্নান ও কেলিও।
ভদ্রার বিশাল নয়ন দুটি কৌতুকে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, হাততালি দিতে দিতে বললে, খুব ভালো খুব ভালো, শিগগির এসো আয়ুষ্মন, অপেক্ষা করে থাকব তোমার জন্যে–
একটা পেচক কর্কশ রবে হর্মের উপর দিয়ে উড়ে গেল কি?
নন্দ বা ভদ্রা কেউ শুনতে পেলেন না সে রব। সুখী নন্দ, সুমনা ভদ্রা। কপিলাবস্তুর প্রাসাদ শিখরে দিবসের প্রথম প্রহর ঘোষণা করেছে সূর্যদেবের তরুণ কিরণ।
ন্যগ্রোধারাম বিহারে ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীদের প্রভাত-পরিচর্যা সমাপ্ত হয়েছে। ভগবান জিন আজ যেন আগ্রহের দৃষ্টিতে বার বার চাইছেন পথের দিকে।
একজন ভিক্ষুকে বললেন, আবুস, রাত্রে ভালো নিদ্রা হয়নি।
—কেন?
—এ স্থানে কীটের উপদ্রব। এক পাত্র সুবচল রস আমাকে দিয়ে পানের জন্যে। নতুবা অনিদ্রাহেতু শির :পীড়া উপস্থিত হবে।
—আপনার যেমন আজ্ঞা। আপনার ইচ্ছাই তপস্যার আত্যন্তিকী সিদ্ধি।
এমন সময়ে বিনীত হাস্যমুখে রাজকুমার নন্দ জ্যেষ্ঠের পাদবন্দনা করে ফলপূর্ণ করকটি তাঁর সামনে স্থাপন করলেন। ভগবান জিন কনিষ্ঠের মুখের দিকে চেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কি হে নন্দ, শরীর ভালো?
–আজ্ঞে হ্যাঁ।
—ফলপূর্ণ করকটি কি খুব ভারী?
—আজ্ঞে না।
–ওই ভারটি স্বচ্ছন্দে বহন করলে কেন, বলো তো? অন্য কারও জন্যে কী বহন করতে?
—ভন্তে, না।
—এ কথা সত্যি কিনা?
—হ্যাঁ ভন্তে, এ কথা সত্যি।
-তবে এখন কেন বহন করলে ওটি?
—ভগবান, আপনাকে ভালোবাসি। আপনার কর্মে আমার আনন্দ। কষ্ট হবে কেন?
রাজকুমার নন্দ আরও কিছুক্ষণ পূজনীয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সঙ্গে কথাবার্তা বললেন। বিহারের এদিকে-ওদিকে গেলেন। এদিকে মন ছটফট করছিল, বেশিক্ষণ আর থাকা চলে না। চক্ষুলজ্জার খাতিরে আরও অর্ধদণ্ড এদিক-ওদিক করতে হল। তারপর ভগবান জিনের পাদবন্দনা ও প্রদক্ষিণ করে বিদায় প্রার্থনা করলেন। হায়, তখন তিনি জানতেন না যে বাজপাখির কবলগত তিনি। বুদ্ধদেব কনিষ্ঠের দিকে জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে চেয়ে বললেন, কোথায় যাবে নন্দ?
—গৃহে।
—গৃহ? গৃহে আসক্ত হয়ো না। কেননা গৃহ—তৃষ্ণা, রাগ, বিবাদ, মনু, মান, স্পৃহা, ভয়, দৈন্য, মন:পীড়া ইত্যাদির নিদান এবং জন্ম-মরণের আলবাল। গৃহ ছেড়ে বাইরে এসেছ আমারই ইচ্ছায়। আমি তোমাকে স্নেহ করি। তোমার মধ্যে আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা রয়েছে। বৃথা গৃহবাসী হয়ে সে সম্ভাবনা নষ্ট করো না। জাগতিক সুখ দু-দিনের, তার জন্যে চিরস্থায়ী সুখকে নষ্ট করবে কেন? আমার ইচ্ছা তুমি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করো।
রাজকুমার নন্দের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এ কী সর্বনেশে কথা পূজনীয় জ্যেষ্ঠের মুখে! ভগবান জিন তাঁর সঙ্গে রহস্য করছেন না তো?
বুদ্ধদেব কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে নিরুত্তর দেখে আবার বললেন, কী নন্দ, কথা বললে না যে?
নন্দ অতীব বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ভন্তে, আমি সম্প্রতি বিবাহ করেছি, আপনি জানেন। আমি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করবার যোগ্য নই। মন যদি—মানে—সংসারের দিকেই থাকে, প্রব্রজ্যা গ্রহণ করা মিথ্যাচার হবে নাকি? মিথ্যাচারে অভিরুচি হয় না, দেব।
নন্দ জানতেন না মহামানবের বজ্রকঠোর নির্মম দৃষ্টি তাঁর ওপর নিপতিত। পাথরের দেবতার মতো তিনি নির্বিকার, শিষ্যের কোনও দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিতে রাজি নন। তাকে তিনি সাধনোজ্জ্বল আত্মার সত্যদৃষ্টি ও নির্বাণ দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যাবে কোথায় বাবাজি?
ধীরে ধীরে বুদ্ধদেব বললেন, শোনো। প্রেম ক্ষণস্থায়ী, অনিত্য। যতদিন যৌবন, প্রেম ততদিন। রমণীর সৌন্দর্যও দু-দিনের। স্বপ্ন-দৃষ্ট ব্যাঘ্র বা অপ্সরী স্বপ্নদ্রষ্টার নিজেরই একটি অংশ। এক অখণ্ড আমিই মোহগ্রস্ত অবস্থায় নিজেকে বহুরূপে দেখছে। জগৎ কোথায়? জগৎ নেই!
রাজকুমার নন্দ আয়ত সুন্দর চক্ষু দুটি তুলে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। চক্ষে ব্যাধপীড়িত মৃগের কাতর দৃষ্টি।
ভগবান জিন বললেন, শোনো নন্দ। তোমার কথা মিথ্যা নয়, তুমি ঠিকই বললে। কিন্তু কী জানো, পুরুষকার একটা খুব বড়ো জিনিস। চেষ্টা ছাড়া কিছু হয় না। হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে জন্ম বৃথা যাবে, বার বার জন্মমৃত্যুর যূপকাষ্ঠে ব্রাহ্মণদের যজ্ঞীয় পশুর মতো বলি প্রদান করবে নিজেকে নিজে। এ থেকে কোনো দিন উদ্ধার পাবে না, মুক্তি পাবে না। সেটা ভালো, না-এই এক জন্মেই দেহ, কাল ও অহংকাররূপ বস্তুকে নির্মমভাবে ধ্বংস করে শাশ্বত শান্তি ও আনন্দ লাভ করা ভালো? বলো শুনি।
রাজকুমার নন্দ বললেন, ভন্তে, জন্ম-মৃত্যু নিরোধ করাই ভালো।
—বেশ। তবে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করো। আর গৃহে ফিরে যেয়ো না। এই শুভ মুহূর্তটির প্রতীক্ষাতেই আমি ছিলাম। শুভ মুহূর্ত জীবনে একবার আসে, দু-বার আসে না। হেলায় হারিয়ো না সে মুহূর্ত। যখন সত্যে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন দেখবে। সংসার-সুখ তার কাছে অতিতুচ্ছ।
