—”আজ সভার পরে আমার বাড়িতে আসুন না একবার দাদা? এখানে রাতের জন্যে রাখতেও আমি পারি। আজ দার্জিলিঙের গাড়ি নেই। রাত্রে এখানে থাকুন। কোনো অসুবিধা হবে না।”
—”বেশ, বলব এখন।”
—”যাতে থাকেন তাই করুন। কালই খবরের কাগজে একটা রিপোর্ট করিয়ে দেব এখন। ফ্রি প্রেসের আর আনন্দবাজারের রিপোর্টার এখানে আছে।”
রায়বাহাদুর বুঝিলেন তাঁর মাসতুতো ভাইটি দরদ কোথায়। সেসব কথা বলিয়া কোনো লাভ নাই, এখন কোনোরকমে কার্যসিদ্ধি হইলেই হয়। কোনোরকমে আজ মিটিং চুকিলে বাঁচেন।
বাড়ির ভিতর হইতে নীরেনবাবুর মেয়ে মীনা আসিয়া বলিল,-”ও জ্যাঠামশায়, বাবাকে বলে আমাদের টিকিটের টাকা দিন।”
নীরেনবাবু ধমক দিয়া বলিলেন,—”যা যা বাড়ির মধ্যে যা, এখন বিরক্ত করিসনি। ব্যস্ত আছি।”
মীনা আবদারের সুরে বলিল,-”তোমাকে তো বলিনি বাবা, জ্যাঠামশাইকে বলছি।”
রায়বাহাদুর জিজ্ঞাসা করিলেন,–”কীসের টিকিটরে মিনু?”
মীনা বলিল,-”আপনি কোথায় থাকেন যে সবর্দা! আমাদের পাশের বাড়ির সবিতা আপনাদের কলেজে পড়ে, সে বলে আপনি নাকি পথ চলতে চলতে অঙ্ক কষেন। সত্যি, হ্যাঁ জ্যাঠামশাই?”
নীরেনবাবু পুনরায় ধমকের সুরে বলিলেন,—’আঃ, জ্যাঠা মেয়ে! যা এখান থেকে। জ্বালালে দেখছি। কীসের টিকিট জানেন দাদা, ওই যে ইন্দুবালা নাকি আজ আসছে আমাদের এখানকার বাণী সিনেমাতে, নাচ-গান হবে, কী নাকি বক্তৃতাও দেবে, তাই পাড়াসুদ্ধ ভেঙেছে দেখবার জন্যে। মেয়েরা তো সকাল থেকে জ্বালালে।”
—’তা দাও না ওদের যেতে। আইনস্টাইনের লেকচারে আর ওরা কী যাবে। তবে দেখে রাখলে একটা বলতে পারত সারাজীবন। কীরে মিনু, কোথায় যাবি?”
—”আমরা জ্যাঠামশাই সিনেমাতেই যাই। ‘মিলন’ ফিলমে ইন্দুবালাকে দেখে পর্যন্ত বড় একটা ইচ্ছে আছে ওকে দেখব। রানাঘাটে অমন লোক আসবে—’
রায়বাহাদুর বাকিটুকু জোগাইয়া বলিলেন,—”স্বপ্নের অগোচর! তাই না মিনু? টিকিটের দাম দিয়ে দাও মেয়েকে, ওহে নীরেন।”
মীনা এবার সাহস পাইয়া বলিল,—’’আপনাকে আর বাবাকে যেতে হবে আমাদের নিয়ে। সে শুনছিনে। বাবার মনে মনে ইচ্ছে আছে জ্যাঠামশায়। শুধু আপনার ভয়ে—”।
নীরেনবাবু তাড়া দিয়া বলিলেন,—’তবেরে দুষ্টু মেয়ে—“
মীনা হাসিতে হাসিতে বাড়ির ভিতর চলিয়া গেল।
যাইবার সময় বলিয়া গেল,—”বাবা, তোমাকে যেতেই হবে আমাদের নিয়ে। ছাড়ব না বলে দিচ্ছি।”
দার্জিলিং মেলের সময় হইয়াছে। বেলা সাড়ে পাঁচটা। রা
য়বাহাদুর ও কয়েকজন ছাত্র, নীরেনবাবু ও শ্রীগোপালবাবু স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে উপস্থিত হইলেন। কিন্তু—এ কী?
এত ভিড় কীসের? প্ল্যাটফর্মের চারিদিকে এত ছোকরা ছাত্র, লোকজনের ভিড়! সত্যই কী আজ আইনস্টাইনের উপস্থিতিতে এখানকার সকলের টনক নড়িয়াছে? ইহারা সকলেই দার্জিলিং মেলের সময় আসিয়াছে তাঁহাকে নামাইয়া লইতে? অত বড়ো বৈজ্ঞানিকের উপযুক্ত অভ্যর্থনা বটে! লোকে লোকারণ্য প্ল্যাটফর্ম। হইহই কাণ্ড। রায়বাহাদুর পুলকিত হইলেন। সশব্দে মেল ট্রেন আসিয়া প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করিল।
একটি সেকেন্ড ক্লাস কামরা হইতে ছোটো একটি ব্যাগ হাতে দীর্ঘকেশ আয়তচক্ষু আইনস্টাইন অবতরণ করিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পাশের একটি ফার্স্ট ক্লাস কামরা হইতে জনৈক সুন্দরী তরুণী, পরনে দামি ভয়েল শাড়ি, পায়ে জরিদার কাশ্মীরি স্যান্ডাল—হাতে ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলাইয়া নামিয়া পড়িলেন। তরুণীর সঙ্গে আরও দুটি তরুণী, দুটিই শ্যামাঙ্গী—দুজন চাকর, তারা লাগেজ নামাইতে ব্যস্ত হইয়া পড়িল।
কে একজন বলিয়া উঠিল, ‘‘ওই যে নেমেছেন! ওই তো ইন্দুবালা দেবী—“
মুহূর্ত মধ্যে প্ল্যাটফর্মসুদ্ধ লোক সেদিকে ভাঙিয়া পড়িল। সেই ভীষণ ভিড়ের মধ্যে রায়বাহাদুর অতিকষ্টে আইনস্টাইনকে লইয়া গেটের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন।
আইনস্টাইন অত বুঝিতে পারেন নাই, তিনি ভাবিলেন তাঁহাকেই দেখিবার জন্য এত লোকের ভিড়। রায়বাহাদুরকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—”এরা সবই কী স্থানীয় ইউনিভার্সিটির ছাত্র? এদের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দেবেন না মিঃ মুখার্জি?’
রায়বাহাদুর এই উদার সরলপ্রাণ বিজ্ঞানতপস্বীর ভ্রম ভাঙাইবার চেষ্টা করিলেন।
রানাঘাটে আবার ইউনিভার্সিটি! হায়রে, এ দেশ কোন দেশ তা ইনি এখনও বুঝিতে পারেন নাই। সবই ইউরোপ নয়।
নীরেনবাবু চাহিয়া-চিন্তিয়া স্থানীয় প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী ধনী গোপাল পালেদের পুরোনো ১৯১৭ সনের মডেলের গাড়িখানি জোগাড় করিয়াছিলেন। তাহাতেই সকলে মিলিয়া চড়িয়া মিউনিসিপ্যাল হলের দিকে অগ্রসর হইলেন। গাড়িতে উঠিবার সময় দেখা গেল তখনও বহুলোকে স্টেশনের গেটের দিকে ছুটিতেছে। একজন কে বলিতেছিল,—”গাড়ি অনেকক্ষণ এসেছে, ওই দেখো লেগে আছে। প্ল্যাটফর্মে। শিগগির ছোটো।” ভিড়ের মধ্যে কে উত্তর দিলে,—”এখান দিয়েই তো বেরুবেন, আর ভিড়ের মধ্যে গিয়ে দরকার নেই। বড্ড ভিড়। ও তো চেনা মুখ। দেখলেই চেনা যাবে। কত ছবিতে দেখা আছে। সেদিনও ‘মিলন’ ফিলমে—”
আইনস্টাইন কৌতুকের সঙ্গে বলিলেন,—”এরাও ছুটেছে স্টেশনে বুঝি? ওরা জানে না যাকে দেখতে চলেছে সে তাদের সামনেই গাড়িতে উঠেছে। বেশ মজা, না? মিঃ মুখার্জি, এখানে ইউনিভার্সিটি কোন দিকে?”
সৌভাগ্যক্রমে ভিড়ের মধ্যের একটা লোক আইনস্টাইনের গাড়ির সামনে আসিয়া চাপা পড়-পড় হওয়াতে হঠাৎ ফুটব্রেক কষার কর্কশ শব্দের ও ‘এই এই ‘গেল গেল’ রবের মধ্যে তাঁহার প্রশ্নটা চাপা পড়িয়া গেল। স্টেশন ও ভিড় ছাড়াইয়া কিছুদূর অগ্রসর হইতেই মোড়ের মাথায় শ্রীগোপালবাবু ও নীরেনবাবু নামিয়া গেলেন। রায়বাহাদুর বলিলেন,—”এখুনি আসবেন তো?”
