শ্রীগোপালবাবু বিরক্তির সুরে বলিলেন,—”হ্যাঁ ভারি—আবার একটা বক্স! বড্ড টাকা দেখেছিস আমার। সেই ১৯০৩ সাল থেকে জোয়াল কাঁধে নিয়েছি, সে জোয়াল আর নামল না। কেবল টাকা দাও আর টাকা দাও—”
অপ্রসন্ন মুখে দেরাজ খুলিয়া মেয়ের হাতে একখানা দশ টাকার নোট ও কয়েকটি খুচরা টাকা ফেলিয়া দিলেন।
একটু পরে প্রতিবেশী রাধাচরণ নাগ আসিয়া বৈঠকখানায় উঁকি মারিয়া বলিলেন —”কী হচ্ছে শ্রীগোপালবাবু?”
—’’আসুন ডাক্তারবাবু, খবর কী? যাচ্ছেন তো ও-বেলা?”
“হ্যাঁ, তাই জিজ্ঞেস করতে এসেছি। আপনারা যাচ্ছেন তো?”
—”যাব বই কী। রানাঘাটের ভাগ্যে অমন কখনো হয়নি। যাওয়া উচিত নিশ্চয়।”
—’আমিও তাই বলছিলাম বাড়িতে। টাকা খরচও তো আছেই। কিন্তু এমন সুযোগ—বাড়ির সবাই ধরেছে। দিলাম দশটা টাকা বের করে। বলি বয়েস তো হল ছাপ্পান্নর কাছাকাছি, কোনদিন চোখ বুজব, তার আগে—”
—”নিশ্চয়। জীবনে ওসব শোনবার সৌভাগ্য ক-বার ঘটে? আমাদের রানাঘাটবাসীর বড়ো সৌভাগ্য যে উনি আজ এখানে আসবেন।”
—”আমিও তাই বলছিলাম বাড়িতে। বয়েস হয়ে এল, দেখে নিই, শুনে নিই —গেলই না-হয় গোটাকতক টাকা।”
—’’তা ছাড়া, অত বড়ো বিখ্যাত একজন—”
—”সে আর বলতে! আজকাল সব জায়গায় দেখুন ইন্দুবালা দেবী, সাবানের বিজ্ঞাপনে ইন্দুবালা, গন্ধতেলের বিজ্ঞাপনে ইন্দুবালা, শাড়ির বিজ্ঞাপনে ইন্দুবালার ছবি! তাকে চোখে দেখবার সৌভাগ্য—বিশেষ করে রানাঘাটের মতো এঁদোপড়া জায়গায়—সৌভাগ্য নয়? নিশ্চয় সৌভাগ্য!”
শ্রীগোপালবাবু হাঁ করিয়া নাগ মহাশয়ের দিকে চাহিয়া রহিলেন, প্রথমটা তাঁর মুখ দিয়া কোনো কথা বাহির হইল না। ঝাড়া মিনিট-দুই পরে আমতা আমতা করিয়া বলিলেন,—”আমি কিন্তু সে-কথা বলছিনে। আমি বলছি সায়েবের লেকচারের কথা, মিউনিসিপ্যাল হলে।’
রাধাচরণবাবু ভুরু কুঁচকাইয়া বলিলেন,-”কোন সায়েব?”
—”কেন, আপনি জানেন না? আইনস্টাইন—মিঃ আইনস্টাইন!’’
রাধাচরণবাবু উদাসীন সুরে হঠাৎ মনে পড়িয়া যাওয়ার ভঙ্গিতে বলিলেন, —”ও, সেই জার্মান না ইটালিয়ান সায়েব? হ্যাঁ—শুনেছি, আমার জামাই বলছিল। কী বিষয়ে যেন লেকচার দেবে? তা ওসব আর আমাদের এ বয়সে—লেখাপড়ার বালাই অনেকদিন ঘুচিয়ে দিয়েছি। ওসব করুকগে কলেজের ইস্কুলের ছেলে ছোকরারা—হ্যাঁঃ!”
শ্রীগোপালবাবু ক্ষীণ প্রতিবাদের সুরে কি বলিতে যাইতেছিলেন, রাধাচরণবাবু পুনরায় বলিলেন—”তা আপনি কী করবেন শুনি?”
“আমার বাড়ির মেয়েরা তো যাচ্ছে সিনেমায়। তবে আমাকে যেতেই হবে সায়েবের বক্তৃতায়। রায়বাহাদুর নীলাম্বরবাবু এসে খুব ধরাধরি করছেন”—
—”কে রায়বাহাদুর? নীলাম্বরবাবু কে?’
—”কৃষ্ণনগর কলেজের প্রোফেসর। তাঁরই উদ্যোগে সব হচ্ছে। তিনি এসেঃবিশেষ—
রাধাচরণবাবু চোখ মিটকি মারিয়া বলিলেন—’আরে ভায়া, একটা কথা বলি শোনো। একটা দিন চলো দেখে আসা যাক। ছবির ইন্দুবালা আর জ্যান্ত ইন্দুবালাতে অনেক ফারাক। ইহজীবনে একটা কাজ হয়ে যাবে। ওসব সায়েব টায়েব ঢের দেখা হয়েছে। দু-বেলা রানাঘাটে ইস্টিশানে দাঁড়িয়ে থাকা দার্জিলিং মেল শিলং মেলের সময়ে—দেখো না কত সায়েব দেখবে। কিন্তু ভায়া এ সুযোগ–বুঝলে না?”
শ্রীগোপালবাবু অন্যমনস্কভাবে বলিলেন,—”তা—তা—কিন্তু, তবে রায়বাহাদুরকে কথা দেওয়া হয়েছে কিনা, তিনি কী মনে করবেন—”।
রাধাচরণবাবু মুখ বিকৃত করিয়া খিঁচাইবার ভঙ্গিতে বলিলেন, “হ্যাঁঃ! কথা দেওয়া হয়েছে রায়বাহাদুরকে! ভারি রায়বাহাদুর! এত কী ওবলিগেশন আছে রে বাবা! বলো এখন, বাড়ির মেয়েরা সব গেল তাই আমায় যেতে হল। তারা ধরে বসল তা এখন কী করা। বলি কথাটা তো নিতান্ত মিথ্যে কথাও নয়!”
শ্রীগোপালবাবু অন্যমনস্কভাবে বলিলেন—”তা—তা—তা তো বটেই।সে কথাতো—”
রাধাচরণবাবু বলিলেন,-”রায়বাহাদুর এলে বলো এখন তাই। তাঁকেও অনুরোধ করো না বাণী সিনেমায় যেতে।–”
—’চললেন?”
-–”চলি। ওবেলা আসব ঠিক সময়ে।”
রায়বাহাদুর স্থানীয় জমিদার নীরেন চাটুয্যের বাড়িতে বসিয়া সভা সম্বন্ধে পরামর্শ ও আয়োজন করিতেছিলেন।
নীরেনবাবু রায়বাহাদুরের মাসতুতো ভাই, স্থানীয় জমিদার ও উকিল। উকিল হিসাবে হয়তো তেমন কিছু নয়, কিন্তু জমিদারির আয় ও পূর্বপুরুষ সঞ্চিত অর্থে রানাঘাটের মধ্যে অনেকেই তাঁহার সঙ্গে পারিয়া উঠেন না। শিক্ষিত লোকও বটে।
রায়বাহাদুর গুরুভোজন করিয়া উঠিয়াছেন মধ্যাহ্নে। ধনী মাসতুতো ভাই-এর বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজন রীতিমতো গুরুতর। দু-একবার নিদ্রাকর্ষণ হইতেও ছিল, কিন্তু কর্তব্যের খাতিরে শুইতে পারেন নাই।
নীরেনবাবু বলিলেন,-”আচ্ছা দাদা, বক্তৃতায় মোটকথাটা কী হবে আজকের?”
—”তা ঠিক জানিনে। On the unity of forces এই বিষয়বস্তু। এ থেকে ধরে নাও।”
—”উনি Space-এর অবস্থা শোচনীয় করে তুলেছেন, কী বলুন?”
—’অর্থাৎ?”
—’space বলছেন সীমাবদ্ধ। আগেকার মতো অসীম অনন্ত space আর নেই।”
—”তোমার ম্যাথমেটিকস ছিল এম. এসসি.-তে? Geometry of Hyperspaces পড়েছ?
—”মিক্সড ম্যাথমেটিকস ছিল। আপনি যা বলছেন, তা আমি জানি।”
-খুব খুশি হলুম দেখে নীরেন যে শুধু জমিদারি করো না, জগতের বড়ো বড়ো বিষয়ে একটু-আধটু সন্ধান রাখখা। খুব বেশি সন্ধান হয়তো নয়, তবুও The very little that you know is unknown to many”.
—’আচ্ছা দাদা, উনি কি আজই চলে যাবেন?”
—”সম্ভব। দার্জিলিং যাবেন বলছিলেন। দার্জিলিঙের পথে এখানে নামবেন। যাতে ওঁর দু-পয়সা হয়, সেদিকে আমাদের বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে।’
