শ্রীগোপালবাবু কী বলিলেন ভালো বোঝা গেল না। নীরেনবাবু বলিলেন, “ওখানে ওদের পৌঁছে দিয়েই আসছি। আর কেউ বাড়িতে লোক নেই মেয়েদের নিয়ে যেতে। টিকিটে এতগুলো টাকা যখন গিয়েছে—“
ওই সামনেই মিউনিসিপ্যাল হল। স্টেশনের কাছেই। কিন্তু এ কী? সাড়ে পাঁচটা সময় দেওয়া ছিল। পৌঁনে ছ-টা হইয়াছে, কেউ তো আসে নাই। জনপ্রাণী নয়। কেবল মিউনিসিপ্যাল অফিসের কেরানি জীবন ভাদুড়ি একটা ছোটো টেবিলে অনেকগুলি টিকিট সাজাইয়া শ্রোতাদের কাছে বিক্রয়ের জন্য অপেক্ষা করিতেছে।
মোটর হলের সামনে আসিয়া দাঁড়াইতে আইনস্টাইনের হাত ধরিয়া নামাইলেন রায়বাহাদুর। মুখে হাসি ফুটাইবার চেষ্টা করিয়া বলিলেন,—”হে বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠ, সুস্বাগতম। আমাদের রানাঘাটের মাটিতে আপনার পদার্পণের ইতিহাস সুবর্ণ অক্ষরে অক্ষয় হয়ে বিরাজ করুক—আমরা রাণাঘাটবাসীরা আজ ধন্য!”
চকিত ও উদবিগ্ন দৃষ্টিতে শূন্যগর্ভ হলের দিকে চাহিয়া দেখিলেন সঙ্গে সঙ্গে। লোক কই? রানাঘাটবাসীদের অন্যান্য প্রতিনিধিবর্গ কোথায়?
আইনস্টাইন বিস্মিত দৃষ্টিতে জনশূন্য হলের দিকে চাহিয়া বলিলেন,—”এখনও আসেনি কেউ? সব স্টেশনে ভিড় করছে। মিঃ মুখার্জি, একটা ব্ল্যাকবোর্ডের ব্যবস্থা করতে হবে যে। বক্তৃতার সময় ব্ল্যাকবোর্ডে আঁকবার দরকার হবে।”
আর ব্ল্যাকবোর্ড! রায়বাহাদুর স্থানীয় ব্যক্তি। নাড়িজ্ঞান আছে এ জায়গার। তিনি শূন্য ও হতাশ দৃষ্টিতে চারিদিকে চাহিতে লাগিলেন।
জীবন ভাদুড়ি কাছে আসিয়া চুপি চুপি বলিল,-”মোটে তিন টাকার বিক্রি হয়েছে। তাও টাকা দেয়নি এখন। কী করব বলুন সার? আমাকে কতক্ষণ থাকতে হবে বলুন। আমার আবার বাসার ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বাণী সিনেমায় যেতে হবে। কলকাতা থেকে ইন্দুবালা এসেছেন—বাড়িতে বড্ড ধরেছে সব। পঁয়ত্রিশ টাকা মোটে মাইনে—তা বলি, থাক গে, কষ্ট তো আছেই। এঁদের মতো লোকে রোজ কলকাতা থেকে আসবেন না। যাক, পাঁচ টাকা খরচ হলে আর কি করছি বলুন। আমায় একটু ছুটি দিতে হবে সার। এ সায়েব কে? এ সায়েবের লেকচারে আজ লোক হবে না—কে আজ এখানে আসবে সার!”
জীবন ভাদুড়ি ক্যাশ বুঝাইয়া দিয়া খসিয়া পড়িল। হলের মধ্যে দেখা গেল চেয়ার বেঞ্চির জনহীন অরণ্যে মাত্র দুটি প্রাণী—আইনস্টাইন ও রায়বাহাদুর।
আইনস্টাইন ব্যাগ খুলিয়া কী জিনিসপত্র টেবিলের উপর সাজাইতে ব্যস্ত ছিলেন, সেগুলি তাঁহার বক্তৃতার সময় প্রয়োজন হইবে—সেই সুযোগে রায়বাহাদুর একবার বাহিরে গিয়া রাস্তার এদিক-ওদিক উদবিগ্নভাবে চাহিতে লাগিলেন।
লোকজন যাইতেছে, ঘোড়ার গাড়িতে মেয়েরা সাজগোজ করিয়া চলিয়াছে, দ্রুতপদে পথিকদল ছুটিয়াছে—সব বাণী সিনেমা লক্ষ্য করিয়া।
রায়বাহাদুরের একজন পরিচিত উকিলবাবু ছড়িহাতে দ্রুতপদে জনসাধারণের অনুসরণ করিতেছিলেন, রায়বাহাদুরকে দেখিতে পাইয়া বলিলেন,—”এই যে! সাহেব এসেছেন? লোকজন কেমন হয়েছে ভেতরে? আজ আবার আনফরচুনেটলি ওটার সঙ্গে ক্ল্যাশ করল কিনা? অন্যদিন হলে—না, আমার জো নেই—বাড়ির মেয়েরা সব গিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে কেউ নেই। বাধ্য হয়ে আমাকে—কাজেই—’
রায়বাহাদুর মনে মনে বলিলেন—হ্যাঁ, নিতান্ত অনিচ্ছা সত্বেও।
আধ ঘণ্টা কাটিয়া গেল। সাড়ে ছটা। পৌঁনে সাতটা। সাতটা।
জনপ্রাণী নাই। বাণী সিনেমাগৃহ লোকে লোকারণ্য। টিকিট কিনিতে না-পাইয়া বহুলোক বাহিরে দাঁড়াইয়া জটলা করিতেছে। একদল জোর-জবরদস্তি করিয়া ঢুকিবার চেষ্টা করিয়া বিফলমনোরথ হইয়াছে। মেয়েদের বসিবার দুই দিকের ব্যালকনির অবস্থা এরূপ যে আশঙ্কা হইতেছে ভাঙিয়া না-পড়ে। স্টেজে যবনিকা উঠিয়াছে। চিত্রতারকা ইন্দুবালা সম্মুখে দাঁড়াইয়া গান গাহিতেছেন—তাঁরই গাওয়া ‘মিলন’ ছবির কয়েকখানি দেশবিখ্যাত, বালক বৃদ্ধ যুবার মুখে মুখে গীত গান—’জংলা হাওয়ায় চমক লাগায়’, ‘ওরে অচিন দেশের পোষা পাখি’, ‘রাজার কুমার পক্ষীরাজ’ ইত্যাদি।
এমন সময়ে রায়বাহাদুর নীলাম্বর চট্টোপাধ্যায় ভিড় ঠেলিতে ঠেলিতে টকিহলের মধ্যে প্রবেশ করিয়াই সম্মুখে শ্রীগোপালবাবুকে দেখিয়া বিস্মিত হইলেন। পাশেই অদূরে নীরেনবাবু বসিয়া। বলিলেন—”বা রে, আপনিও এখানে!”।
হঠাৎ ধরাপড়া চোরের মতো থতমতো খাইয়া মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে শ্রীগোপালবাবু বলিলেন—’’আসার ইচ্ছে ছিল না, কী করি, কী করি—মেয়েরা— ওদের আনা—ইয়ে—সাহেবের লেকচার কেমন হল? লোকজন হয়নি?”
—”কী করে হবে? আপনারা সবাই এখানে। লোক কে যাবে?”
—”সায়েব কোথায়? চলে গেলেন?”
—”এই যে—”
রায়বাহাদুরের পিছনেই দাঁড়াইয়া স্বয়ং আইনস্টাইন।
শ্রীগোপালবাবু শশব্যস্তে উঠিয়া আইনস্টাইনের হাত ধরিয়া খাতির করিয়া নিজের চেয়ারে বসাইলেন।
একটি খবরের কাগজের কাটিং রাখিয়াছিলাম। সেটি এখানে জানাইয়া দেওয়া গেল—
এখানে আলুর দর ক্রমেই বাড়িয়া চলিয়াছে। ধানের দর কিছু কমের দিকে। ম্যালেরিয়া কিছু কিছু দেখা দিয়াছে। স্থানীয় সুযোগ্য সাবডিভিশনাল অফিসার মহোদয়ের চেষ্টায় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মচারীদের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট হইয়াছে।
গত সপ্তাহে স্থানীয় বাণী সিনেমা গৃহে সুপ্রসিদ্ধ চিত্রতারকা ইন্দুবালা দেবী শুভাগমন করেন। নৃত্যকলা-নৈপুণ্যে ও কিন্নরকণ্ঠের সংগীতে তিনি সকলের মনোহরণ করিয়াছেন। বিশেষত ‘কালো বাদুড় নৃত্যে তিনি যে উচ্চাঙ্গের শিল্প সংগতি প্রদর্শন করিয়াছেন, রানাঘাটবাসীগণ তাহা কোনোদিন ভুলিবে না। এই উপলক্ষ্যে উক্ত সিনেমাগৃহে অভূতপূর্ব জনসমাগম হইয়াছিল—সেও একটি দেখিবার মতো জিনিস হইয়াছিল বটে। লোকজনের ভিড়ে মেয়েদের ব্যালকনির নীচে বরগা দুমড়াইয়া গিয়াছিল। ঠিক সময়ে ধরা পড়াতে একটি দুর্ঘটনার হাত হইতে সকলে বাঁচিয়া গিয়াছেন।
