বৃদ্ধ মোক্তার অভয়বাবু বলিলেন, “কী নামটি বললেন মশাই সাহেবের? আ —কী? আইন স্টাই—ন? বেশ বেশ। হাঁ, বিখ্যাত নাম। সবাই জানে সবাই চেনে। ওঁরা হলেন গিয়ে স্বনামধন্য পুরুষ—নাম শোনা আছে বই কী।”
রায়বাহাদুর রাগে ফুলিয়া মনে মনে বলিলেন—তোমার মুণ্ডু শোনা আছে, ড্যাম ওল্ড ইডিয়ট! এ তুমি কাপুড়ে মহাজন শ্যামচাঁদ পালকে পেয়েছ? স্বনামধন্য! তিনজন্ম কেটে গেলে যদি এ নাম তোর কানে পৌঁছায়। মিথ্যে সাক্ষী শিখিয়ে তো
জন্ম খতম করলি, এখন আইনস্টাইনকে বলতে এসেছে স্বনামধন্য পুরুষ! ইডিয়োসির একটা সীমা থাকা চাই।
নির্দিষ্ট দিনে রায়বাহাদুর কৃষ্ণনগর কলেজের কয়েকটি ছাত্র সঙ্গে লইয়া সকালের ট্রেনে রানাঘাটে নামিলেন। তাঁর শালা বিনোদ চৌধুরী দুঃখ করিয়া চিঠি লিখিয়াছে, বিশেষ কার্যবশত তাহার আসা সম্ভব হইল না, আইনস্টাইনের বক্তৃতা শোনা কী সকলের ভাগ্যে ঘটে, ইত্যাদি। সেজন্য রায়বাহাদুরের মনে দুঃখ ছিল, ছোকরা সত্যিকার পণ্ডিত লোক, আজকার এমন সভায় বেচারির আসিবার সুযোগ মিলিল না। ভাগ্যই বটে।
রানাঘাট স্টেশনের বাহিরে আসিয়া সম্মুখের প্রাচীরে নজর পড়িতে রায়বাহাদুর থমকিয়া দাঁড়াইয়া গেলেন। এ কী ব্যাপার! প্রাচীরের গায়ে লটকানো ঢাউস এক দুই-তিন-রঙা বিজ্ঞাপন। তাতে লেখা আছে…
বাণী সিনেমা গৃহে (নীল)
আসিতেছেন! আসিতেছেন!! (কালো)
আসিতেছেন!!! (কালো)
কে?? (কালো)
কবে?? (কালো)
সু প্রসিদ্ধি চিত্রতার কা ইন্দুবালা দেবী (লাল)
অদ্য রবিবার ২৭শে কার্তিক সন্ধ্যা ৫৷৷ টায় (নীল)
জনসাধারণকে অভিবাদন করিবে!! (কালো)
প্রবেশমূল্য ৫, ৩, ২ ও ১ টাকা (কালো)
মহিলাদের ৫ ও২ টাকা (কালো)
এমন সুযোগ কেহ হেলায় হারাইবেন না। (লাল)
কী সর্বনাশ!
রায়বাহাদুর রুমাল বাহির করিয়া কার্তিক মাসের শেষের দিকের সকালেও কপালের ঘাম মুছিলেন। তাহার পর একবার ভালো করিয়া পড়িলেন তারিখটা। না, আজই। আজ রবিবার ২৭শে কার্তিক।
অন্যমনস্কভাবে কিছুদূর অগ্রসর হইয়া দেখিলেন আর একখানা সেই বিজ্ঞাপন। ক্রমে যতই যান, সর্বত্রই সেই তিনরঙা বিজ্ঞাপন। মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান মহাশয়ের বাড়ি পর্যন্ত যাইতে অন্তত ছত্রিশখানা সেই বিজ্ঞাপন আটা দেখিলেন বিভিন্ন স্থানে।
ভাইস-চেয়ারম্যান শ্রীগোপালবাবু ফুলবাগানের সামনে ছোটো বারান্দায় বসিয়া তেল-ধুতি পরনে তেল মাখিতেছিলেন। রায়বাহাদুরকে দেখিয়া ভালো হইয়া বসিলেন। হাসিয়া বলিলেন—”খুব সৌভাগ্য দেখছি। এত সকালে যে? — নমস্কার!”
—’নমস্কার, নমস্কার! স্নানের জন্যে তৈরি হচ্ছেন? ছুটির দিনে এত সকালে যে?”
—”আজ্ঞে হ্যাঁ, স্নানটা সকালেই করি।”
—”বাড়িতে?”
—”আজ্ঞে না, চুর্ণীতে যাই। ডুব দিয়ে স্নান না-করলে—অভ্যেস সেই ছেলেবেলা থেকেই। বসুন, বসুন। আজ যখন এসেছেন তখন দুপুরে গরিবের বাড়িতেই দুটো ডাল-ভাত—”
—”সেজন্য কিছু না। নো ফরম্যালিটি। আমার মাসতুতো ভাই নীরেনের ওখানে–গেলে রাগ করবে। সেবার তো যাওয়াই হল না।’’
—’’তাহলে চা চলবে তো?”
—’’তাতে আপত্তি নেই। সে হবে এখন। আসলে যে জন্যে আসা—তা এ এক কী হাঙ্গামা দেখছি? কে ইন্দুবালা দেবী আসছে বাণী সিনেমাতে আজই।”
—হ্যাঁ, তাই তো দেখছিলাম বটে।”
—”দিন বুঝে আজই?”
—”তাই তো—আমিও তাই ভাবছিলাম। ক্ল্যাশ করবে কিনা?”
—”এখন তো আমরা দিন বদলাতে পারি না। সব ঠিকঠাক। আমাদেরও হ্যান্ডবিল বিলি, বিজ্ঞাপন বিলি, সব হয় গিয়েছে। আইনস্টাইন আসবেন এই দার্জিলিং মেলে।”
—”আমিও তো ভেবেছি। তাই তো—”
—“তবে আমার কী মনে হয় জানেন? যারা সিনেমাতে ইন্দুবালাকে দেখতে যাবে, তারা সাহেবদের লেকচার শুনতে আসবে না। সাহেবদের সভায় যারা আসবে, তারা ঠিকই আসবে।”
আইনস্টাইনকে ‘সাহেব’ বলিয়া উল্লেখ করাতে রায়বাহাদুর মনে মনে চটিয়া গেলেন। এমন জায়গাতেও তিনি আনিতে চলিয়াছেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইনকে! এ কী পাট কলের ম্যানেজার, না রেলের টি. আই. যে ‘সাহেব’ ‘সাহেব’ করবি? বুঝেসুঝে কথা বলতে হয় তো!
মুখে বলিলেন,-”হ্যাঁ, তা বটে।”
ভাইস-চেয়ারম্যান শ্রীগোপালবাবু তাঁর অমায়িক আতিথেয়তার জন্যে রানাঘাটে প্রসিদ্ধ। চা আসিল, সঙ্গে এক রেকাবি খাবার আসিল। রায়বাহাদুর চা-পানান্তে আরও নানা স্থানে ঘুরিবেন বলিয়া বাহির হইলেন। অনেকের সঙ্গে দেখা করিতে হইবে, অনেক কিছু ঠিক করিতে হইবে।
যাইবার সময় বলিলেন—”মিউনিসিপ্যাল হলের চাবিটা—”।
শ্রীগোপালবাবু বলিলেন—’’আমাদের হলের চাকর রাজনিধিকে এখনই পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমার বাসার চাকরও যাবে। ওরা হল খুলে সব ঠিক করবে। সেখানে ফ্রি রিডিং রুম আছে, সকালে আজ ছুটির দিন খবরের কাগজ পড়তে লোকজন আসবে। তাদের মধ্যে যারা ছেলে–ছোকরা তাদের ধরে চেয়ার বেঞ্চি সাজিয়ে নিচ্ছি। কিছু ভাববেন না।”
শ্রীগোপালবাবু স্নান করিয়া বাড়ির মধ্যে ঢুকিতেই তাঁহার বড়ো মেয়ে (শ্রীগোপালবাবু আজ তিন বৎসর বিপত্নীক, বড়ো মেয়েটি শ্বশুরবাড়ি হইতে আসিয়াছে, সে-ই সংসার দেখাশোনা করে) বলিল—”বাবা, আমাদের পাঁচখানা টিকিট করে এনে দাও।”
—”কীসের টিকিট?”
—”বা রে, বাণী সিনেমায় ও-বেলা ইন্দুবালা আসছে—নাচ-গান হবে। সবাই যাচ্ছে আমাদের পাড়ার।”
—”কে যাচ্ছে?”
—”সবাই! এই মাত্তর রানু, অলকা, টেপি যতীন কাকার মেয়ে চেঁড়স—এরা এসেছিল। ওরা সব বক্স নিচ্ছে একসঙ্গে—বক্স নিলে মেয়েদের আড়াই টাকা করে রিজার্ভ টিকিট দিচ্ছে। আমাদের জন্যে একটা বক্স নাও।”
