মুখে গম্ভীর তেজস্বিতার ভাব দেখিয়া সভয়ে প্রশ্ন করিলাম, “কি দাদা?”
“গৌরীদান করব স্থির করেছি, তোমার রাণুর কত বয়স হল?”
বয়স না বলিয়া বিস্মিতভাবে বলিলাম, “সে কি দাদা! এ যুগে—”
দাদা সংযত অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বলিলেন, “যুগের ‘এ’ আর ‘সে’ নেই শৈলেন, ওইখানেই তোমরা ভুল করা কাল এক অনন্তব্যাপী অখণ্ড সত্তা, এবং যে শুদ্ধ সনাতনধর্ম সেই কালকে—
একটু অস্থির হইয়া বলিলাম, “কিন্তু দাদা, ও যে এখনও দুগ্ধপোষ্য শিশু।”
দাদা বলিলেন, “এবং শিশুই থাকবে ও, যতদিন তোমরা বিবাহবন্ধনের দ্বারা ওর আত্মার সংস্কার ও পূর্ণ বিকাশের অবসর করে না দিচ্ছ! এটা তোমায় বোঝাতে হলে আগে আমাদের শাস্ত্রকাররা—
অসহিষ্ণুভাবে বলিলাম, “সে তো বুঝলাম, কিন্তু ওর তো এই সবে আট বছর পেরুল দাদা, ওর। শরীরই বা কতটুকু আর তার মধ্যে ওর আত্মাই বা কোথায়, তা তো বুঝতে পারি না! আমার কথা হচ্ছে—
দাদা সেদিকে মন না দিয়া নিরাশভাবে বলিলেন, “আট বৎসর পেরিয়ে গেছে! তা হলে আর কই হল শৈলেন?মনু বলেছেন, ‘অষ্টবর্ষা ভবেদগৌরী নববর্ষেতুরোহিণী’—জানি অতবড় পুণ্যকর্ম কি আমার হাত দিয়ে সমাধান হবে! ছোটটার বয়স কত হল?”
রাণুর ছোট রেখা পাঁচ বৎসরের। দাদা বয়স শুনিয়া মুখটা কুঞ্চিত করিয়া একটু মৌন। রহিলেন। পাঁচ বৎসরের কন্যাদানের জন্য কোন একটা পুণ্যফলের ব্যবস্থা না করিয়া যাওয়ার জন্য মনুর উপরই চটিলেন, কিংবা অত পিছাইয়া জন্ম লওয়ার জন্য রেখার উপরই বিরক্ত হইলেন, বুঝিতে পারিলাম না। কিছুক্ষণ নীরব থাকিয়া একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া সে স্থান ত্যাগ করিলেন আমিও আমার রুদ্ধশ্বাসটা মোচন করিলাম। মনে মনে কহিলাম, “যাক, মেয়েটার একটা ফাঁড়া গেলা।”
দুই দিন পরে দাদা ডাকিয়া পাঠাইলেনা উপস্থিত হইলে বলিলেন, “আমি ও-সমস্যাটুকুর এক রকম সমাধান করে ফেলেছি শৈলেন। অর্থাৎ তোমার রাণুর বিবাহের কথাটা আর কি। ভেবে দেখলাম, যুগধর্মটা একটু বজায় রেখে চলাই ভাল বইকি—
আম হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিলাম, হর্ষের সহিত বলিলাম, “নিশ্চয়, শিক্ষিত সমাজে কোথায় ষোল সতেরো বছরে বিবাহ চলছে দাদা, এ সময় একটা কচি মেয়েকে—যার ন বছরও পুরো হয়নি— তা ভিন্ন খাটো গড়ন বলে—
“ঝাঁটা মারো তোমার শিক্ষিত সমাজকে! আমি সে কথা বলছি না। বলছিলাম যে, যদি এই সময়ই রাণুর বিয়ে দিই, তা মন্দ কি? বেশ তো, যুগধর্মটাও বজায় রইল, অথচ ওদিকে গৌরীদানেরও খুব কাছাকাছি রইল। ক্ষতি কি? এটা হবে যাকে বলতে পারা যায়, মডিফায়েড গৌরীদান আর কি!”
আমি একেবারে থ হইয়া গেলাম। কি করিয়া যে দাদাকে বুঝাইব, কিছুই ঠিক করিয়া উঠিতে পারিলাম না।
দাদা বলিলেন, “পণ্ডিত মশায়েরও মত আছে। তিনি অনেক ঘাটাঘাঁটি করে দেখে বললেন, কলিতে এইটিই গৌরীদানের সমফলপ্রসূ হবো”
আমি দুঃখ ও রাগ মিটাইবার একটা আধার পাইয়া একটু উষ্মর সহিত বলিলাম, “পণ্ডিত মশায় তা হলে একটা নীচ মিথ্যা কথা আপনাকে বলেছেন দাদা, আপনি সন্তুষ্ট হলে উনি এ কথাও বোধ হয় শাস্ত্র ঘেঁটেই বলে দেবেন যে, মেয়েকে হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দিলেও আজকাল গৌরীদানের ফল হবার কথা কলিযুগটা তো ওঁদের কক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যখন যে বিধানটা চাইবেন, পাকা ফলের মত টুপ করে হাতে এসে পড়বে।”
দুইজনেই কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিলাম। আমিই কথা কহিলাম, “যাক, ওঁরা বিধান দেন, দিন বিয়ে। আমি এখন আসি, একটু কাজ আছে।”
আসিবার সময় ঘুরিয়া বলিলাম, “হ্যাঁ, শরীরটা খারাপ বলে ভাবছি, মাস চারেক একটু পশ্চিমে গিয়ে কাটাব হপ্তাখানেকের মধ্যে বোধ হয় বেরিয়ে পড়তে পারব।”—বলিয়া চলিয়া আসিলাম
অভিমানের সাহায্যে ব্যাপারটা মাস তিন-চার কোন রকমে ঠেকাইয়া রাখিলাম, কিন্তু তাহার পর দাদা নিজেই এমন অভিমান শুরু করিয়া দিলেন যে, আমারই হার মানিতে হইল। ‘ধর্মের পথে অন্তরায় হইবার বয়স এবং শক্তি বাবার তো ছিলই না, তবুও নাতনীর মায়ায় তিনি দোমনা। হইয়া কিছুদিন আমারই পক্ষে রহিলেন, তারপর ক্রমে ক্রমে ওই দিকেই ঢলিয়া পড়িলেনা আমি বেখাপ্পা রকম একলা পড়িয়া গিয়া একটা মস্তবড় ধর্মদ্রোহীর মত বিরাজ করিতে লাগিলাম।
রাণুকে ঢালোয়া ছুটি দিয়া দিয়াছি। মায়াবিনী অচিরেই আমাদের পর হইবে বলিয়া যেন ক্ষুদ্র বুকখানির সমস্তটুকু দিয়া আমাদের সংসারটি জড়াইয়া ধরিয়াছে। পারুক, না পারুক—সে সমস্ত কাজেই আছে এবং যেটা ঠিকমত পারে না, সেটার জন্য এমন একটা সঙ্কোচ এবং বেদনা আজকাল তাহার দেখিতে পাই, যাহাতে সত্যই মনে হয়, নকলের মধ্যে দিয়া মেয়েটার এবার আসল গৃহিণীপনার ছোঁয়াচ লাগিয়াছে। অসহায় মেজকাকাটি তো চিরদিনই তাহার একটা বিশেষ পোষ্য ছিলই আজকাল আবার প্রথম ভাগ বিবর্জিত সুপ্রচুর অবসরের দরুন একেবারে তাহার কোলের শিশুটিই হইয়া পড়িয়াছে বলিলে চলে।
সময় সময় গল্পও হয় আজকাল বিয়ের গল্পটা হয় বেশি অন্যের সঙ্গে এ বিষয় লইয়া আলোচনা করিতে রাণু ইদানীং লজ্জা পায় বটে, কিন্তু আমার কাছে কোন দ্বিধা-কুণ্ঠাই আসিবার অবসর পায় না তাহার কারণ আমাদের দুইজনের মধ্যে সমস্ত লঘুত্ব বাদ দিয়া গুরুগম্ভীর সমস্যাবলীর আলোচনা চলিতে থাকে। বলি, “তা নয় হল রাণু, তুমি মাসে দুবার করে শ্বশুরবাড়ি থেকে এসে আমাদের সংসারটা গুছিয়ে দিয়ে গেলো আর সবই করলে, কিন্তু তোমার মেজকাকাটির কি বন্দোবস্ত করছ?”
