রাণু বিমর্ষ হইয়া ভাবে বলে, “আমরা সব বলে বলে তো হয়রান হয়ে গেলাম মেজকা যে, বিয়ে কর, বিয়ে করা তা শুনলে গরিবদের কথা? রাণু কি তোমার চিরদিনটা দেখতে-শুনতে পারবে মেজকা? এর পর তার নিজের ছেলেপুলেও মানুষ করতে হবে তো? মেয়ে আর কতদিন নিজের বল?”
তোতাপাখির মত, কচি মুখে বুড়োদের কাছে শেখা বুলি শুনিয়া হাসিব কি কাঁদিব, ঠিক করিতে পারি না বলি “আচ্ছা, একটা গিন্নীবান্নী কনে দেখে এখনও বিয়ে করলে চলে না?কি বল তুমি?”
এই বাঁধা কথাটি তাহার ভাবী শ্বশুরবাড়ি লইয়া একটি ঠাট্টার উপক্রমণিকা। রাণু কৃত্রিম অভিমানের সহিত হাসি মিশাইয়া বলে, “যাও মেজকা, আর গল্প করব না তুমি ঠাট্টা করছ।”
আমি চোখ পাকাইয়া বিপুল গাম্ভীর্যের সহিত বলি, “মোটেই ঠাট্টা নয় রাণু তোমার শাশুড়ীটি বড্ড গিন্নী শুনেছি, তাই বলছিলাম, যদি বিয়েই করতে হয়—”
রাণু আমার মুখের দিকে রাগ করিয়া চায় এবং শেষে হাসিয়া চায়। কিছুতেই যখন আমার মুখের অটল গাম্ভীর্য বদলায় না, তখন প্রতারিত হইয়া গুরুত্বের সহিত বলে, “আচ্ছা, আমি তাহলে—না মেজকা, নিশ্চয় ঠাট্টা করছ, যাও
আমি চোখ আরও বিস্ফারিত করিয়া বলি, “একটুও ঠাট্টা নেই এর মধ্যে রাণু সব কথা নিয়ে কি আর ঠাট্টা চলে মা?”
রাণু তখন ভারিক্তে হইয়া বলে, “আচ্ছা, তা হলে আমার শাশুড়ীকে একবার বলে দেখব’খন, আগে যাই সেখানে তিনি যদি তোমায় বিয়ে করতে রাজী হন তো তোমায় জানাব’খন তার জন্যে ভাবতে হবে না” তাহার পর কৌতুকদীপ্ত চোখে চাহিয়া বলে, “আচ্ছা মেজকা, পেরথোম ভাগ তো শিখি নি এখনও—কি করে তোমায় জানাব বল দিকিন, তবে বুঝব হ্যাঁ—
আমি নানান রকম আন্দাজ করি বিজয়িনী ঝাঁকড়া মাথা দুলাইয়া হাসিয়া বলে, “না হল না— ককখনও বলতে পারবে না, সে বড় শক্ত কথা।”
এই সব হাসি তামাসা গল্পগুজব হঠাৎ মাঝখানেই শেষ হইয়া যায় রাণু চঞ্চলতার মাঝে হঠাৎ গম্ভীর হইয়া বলে, “যাক, সে পরের কথা পরে হবে যাই, তোমার চা হল কি না দেখিগে।” কিংবা
—”যাই, গল্প করলেই চলবে না, তোমার লেখার টেবিলটা আজ গুছোতে হবে, একডাঁই হয়ে রয়েছে—” ইত্যাদি।
এই রকম ভাবে রাণুকে নিবিড় হইতে নিবিড়তর ভাবে আমার বুকের মধ্যে আনিয়া দিতে দিতে বিচ্ছেদের দিনটা আগাইয়া আসিতেছে।
বুঝিবা রাণুর বুকটিতেও এই আসন্ন বিচ্ছেদের বেদনা তাহার অগোচরে একটু একটু করিয়া ঘনাইয়া উঠিতেছে। কচি সে, বুঝিতে পারে না কিন্তু যখনই আজকাল ছুটি পাইলে নিজের মনেই স্লেট ও প্রথম ভাগটা লইয়া হাজির হয়, তখনই বুঝিতে পারি, এ আগ্রহটা তাহার কাকাকে সান্ত্বনা দেওয়ারই একটা নূতন রূপ কেন না, প্রথম ভাগ শেখার আর কোন উদ্দেশ্য থাক আর না-থাক, ইহার উপরই ভবিষ্যতে তাহার কাকার সমস্ত সুখ-সুবিধা নির্ভর করিতেছে—রাণুর মনে এ ধারণাটুকু বদ্ধমূল হইয়া গিয়াছে। এখন আর একেবারেই উপায় নাই বলিয়া তাহার শিশুমনটি ব্যথায় ভরিয়া উঠে প্রবীণার মত আমায় তবুও আশ্বাস দেয়, “তুমি ভেবো না মেজকা, তোমার পেরথোম ভাগনা শেষ করে আমি ককখনও শ্বশুরবাড়ি যাব না নাও, বলে দাও।”
পড়া অবশ্য এগোয় না। বলিয়া দিব কি, প্রথম ভাগটা দেখিলেই বুকে যেন কান্না ঠেলিয়া উঠো আবার প্রতিদিনই গৌরীদানের বর্ধমান আয়োজন বাড়ির বাতাসে আমার হাঁফ ধরিয়া উঠো এক-একদিন মেয়েটাকে বুকে চাপিয়া ধরি, বলি, “আমাদের কোন দোষে তুই এত শিগগির পর হতে চললি রাণু?”
বোঝে না, শুধু আমার ব্যথিত মুখের দিকে চায়। এক-একদিন অবুঝভাবেই কাঁদ-কাঁদ হইয়া। উঠে এক-একদিন জোর গলায় প্রতিজ্ঞা করিয়া বসে, “তোমার কষ্ট হয় তো বিয়ে এখন করবই না মেজকা, বাবাকে বুঝিয়ে বলব’খন।”
একদিন এই রকম প্রতিজ্ঞার মাঝখানেই সানাইয়ের করুণ সুর বাতাসে ক্রন্দনের লহর তুলিয়া বাজিয়া উঠিল। রাণু কুণ্ঠিত আনন্দে আমার মুখের দিকে চাহিয়া হঠাৎ কি রকম হইয়া গিয়া মুখটা নীচু করিল বোধ করি তাহার মেজকাকার মুখে বিষাদের ছায়াটা নিতান্তই নিবিড় হইয়া তখন। ফুটিয়া উঠিয়াছিল।
গৌরীদান শেষ হইয়া গিয়াছে আমাদের গৌরীর আজ বিদায়ের দিন। আমি শুভকর্মে যেগাদান করিয়া পুণ্যসঞ্চয় করিতে পারি নাই, এ-বাড়ি সে-বাড়ি করিয়া বেড়াইয়াছি। বিদায়ের সময়ে বরবধূকে আশীর্বাদ করিতে আসিলাম।
দীপ্তশ্রী কিশোর বরের পাশে পট্টবস্ত্র ও অলঙ্কার-পরা, মালাচন্দনে চর্চিত রাণুকে দেখিয়া আমার তপ্ত চক্ষু দুইটা জুড়িয়া গেল। কিন্তু ও যে বড্ড কচি—এত সকালে কি করিয়া বিদায়ের কথা মুখ দিয়া বাহির করা যায়? ও কি জানে, আজ কতই পর করিয়া ওকে বিদায় দিতেছি আমরা?
চক্ষে কোঁচার খুঁট দিয়া এই পুণ্যদর্শন শিশুদম্পতিকে আশীর্বাদ করিলাম। রাণুর চিবুকটা তুলিয়া প্রশ্ন করিলাম, “রাণু, তোর এই কোলের ছেলেটাকে কার কাছে–?” আর বলিতে পারিলাম না।
রাণু শুনিয়াছি এতক্ষণ কাঁদে নাই। তাহার কারণ নিশ্চয় এই যে, সংসারের প্রবেশ-পথে দাঁড়াইতেই ওর অসময়ের গহিণীপনাটা সরিয়া গিয়া ওর মধ্যকার শিশুটি বিস্ময়ে কৌতূহলে অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিলা আমার কথার আভাসে সেই শিশুটিই নিজের অসহায়তায় আকুল হইয়া পড়িল। আমার বাহুতে মুখ লুকাইয়া রাণু উচ্ছ্বসিত আবেগে ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিয়া উঠিল।
