তবুও ক্রোধ দমন করিয়া গম্ভীরভাবে বলি, “ছাই হয়েছে। আচ্ছা, বল—অ—চ—আর ল— অচল।”
রাণু অ-র উপর হইতে আঙুলটা না সরাইয়া তিনটি অক্ষর পড়িয়া যায়। ‘অধম’ও ওই ভাবেই শেষ হয় অথচ ঝাড়া দেড়টি বৎসর শুধু অক্ষর চেনায় গিয়েছিল!
তখন জিজ্ঞাসা করিতে হয়, “কোনটা অ?”
রাণু ভীতভাবে আমার দিকে চাহিয়া আঙুলটি সরাইয়া ল-এর উপর রাখে।
ধৈর্যের সূত্রটা তখনও ধরিয়া থাকি, বলি, “হুঁ, কোনটা ল হল তা হলে?”
আঙুলটা সট করিয়া চ-এর উপর সরিয়া যায়। ধৈর্যসাধনা তখনও চলিতে থাকে, শান্তকণ্ঠে বলি “চমৎকার! আর চ?
খানিকক্ষণ স্থিরভাবে বইয়ের দিকে চাহিয়া থাকে, তার পর বলে, “চ? চ নেই মেজকা!”
সংযত রাগটা অত্যন্ত উগ্রভাবেই বাহির হইয়া পড়ে, পিঠে চাপড় কষাইয়া বলি, ‘তা থাকবে কেন? তোমার ভেঁপোমি দেখে চম্পট দিয়েছে। হতভাগা মেয়ে রাজ্যের কথার জাহাজ হয়েছেন, আর এদিকে আড়াই বৎসরে প্রথম ভাগের আড়াইটে কথা শেষ করতে পারলে না কত বুড়ো বুড়ো গাধা ঠেঙিয়ে পাস করিয়ে দিলাম, আর এই একরত্তি মেয়ের কাছে আমায় হার মানতে হল কাজ নেই আর তোর অক্ষর চিনে। সন্ধ্যে পর্যন্ত বসে বসে খালি অ—চ—আর ল—অচল অ–ধ—আর ম—অধম এই আওড়াবি। তোর সমস্ত দিন আজ খাওয়া বন্ধ।”
বিরক্তভাবে একটা খবরের কাগজ কিংবা বই লইয়া বসিয়া যাই রাণু ক্রন্দনের সহিত সুর মিশাইয়া পড়া বলিয়া যায়।
বলি বটে, সন্ধ্যা পর্যন্ত পড়িতে হইবে কিন্তু চড়টা বসাইয়াই নিশিন্ত হইয়া যাই যে, সেদিনকার পড়া ওই পর্যন্ত। রাণু এতক্ষণ চক্ষের জলের ভরসাতেই থাকে এবং অশ্রু নামিলেই সেটাকে খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজে লাগায়। কিছুক্ষণ পরে আর পড়ার আওয়াজ পাই না বলি, “কি হল?”
রাণু ক্রন্দনের স্বরে উত্তর করে, “নেই।”
“কি নেই?”–বলিয়া ফিরিয়া দেখি, চক্ষের জল ‘অচল-অধম’র উপর ফেলিয়া আঙুল দিয়া ঘষিয়া ঘষিয়া কথা দুইটা বিলকুল উড়াইয়া দিয়াছে। একেবারে নীচের দুই-তিনখানা পাতার খানিকটা পর্যন্ত।
কিংবা আঙুলের ডগায় চোখের ভিজা কাজল লইয়া কথা দুইটিকে চিরান্ধকারে ডুবাইয়া দিয়াছে এইরূপ অবস্থাতে বলে, “আর দেখতে পাচ্ছি না, মেজকা।”—এই রকম আরও সব কাণ্ড।
চড়টা মারা পর্যন্ত মনটা খারাপ হইয়া থাকে, তাহা ভিন্ন ওর ধূর্তামি দেখিয়া হাসিও পায়। মেয়েদের পড়াশুনা সম্বন্ধে আমার থিওরিটা ফিরিয়া আসে, বলি, “না, তোর আর পড়াশুনা হল না রাণু স্লেটটা নিয়ে আয় দিকিন—দেগে দিই, বুলো। পিঠটায় লেগেছে বেশি? দেখি?”
রাণু বুঝিতে পারে, তাহার জয় আরম্ভ হইয়াছে, এখন তাহার সব কথাই চলিবো আমার কাঁধটা জড়াইয়া আস্তে আস্তে ডাকে, “মেজকা!”
উত্তর দিই, “কি?”
“আমি, মেজকা, বড় হই নি?”
“তা তো খুব হয়েছ। কিন্তু কই, বড়র মতন—”
বাধা দিয়া বলে, “তা হলে স্লেট ছেড়ে ছোটকাকার মত কাগজ-পেনসিল নিয়ে আসব? চারটে উটপেন্সিল আছে আমার। স্লেটে খোকা বড় হয়ে লিখবে’খনা” হঠাৎ শিহরিয়া উঠিয়া বলে, “ও মেজকা, তোমার দুটো পাকা চুল গো! সর্বনাশ! বেছে দিই?”
বলি, “দাও। আচ্ছা রাণু, এই তো বুড়ো হতে চললাম, তুইও দুদিন পরে শ্বশুরবাড়ি চলবি লেখাপড়া শিখলি নি, মরলাম কি বাঁচলাম, কি করে খোঁজ নিবি, আমায় কেউ দেখে-শোনে কি না, বেঁধে-চেঁধে দেয় কি না—”
রাণু বলে, “পড়তে তো জানি মেজকা, খালি পেরথোম ভাগটাই জানি না, বড় হয়েছি কিনা। বাড়ির আর কোন লোকটা পেরথোম ভাগ পড়ে মেজকা, দেখাও তো!”
দাদা ওদিকে ধর্ম সম্বন্ধে খুব লিবারেল মতের লোক ছিলেন, অর্থাৎ হিন্দুধর্ম সম্বন্ধে অজ্ঞতাটা যেমন গভীর করিয়া রাখিয়াছিলেন, খ্রীস্ট এবং কবেকার জরাজীর্ণ জুরুয়াহিয়ানবাদ সম্বন্ধে জ্ঞানটা সেইরূপ উচ্চ ছিল। দরকার হইলে বাইবেল হইতে সুদীর্ঘ কোটেশন তুলিয়া সকলকে চমৎকৃত করিয়া দিতে পারিতেন এবং দরকার না হইলেও যখন একধার হইতে সমস্ত ধর্মমত সম্বন্ধে সুতীব্র সমালোচনা করিয়া ধর্মমতমাত্রেরই অসারতা সম্বন্ধে অধার্মিক ভাষার ভূরি ভূরি প্রমাণ দিয়া যাইতেন, তখন ভক্তদের বলিতে হইত, “হ্যাঁ, এখানে খাতির চলবে না বাবা, যার নাম শশাঙ্ক মুখুজ্জে!”
দাদা বলিতেন, “না, গোঁড়ামিকে আমি প্রশ্রয় দিতে মোটেই রাজী নই।”
প্রায় সব ধর্মবাদকেই তিনি গোঁড়ামি’ নামে অভিহিত করিতেন এবং গালাগাল না দেওয়াকে কহিতেন ‘প্রশ্রয় দেওয়া’।
সেই দাদা এখন একেবারে অন্য মানুষ। ত্রিসন্ধ্যা না করিয়া জল খান না এবং জলের অতিরিক্ত যে বেশি কিছু খান বলিয়াই বোধ হয় না। পূজা পাঠ হোম লইয়াই আছেন এবং বাক ও কর্মে শুচিতা সম্বন্ধে এমন একটা ‘গেল গেল’ ভাব যে, আমাদের তো প্রাণ ‘যায় যায়’ হইয়া উঠিয়াছে।
ভক্তেরা বলে, “ও রকম হবে, এ তো জানা কথাই, এই হচ্ছে স্বাভাবিক বিবর্তন এ একেবারে খাঁটি জিনিস দাঁড়িয়েছে।”
সকলের চেয়ে চিন্তার বিষয় হইয়াছে যে এই অসহায় লাঞ্ছিত হিন্দুধর্মের জন্য একটা বড় রকম। ত্যাগস্বীকার করিবার নিমিত্ত দাদা নিরতিশয় ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন এবং হাতের কাছে আর তেমন কিছু আপাতত না পাওয়ায় ঝোঁকটা গিয়া পড়িয়াছে ছোট কন্যাটির উপর।
একদিন বলিলেন, “ওহে শৈলেন, একটা কথা ভাবছি, ভাবছি বলি কেন, একরকম স্থিরই করে ফেলেছি।”
